সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

জামেয়া কুরআনিয়া লালবাগ ঢাকা

মে ১৭ ২০১৮, ০৫:৪৩

প্রতিষ্ঠানের নাম: জামেয়া কুরআনিয়া লালবাগ ঢাকা

প্রতিষ্ঠাতা: মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.

প্রতিষ্ঠাকাল: ১৯৫০ সাল

১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ মোতাবেক ১৩৭০ হিজরীর শাওয়াল মাস। মোঘলদের ঐতিহ্য প্রাচীর লালবাগ কেল্লা ঘেষে মনোরম পরিবেশে গড়ে উঠেছে সুবিশাল লালবাগ শাহী মসজিদ। তাকে কেন্দ্র করেই মসজিদের আঙিনাতে কোন এক শুভক্ষণে কুরআন হাদিসের দরসের সূচনা হয়।
লালবাগ জামেয়ার সূচনাটি ছিল কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী। অন্যান্য মাদ্রাসায় যেভাবে প্রাথমিক স্তরের ক্লাস থেকে শুরু করা হয় লালবাগ সেই স্বাভাবিক নিয়ম ভেঙ্গে সর্বোচ্চ স্তর দাওরায়ে হাদিসের দরসের মাধ্যমে কিতাবী দরসের সূচনা করেছিল। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে সকল ক্লাস ও বিভাগে ছাত্রদের ভর্তির সুযোগ দিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী শিক্ষা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।
উল্লেখ্য যে, হযরত যফর আহমদ উসমানী রহ. ঢাকায় অবস্থানকালে একবার স্বপ্নযোগে রাসূলুল্লাহ সা. কে লালবাগ শাহী মসজিদের হাউজে অজু করতে দেখেছেন। মনে করা হয় এটাই আল্লাহর দরবারে লালবাগ জামেয়ার মকবুলিয়্যাতের ইশারা ছিল।
 লালবাগ জামেয়ার ইতিকথাঃ
১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দ মুতাবেক ১৩৭০ হিজরী সনের শাওয়াল মাস। হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী রহ. এর সুযোগ্য ভাগ্নে ও তার খলিফা ভারত উপমহাদেশের প্রখ্যাত আলেম মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ. তখন ঢাকায় অবস্থান করছিলেন। স্থানীয় উলামায় কেরাম তার কাছে একটি আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রস্তাব পেশ করলে তিনি তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সমর্থন করেন এবং নিজে সক্রিয় সহযোগিতা দানের আশ্বাস দেন। কিন্তু তখনও মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য সুবিধা মত স্থানের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছিল না।
আমীরে শরিয়ত মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর তখন লালবাগ শাহী মসজীদের খতিব। অত্র এলাকায় একটি ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান করার প্রয়োজনীয়তা তিনি খুব গভীরভাবে অনুভব করে সে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা ভাবতে লাগলেন। এবং বিষয়টি নিয়ে মহল্লাবাসীদের সাথে পরামর্শ করলেন। অতঃপর মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. মাওলানা মুফতি দ্বীন মুহাম্মাদ খান সাহেব রহ. আমীরে শরিয়ত মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ. মাওলানা আব্দুর রহমান বেখুদ রহ. এর মত শীর্ষ স্থানীয় ওলামায়ে কেরাম এলাকার জনসাধারণকে সাথে নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি শুরু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এবং মাওলানা যফর আহমদ উসমানী রহ. এসে  দুআর মাধ্যমে লালবাগ শাহী মসজীদের পাশেই দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষা কারিকুলাম অনুসারে পরিচালিত এই আদর্শ প্রতিষ্ঠানটির সূচনা করেন। এবং সর্বসম্মতিক্রমে এর নামকরণ করা হয় ‘জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া’।
সূচনাকাল থেকেই মুজাহিদে আজম হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ এর ন্যায় বুজুর্গ ও সুদক্ষ ব্যক্তির বলিষ্ঠ পরিচালনায় প্রতিষ্ঠানটি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক সুনাম ও সুখ্যাতি অর্জন করে এবং শিক্ষার মান উন্নয়ন ও বহুমুখী প্রকল্প বাস্তবায়নের পথ উন্মুক্ত হয়। হযরত হাফেজ্জী হুজুর যেমন এর অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন তেমনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এর সার্বিক তত্ত্বাবধানের ক্ষেত্রে ছিলেন একজন একনিষ্ঠ পরিচালক। তার রূহানী তাওয়াজ্জুহই প্রতিষ্ঠানটিকে মাকবুলিয়্যাতের অনন্য এক স্তরে পৌঁছে দেয়। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত উনিই এর পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। ১৪০৭ হিজরির ৮ই রমজান হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ এর ইন্তেকালের পর মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ. এর পরিচালনার দায়িত্বে নিযুক্ত হন।

লালবাগ জামেয়ার অবদানঃ

জামেয়া কোরআনিয়া আরাবিয়া উপমহাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটি প্রায় অর্ধশতাব্দি ধরে তাফসির, হাদিস, ফিকহ, উসুলে ফিকহ, বালাগাত, মানতেক, নাহু, সরফ, আরবী, উর্দু ও ফার্সি ও বাংলা সাহিত্য ও ইতিহাসসহ ইসলামী সভ্যতা-সংস্কৃতির চর্চা ব্যাপকভাবে করে আসছে। বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে ইসলামী আদর্শের চেতনায় গড়ে ওঠা ভাবমূর্তি তৈরীর ক্ষেত্রে লালবাগ জামেয়ার অবদানের কথা সমাজের প্রত্যেকটি বিবেকবান ও সচেতন ব্যক্তি নির্দ্বিধায় স্বীকার করবে। এ পাহাড়সম ত্যাগ ও তিতিক্ষার কারণে জামেয়ায় কার্যক্রম আজ শুধু দ্বীনী পরিমন্ডলেই নয় বরং সর্ব মহলেই সমাদৃত। বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়েও মুসলিম বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই এর বেশ নামযশ  রয়েছে। আর এর অন্যতম কারণ হল, লালবাগ জামেয়া শুধুমাত্র গতানুগনিক ধারায় তার কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিকতার ভেতরই সীমাবদ্ধ রাখেনি বরং এ শিক্ষাকে কাজে লাগিয়ে দ্বীনী আন্দোলন ও ইসলামী বিপ্লবে ভূমিকা রেখে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। দেশ, জাতি ও দ্বীনের সর্বক্ষেত্রে স্বতন্ত্র চিন্তার এই মাকতাবায়ে ফিকির অনেকের কাছে একটি সার্বজনীন চিন্তা চেতনা লালনের মূলকেন্দ্র হিসেবে স্বীকৃত। এই নীতির ফলেই বাংলাদেশের আনাচে কানাচে এবং বহির্বিশ্বেও এই জামেয়ার কৃতি সন্তানেরা দ্বীন ও ঈমানের দাবী পূরণের লক্ষ্যে অগ্রণীভাবে সিপাহসালার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, দীর্ঘ সময় ধরে যারা দরস ও তাদরীস, দাওয়াত ও তাবলীগ, তাকরীরাত ও তাসনিফাত এবং ইসলামী রাজনীতিসহ সকল ক্ষেত্রে যারা নেতৃত্ব দিয়ে আসছে তারা অত্র জামেয়ার কৃতি সন্তানদেরই একজন।
মুসলমানদের চিন্তা চেতনাকে ইসলামের সঠিক আদর্শের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত রাখতে বিভিন্ন সময় সংস্কারমূলক ও বৈপ্লবিক কর্মসূচী হাতে নেয়ার ক্ষেত্রে লালবাগ জামেয়ার ভূমিকা সর্বদা চোখে পড়ার মত। তাই মানুষ এ প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে বিশেষ শ্রদ্ধা ভক্তি পোষণ করে। এবং ইসলামের উপর আঘাতের প্রতিবাদে লালবাগ জামেয়ার প্রতিবাদী ভূমিকার ফলে ইসলাম বিদ্বেষীদের বেশ রোষানলেও পড়তে হয়েছে প্রতষ্ঠানটিকে। তারা জামেয়ার নামে গুজব রটিয়ে অনাস্থা সৃষ্টিসহ আরো নানান প্রতিবন্ধকা তৈরীর অপচেষ্টাও করেছে বহুবার। কিন্তু যাবতীয় বাধা বিপত্তিকে উপেক্ষা করে লালবাগ জামেয়া তার সুমহান লক্ষ্যপানে এগিয়ে চলেছে অবিরাম গতিতে। পাহাড়ের ন্যায় অটল অবিচল থেকে পাশ্চাত্যের সভ্যতা সংস্কৃতির মোকাবেলা করে যাচ্ছে আজ আবদি।
এ কথা সর্বজনবিদিত যে আজ বাংলাদেশের যত প্রসিদ্ধ ওলামায়ে কেরাম বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে দায়িত্বশীল হয়ে ইলমে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন তাদের সিংহভাগই এই লালবাগ জামেয়ার সনদপ্রাপ্ত কৃতিসন্তান। এটি লালবাগ জামেয়ার জন্য বিরাট গর্বের বিষয়। লালবাগ জামেয়ার ইতিহাস ও তথ্য অনুসন্ধান করলে এ কথাটিই স্পষ্ট হবে যে এই প্রতিষ্ঠানটি কোন গতানুগতিক সনাতনী বিদ্যা নিকেতন নয়, বরং এটি ইসলামের পুনরজাগরণে মুসলিম মিল্লাতের এক মহান বিপ্লবের নাম।

সামাজিক ক্ষেত্রে লালবাগ জামেয়ার অবদানঃ

লালবাগ জামেয়া প্রতিষ্ঠার পর থেকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে সেই সঙ্গে জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম ও সামাজিক উন্নয়নে এর ভূমিকা সর্বজনস্বীকৃত। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, টর্নেডোসহ যেকোণ দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে এখানকার ছাত্র শিক্ষকগণ সাধ্যমত সাহায্য সহযোগিতা নিয়ে দুর্গত মানুষোদের পাশে দাড়িয়েছেন সংঘবদ্ধভাবে। দেশের ভয়াবহ দুর্যোগকালে অত্র জামেয়ার ছাত্র শিক্ষকগণ ত্রাণ সামগ্রী ও নগদ অর্থ দিয়ে প্রয়োজনে মাদরাসার ক্লাস বন্ধ রেখে দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় গিয়ে দুঃস্থ ও বিপদগ্রস্থ মানুষদের হাতে হাতে সাহায্য পৌঁছে দিয়ে এসেছেন। গত বছর উত্তরাঞ্চলে বন্যার্তদের সহায়তায় পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে বন্যা কবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ ও সম্প্রতি মায়ানমারের গণহত্যার কবল থেকে প্রাণ নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়া অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের সাহায্যার্থে দুটি সফল ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে লালবাগ জামেয়া।

রাজনীতির মায়দানে লালবাগ জামেয়ার অবদানঃ

বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপটে মাদরাসা কিংবা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাজনীতি একটি স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হলেও লালবাগ জামেয়া তার সূচনালগ্ন থেকেই এ ব্যাপারে কখনোই কোন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেনি। লালবাগ জামেয়া তার আদর্শকে শুধু অক্ষরজ্ঞানের ভেতরেই সীমাবদ্ধ রাখেনি, বরং তার সেই আদর্শ বাস্তবায়নে সদা তৎপর ছিল।
রাজনীতির ক্ষেত্রে তার বৈপ্লবিক ভূমিকা আজও সর্ব মহলে স্বীকৃত। অত্র জামেয়ার প্রথম প্রিন্সিপাল শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. তার প্রতিবাদী ভূমিকার কারণে আজ শুধু বাংলাদেশেই নন, পুরো উপমহাদেশে “মুজাহিদে আজম” উপাধীতে অমর হয়ে আছেন। সে আমলে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে এমন লোক খুজে পাওয়া ছিল বেশ দুস্কর। কিন্তু শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. আইয়ুব খানের যে কোন ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদে গর্জে উঠতেন। মুসলিম পারিবারিক আইনের বিরুদ্ধে তার আন্দোলন আইয়ুব খানের ক্ষমতার ভিত কাপিয়ে তুলেছিল। তিনি তৎকালীন শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্বার প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন। শিক্ষা মন্ত্রী আতাউর রহমানের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে তার আন্দোলনে দেশবাসী অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়েছিল।
চাঁদ দেখা কমিটি নিয়ে ঈদ ও রমজানের চাদের ব্যাপারে ভুল সিদ্ধান্ত দিলে শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. তার সত্যতা চ্যালেঞ্জ করে জনগণকে নিজের রায় জানিয়ে দিতেন। এদেশের জনগণও লালবাগ থেকে শামসুল হক ফরদপুরী রহ. এর সিদ্ধান্ত শোনার অপেক্ষায় থাকত। এই মহামণিষী খ্রিষ্টান মিশনারীদের ইসলামবিরোধী দাওয়াতী কার্যক্রমের বিরুদ্ধে তার কার্যক্রম প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছিলেন। তিনি পাকিস্তানের ইসলামী রাষ্ট্রের মূলনীতির ঐতিহাসিক ২২ দফা রচয়িতাদের মাঝে অন্যতম ছিলেন। যফর আহমদ উসমানীও ২২ দফার রচয়িতাদের মধ্যে বিশেষ ভুমিকা পালন ছিলেন। এবং পূর্ব পাকিস্তানে স্বাধীন পাকিস্তানের পতাকা সর্বপ্রথম যিনি উত্তোলন করেন তিনি হলেন আল্লামা যফর আহমদ উসমানী। তিনি বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাকিস্তান গঠনের পক্ষে জনমত সৃষ্টির লক্ষ্যে অসংখ্য সভা সমাবেশে বক্তব্য রাখেন। শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. ও উনার সাথে অনেক জায়গায় উপস্থিত ছিলেন। শামসুল হক ফরিদপুরী রহ মুসলিম লীগের সমর্থক ছিলেন।
হাফেজ্জী হুজুর রহ. প্রথমে রাজনীতিতে না আসলেও উলামায়ে কেরামের কামিয়াবীর জন্য সর্বদা দুয়া করতেন। ১৯৮১ সালে সরাসরি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়িয়ে সারাবিশ্বে ঝড় তুলেছিলেন তিনি। খানকা থেকে বেরিয়ে তিনি তওবার রাজনীতির ডাক দিলেন। নির্বাচন শেষে স্থায়ীভাবে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন লালন করে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন। এরপর শুধু বাংলাদেশেই না স্বল্প সময়ের ভেতর ইসলামী বিশ্ব তাকে শান্তির দূত হিসেবে চিহ্নিত করে। ইরাক-ইরান ভ্রাতৃঘাতি যুদ্ধে শান্তির দূত হিসেবে মীমাংসার ডাক আসে। ১৯৮২ সালে তিনি ইরান সফর করেন। এছাড়াও স্বৈরশাসন ও সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে জিহাদ ঘোষণা করেন।
হাফেজ্জী হুজুর যেই বিপ্লবের ধারা সৃষ্টি করে গেছেন তার ইন্তেকালের পর সেই ধারাকে অব্যাহত রাখেন অত্র জমেয়ার পরবর্তী প্রিন্সিপাল মুফতি ফজলুল হক আমিনী রাহঃ। তার সময়কালে সরকারের ইসলাম বিরোধী কর্মকান্ডের প্রতিবাদে যে হুংকার তিনি দিতেন এতে জালিম শাহীর মসনদ কেপে উঠতো। আজও ইসলামের উপর কোন আঘাত আসলে জাতি একজন মুফতি আমিনীর অভাব গভীরভাবে অনুভব করে। অত্র জামেয়ার অধিকাংশ দায়িত্বশীল শিক্ষকমন্ডলী ইসলাম বিরোধীদের অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে কখনো পিছপা হননি। এখানকার ছাত্ররাও শিক্ষকদের নির্দেশে পড়ালেখার সকল বৈশিষ্ট্যকে ঠিক রেখে ইসলাম বিরোধী সকল কার্যক্রমে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।
রাজনীতির ক্ষেত্রে এইসব অবদান, লালবাগ জামেয়ার প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক। এছাড়াও বাংলাদেশের সর্বত্র ইসলামী আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিয়ে আসছে তাদের অধিকাংশই লালবাগ জামেয়ার সন্তান। মোটকথা ইসলামী আদর্শে রাজনীতির ক্ষেত্র তৈরীতে লালবাগ জামেয়ার অসামান্য অবদান চির অমলান থাকে যাবে।

জামেয়ার ১১ দফাঃ

 ১. সর্বক্ষেত্রে সালফে সালেহীন তথা আমাদের অনুকরণীর পূর্ব পুরুষদের শিক্ষা দীক্ষা ও নীতির পূর্ণ অনুসরণ ও ইসলামের সেবায় তাদের অনুসৃত পদ্ধতির পূর্ণ অনুকরণ করা।
 ২. মুসলিম জনসাধারণের সাথে সুসম্পর্কের বন্ধন সুদৃঢ় ও সম্প্রসারিত করা। ইসলামবিরোধী শক্তির বিষাক্ত আক্রমণ থেকে সাধারণ মুসলমানের ঈমান আকিদাকে সুরক্ষিত রাখা। মুসলিম হিসেবে প্রত্যেককে নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করে তোলা।সেইসঙ্গে এই ব্যাপারে স্পষ্ট ধারণা দেয়া যে ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দান করার অর্থ ছাত্রদের উপর অনুগ্রহ বা দয়া করা না বরং এখানে দান করে ইসলামী শিক্ষা দীক্ষা ও সভ্যতা সংস্কৃতির ভিত মজবুত করণে ভূমিকা রাখা মুসলমান হিসেবে তার উপর অর্পিত দায়িত্বসমূহের একটি বিশেষ অংশমাত্র।
 ৩. আধুনিক সভ্যতার নামে পাশ্চাত্যের ইসলামবিরোধী যেসব সংস্কৃতি আমাদের দেশে আমদানী করা হয়েছে বা হচ্ছে তার ভয়াল থাবা থেকে মুসলমান জনসাধারণকে সচেতন করে তোলা। যাতে জনগণ সেইসব ষড়যন্ত্র থেকে মুক্ত থাকতে পারে।
 ৪. আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত যুব সমাজের মন-মস্তিষ্ককে পাশ্চাত্য শিক্ষার কুপ্রভাব থেকে মুক্ত করে তাদের ভেতর আত্মমর্যাদাবোধ ও দেশপ্রেম সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রচেষ্টা চালানো।
 ৫. হানাফী মাযহাবের পুরোপুরি অনুসরণপূর্বক কুরআন হাদিস দ্বারা স্বীকৃত অন্যসব মাযহাবের প্রতি সুধারণা পোষণ করা। সত্যের উপর সুপ্রতিষ্ঠিত প্রত্যেক মাযহাবকেই সঠিক মনে করা এবং সেসবের প্রতি তুচ্ছ ধারণা না রাখা। কুরআন হাদিসের অনুসরণের নামে ভন্ড ফকিরদের পুজা করে ইসলামকে হাসি তামাশার পাত্র বানানোর ষড়যন্ত্র থেকে মুসলিম সমাজকে বিরত রাখা।
 ৬. দ্বীনী ইলমের হাকিকত, তাসাউফ তথা আধ্যাত্মিক জ্ঞানার্জন এবং তাযকিয়ায় নফস তথা আত্মার পরিশুদ্ধির মাধ্যমে ইসলামী শরিয়তের চূড়ান্ত লক্ষ্যে পৌছা।
 ৭. বিদআত ও কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থেকে ইখলাস ও নিষ্ঠার সাথে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামী শরিয়তের বাস্তব প্রতিফলন ঘটানো।
 ৮. মুসলিম রাষ্ট্র বা সরকারের আনুগত্য এবং পূর্ণ সমর্থন করা। এর বিরুদ্ধাচারণকে সম্পূর্ণ বেআইনি মনে করা। যদি রাষ্ট্রের কর্ণধারেরা অজ্ঞতাবশত ইসলাম বা শরিয়তবিরোধী কার্যকলাপে মুসলিম জনতাকে বাধ্য করার অপচেষ্টা চালায় তবে তার প্রতিরোধে সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
 ৯. আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষত বিজ্ঞানের সকল প্রযুক্তিকে উন্নয়নের ক্ষেত্রে সহায়ক ও উপকারী মনে করা। বিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তিকে ইসলামের সাথে সাংঘর্ষিক মনে না করা। ঠিক একইভাবে প্রযুক্তিগত উন্নয়নকে তাসাউফের পরিপন্থী মনে না করা। আধুনিক শিক্ষা বা বিজ্ঞান প্রযুক্তির নামে যদি বেহায়াপনা, উলঙ্গপনা এবং খোদায়ী বিধানের বিরোধীতাকে উস্কে দেয়ার অপচেষ্টা চালানো হয় তাহলে তা প্রতিরোধের যাবতীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
 ১০. রাজতন্ত্র ও পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রকে সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী মনে করা। ইসলামী গণতন্ত্র এবং সৎ ন্যায় পরায়ণ ও ইসলামী আদর্শে আদর্শবান ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে গঠিত ইসলামী শুরায়ী নীতিকে সমর্থন ও অনুমোদন দেয়া।
 ১১. জ্ঞানার্জনের একটি মাত্র উদ্দেশ্য থাকবে। আর তা হল, এই জ্ঞানের আলোকে নিজের জীবনকে গড়ে তোলা।

দারুল ইকামার কানুনসমূহ :

দারুল ইকামায় অবস্থানরত প্রত্যেক ছাত্র নিম্নোক্ত কানুন ও নিয়মাবলি পুরোপুরি মেনে চলতে বাধ্য থাকবে।অমান্যকারী শাস্তি বা বহিস্কারযোগ্য হবে।
১. দশ বছরের ছোট কোন ছাত্র নিজ জিম্মাদার ব্যাতিত দারুল ইকামায় অবস্থান করতে পারবেনা।
২. ক্লাস টাইম ছাড়া দারুল ইকামায় অবস্থানরত ছাত্ররা মাগরিবের পর থেকে রাত দশটা অথবা সাড়ে দশটাপর্যন্ত এমনভাবে তাকরার মুতালা এবং লেখাপড়ায় লিপ্ত থাকবে যাতে অন্যের পড়ালেখায় কোন ধরণের ব্যাঘ্যাতসৃষ্টি না হয়।
৩. হেফজ ও মক্তব বিভাগের ছাত্ররা নিজেদের বিভাগ কর্তৃক নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী লেখাপড়ায় লিপ্ত থাকবে।
৪. জামেয়ার প্রত্যেক ছাত্রের  আচার-আচরণ, চালচলন, পোশাক-পরিচ্ছেদ, দাড়ি, টুপি পুরোপুরি সুন্নাত মুতাবেক হতে হবে। সন্দেহ সৃষ্টি হতে পারে এমন কোন আচার-আচরণ এবং কাজ-কর্মে কোন ছাত্র জড়িত হতে পারবেনা।
৫. জামেয়ার ছাত্রদের জন্য যে কোন ছাত্র সংগঠন এবং অন্য যে কোন দল সংগঠন বা সংস্থার সদস্যপদ গ্রহণ করা বা দলীয় কোন কর্মতৎপরতা চালানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। প্রমাণিত হলে তাৎক্ষনিকভাবে মাদরাসা থেকে বহিস্কার করা হবে এতে কোন ওজর আপত্তি গ্রহণযোগ্য হবেনা।
৬. নিজেরা কোন প্রকার ঝগড়া বিবাদে জড়াবে না। কোন কারনে এরূপ পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে দারুল ইকামার উস্তাদদের জানিয়ে তার সমাধান করিয়ে নিতে হবে।
৭. মাদরাসার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে কোন ছাত্র বহিরাগত কোন ব্যক্তিকে দারুল ইকামায় ডেকে আনতে পারবেনা।
৮. দারুল ইকামায় অবস্থানরত কোন ছাত্র দায়িত্বশীল উস্তাদদের অনুমতি ছাড়া রাতে অন্য কোন ছাত্রের সিটে কিংবা দারুল ইকামার বাইরে অবস্থান করতে পারবেনা।
৯. তাকরার এবং মুতালার সময় গল্প গুজব করা বা পাঠ্যকিতাব ব্যাতিত অন্য বইপুস্তক পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এমনটি প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে বিবেচিত হবে।
১০. অনুমতি ছাড়া এক তলার ছাত্র অন্য তলায় এবং এক রুমের ছাত্র অন্য রুমে যেতে পারবেনা।
১১. রাত দশটা অথবা সাড়ে দশটা থেকে ফজর পর্যন্ত সময় বিশ্রাম ও ঘুমের জন্য নির্ধারিত। এ সময়ে কোন ছাত্র অন্যের বিশ্রাম বা নিদ্রায় ব্যাঘ্যাত সৃষ্টি করতে পারবেনা। কোন ছাত্র যদি এ সময়ে ব্যক্তিগত মুতালা করতে চায় তাহলে সে বারান্দা বা মসজিদে নির্জনে মুতালা করতে পারবে।
১২. প্রত্যেক ছাত্র দারুল ইকামার আসবাবপত্রের সদ্ব্যবহার এবং তা যথাযথ তদারকি ও তত্ত্বাবধানের দায়িত্বশীল হবে। দারুল ইকামার আসবাব পত্র বিনষ্ট হওয়া থেকে সদা সতর্ক থাকবে। প্রতিদিন নিজ কামরা এবং প্রতি সপ্তাহে কামরা ও তার আশপাশ পরিস্কার করার তালিকা করে তা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করবে। ব্যবহার্য কাপড় ও অন্যান্য আসবাবপত্র গোছগাছ করে রাখতে হবে। পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি সদা সতর্ক দৃষ্টি রাখবে।
১৩. দারুল ইকামার জিম্মাদার কর্তৃক প্রত্যেক ছাত্রের সিট নির্ধারিত হবে। সিট পরিবর্তনের এখতিয়ার কোন ছাত্রের থাকবেনা।
১৪. দারুল ইকামায় অবস্থানরত কোন ছাত্র নিজস্ব কোন মেহমানকে মুনতাযিম উস্তাদের অনুমতি ব্যাতিত নিজ বা অন্য কারো সিটে থাকার ব্যবস্থা করতে পারবেনা।
১৫. প্রত্যেকে ছাত্র জামাতের সঙ্গে লালবাগ শাহী মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করবে। আশেপাশের কোন মসজিদে নামাজ আদায়ের অনুমতি থাকবেনা। প্রমাণিত হলে শাস্তিযোগ্য হবে। ফজরের আযানের সঙ্গে সঙ্গে ঘুম থেকে জাগতে হবে। প্রত্যেক নামাজের দশ মিনিট পূর্বে রুম থেকে বের হয়ে মসজিদে চলে আসতে হবে।
১৬. বাদ ফজর নিয়মিতভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে হবে এবং তাহাজ্জুদসহ নফল ইবাদাত বন্দেগীর অভ্যাস গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট হতে হবে।
১৭. ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় কোন কাজ থাকলে তা আসরের পর থেকে মাগরীবের দশ মিনিট পূর্বে সেরে মাগরিবের নামাজ লালবাগ শাহী মসজীদে আদায় করতে হবে।
১৮. চরিত্র বিধ্বংসী কোন বই পুস্তক পড়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অবসর সময়ে আকাবের আসলাফদের কিতাবাদি, মাওয়ায়েজ, মালফুজাত এবং ইসলামের বিভিন্ন বিষয়াদির কিতাব মুতালা করবে।
১৯. ক্যামেরা রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কোন ছাত্র নিজ বা অন্য কোন ব্যক্তির মোবাইল ফোন নিজের কাছে রেখে ব্যবহার করতে পারবেনা। কারো কাছে এই জিনিষ পাওয়া গেলে তা সঙ্গে সঙ্গে বাজেয়াপ্ত করা হবে।
২০. কোন ছাত্র টিউশনী করতে পারবেনা। বা নিজেও অন্য কোথাও অনুমতি ব্যতিত কোন প্রশিক্ষন কোর্সে অংশগ্রহণ করতে পারবেনা। এমনটি প্রমাণিত হলে কঠোর শাস্তিযোগ্য বলে বিবেচিত হবে।
২১. প্রত্যেক ছাত্র দৈনন্দিন চব্বিশ ঘন্টা সময়ের নিজামুল আওকাত বানিয়ে তা নিজ সিটের পেছনে টানিয়ে রাখবে।
২২. ক্লাশের সময় এক দুই ঘন্টা ছুটি নেয়ার প্রয়োজন হলে তা সংশ্লিষ্ট ক্লাসের উস্তাদ থেকে নিতে হবে। নূন্যতম একদিনের ছুটি নিতে হলে তা দারুল ইকামার মুনতাযিমের লিখিত সুপারিশ নিয়ে প্রিন্সিপাল সাহেবের মঞ্জুরী নিতে হবে। অবশ্য ক্লাশের সময় ব্যাতিত স্বল্প সময়ের জন্য কোথাও যেতে হলে দারুল ইকামার সংশ্লিষ্ট মুনতাযিমের অনুমতি নিয়ে যেতে হবে।
২৩. এছাড়া মাদরাসা কর্তৃপক্ষ অবস্থার প্রেক্ষিতে যে সময় যে নিয়ম জারি করবেন তা প্রত্যেক ছাত্রের জন্য মেনে চলা বাধ্যতামূলক হবে।
আদেশক্রমে জামেয়া কর্তৃপক্ষ

লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপালঃ

হযরত মাওলানা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ.
১৩৭০-১৩৮৮ হিজরী
৫ই জিলকদ, ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত

মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ মুহাদ্দিস সাহেব হুজুর রহ.
১৩৮৮-১৪০৪ হিজরী
৩০ শে রমজান,এরপর স্বেচ্ছায় অব্যহতি গ্রহণ করেন তিনি।

মুহাম্মাদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুর রহ
১৪০৪-১৪০৭ হিজরী
৮ই রমজান ইন্তেকালের আগ পর্যন্ত

মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ
১৪০৭-১৪৩৪
মুফতি আমিনী রহ  ১৯৪৫-২০১২

মুফতি ফজলুল হক আমিনী রহ ১৯৪৫ সালে ১৫ নভেম্বর বি-বাড়িয়া জেলার আমীনপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মরহুম আলহাজ ও্যায়েজউদ্দিন ছিলেন একজন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, আবেদ ও আলেম ওলামা পরশধন্য ব্যক্তিত্ব। মাতা ফুলবানি নেসা ছিলেন একজন পর্দানশীন ধর্মপ্রাণ গৃহিনী।

শিক্ষাজীবনঃ

ফজলুল হক আমিনীর বয়স যখন নয় কিংবা দশ তার বাবা ওয়ায়েজউদ্দিন তাকে দেশের প্রসিদ্ধ দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বি-বাড়িয়া জামিয়া ইউনুসিয়ায় প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ভর্তি করেন। পরবর্তী সময়ে মুন্সিজগঞ্জের মুস্তফাগঞ্জ মাদরাসা থেকে তিনি প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে হাফেজ মাওলানা মুহসিনউদ্দিন রহ তাকে তিলে তিলে গড়ে তুলেন। মুস্তফাগঞ্জে অধ্যায়নের তিন বছর শেষ হলে তার পিতা তাকে নিয়ে চলে আসেন ঢাকার প্রাচীন দ্বীনী বিদ্যাপীঠ বড় কাটারা মাদরাসায়। সেখানে এসে তৎকালীন প্রিন্সিপাল পীরজী হুজুরের দায়িত্বে বেড়ে ওঠা। অল্পসময়ের ভেতরই মেধাবী আমিনী রহ. নজর কাড়েন হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর। কিছুদিন পর ১৯৬১ সালে হযরত সদর সাহেবের আত্মিক পরশ টানে তিনি চলে আসেন ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান লালবাগ জামেয়ায়। এখান থেকেই তিনি ১৯৬৮ সালে কৃতিত্বের সালে দাওরায় হাদিস পাশ করেন। এরপর ১৯৬৯ সালে মুজাহিদে আযম আল্লামা শামসুল হক ফরিদপুরী রহ. এর নির্দেশে উচ্চ শিক্ষার জন্য পাকিস্তানের করাচি বিননুরী টাউন মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে আল্লামা ইউসুফ বিননুরী রহ. এর একান্ত সান্নিধ্যে থেকে হাদীসশাস্ত্র ও ফিকহশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করে দেশে ফিরে আসেন।

কর্মজীবনঃ

১৯৭০ সালে ঢাকার আলুবাজার জামে মসজিদে ইমাম ও খতিব হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তিনি তার কর্মজীবন শুরু করেন। সেখানে তিনি একটি মাদরাসাও প্রতিষ্ঠা করেন। একই সময় হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. তাকে মাদরাসায় নুরিয়াতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। এবং সেই বছরই তিনি হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ এর কন্যার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৭২ সালে তিনি মাত্র নয় মাসে সম্পূর্ণ কুরআন শরিফ হেফজ করেন। ১৯৭৫ সালে তিনি জামেয়া কুরআনিয়া আরাবিয়ার উস্তাদ ও সহকারি মুফতি নিযুক্ত হয়ে তার উজ্জ্বল ও গৌরবদীপ্ত কর্মজীবনের সূচনা করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি লালবাগ জামেয়ার প্রধান মুফতির দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ১৯৮৭ সালে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ এর ইন্তেকালের পর থেকে তিনি লালবাগ জামেয়ার প্রিন্সিপাল ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ২০০৩ সালে জামেয়া হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম বড় কাটারা মাদরাসার মুহতামিম ও মুয়াওয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন। মৃত্যু অবধি তিনি এই দুই প্রতিষ্ঠানের সার্বিক দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। এছাড়াও সারাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে অর্ধশতাধিক মাদরাসার প্রধান অভিভাবকের দায়িত্ব পালন করেন মুফতি আমিনী রহ.।
 আধ্যাত্মিক জীবনঃ
মুফতি আমিনী রহ. ছিলেন দক্ষ শিক্ষক, প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ও সফল সংগঠক। সেই সাথে তিনি ছিলেন তাসাউফ ও আধ্যাত্মিক জগতের রাহবার। আল্লাহর সাথে সম্পর্ক করে সব কাজের সমাধানে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি। তিনি হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর “মাজাযে সোহবত” ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রহ এর অন্যতম খলিফা হাটহাজারী মাদরাসার মহাপরিচালক আল্লামা আহমদ শফি দা.বা. ও হাফেজ্জী হুজুরের অন্যতম খলিফা আব্দুল কবির রহ সহ আরো বেশ কয়েকজন বিশিষ্ট শায়েখ বাইয়াত করার অনুমতি প্রদান করেন।

রাজনৈতিক জীবনঃ

দ্বীন প্রতিষ্ঠা ও ইসলামী আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক বিভিন্ন ইস্যুতে আপোষহীন সংগ্রামী এই নেতার রাজনীতিতে পদচারণা শুরু হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর হাত ধরে। ১৯৮১ সালে হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর নেতৃত্বে খেলাফত আন্দোলন গঠিত হয়। এবং মুফতি আমিনী রহ. এ সংগঠনের সেক্রেটারী জেনারেল হিসেবে মনোনীত হন। ১৯৮১ ও ১৯৮৬ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হযরত হাফেজ্জী হুজুরের দক্ষিণ হস্ত হয়ে দেশব্যাপী নির্বাচনী প্রচারণায় তিনি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর ইন্তেকালের পর ১৯৯২ সালে বাবরী মসজিদ ধ্বংসের প্রতিবাদে লংমার্চ ও ১৯৯৪ সালে নাস্তিক মুরতাদ বিরোধী আন্দোলনে তিনি ছিলেন অন্যতম বীর সিপাহসালার। উলামা কমিটি, জমিয়তুল আনসার, সম্মিলিত সংগ্রাম পরিষদ, ইসলামী মোর্চার মত বিভিন্ন কমিটি ও মজবুত সংগঠনগুলো প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে তার সাংগঠনিক দক্ষতার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। মৃত্যু পর্যন্ত তিনি ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান, ইসলামী আইন বাস্তবায়ন কমিটির আমীর, উলামা কমিটি বাংলাদেশের প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও খেলাফতে ইসলামীর আমীর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সালে ৪ দলীর জোট গঠনের মধ্য দিয়ে তিনি জাতীয় নেতা হিসেবে দেশব্যাপী ব্যাপক সুখ্যাতি ও পরিচিতি লাভ করেন। ২০০১ সালে হই কোর্ট থেকে “সব ধরণের ফতোয়া নিষিদ্ধ” মর্মে কুরআন হাদিস বিরোধী রায় দেয় আদালত। এ রায় শুনে সর্বপ্রথম যিনি হুংকার দিয়েছিলেন তিনি ছিলেন মুফতি আমিনী রহ.। রায় প্রদানকারী দুই বিচারপতিকে শরিয়তের আলোকে মুরতাদ ঘোষণা করেছিলেন। আন্দোলন তীব্র হয় উঠতে থাকলে তিনি সরকারের রোষানলে পড়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হন। দীর্ঘ চারমাস কারা নির্যাতন ভোগ করেন। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় নির্বাচনে তিনি চার দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে বিবাড়িয়া ২ নির্বাচনী আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে আওয়ামী সরকার কুরআন সুন্নাহ বিরোধী নারী উন্নয়ন নীতিমালা অনুমোদন ও ইসলাম বিরোধী নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করলে তিনি এর প্রতিবাদে দুর্বার আন্দোলনের ডাক দেন। সেই বছরই ৪ই এপ্রিল তার ডাকে দেশব্যাপী নজিরবিহীন সকাল সন্ধ্যা হরতাল পালিত হয়। আওয়ামী সরকারের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে উনার দুর্বার আন্দোলন সরকারের ক্ষমতা হুমকীর মুখে পড়ে যায়। তাকে আন্দোলন থেকে দমিয়ে রাখতে শেষ পর্যন্ত তার ছোট ছেলে আবুল হাসানাত আমিনীকে গুম করে তাকে ফোনে হুমকি দেয়া হয় যে আন্দোলন থেকে ফিরে না এলে ছেলেকে ফেরত দেয়া হবে না। কিন্তু তিনি এসব কিছুর সামনেই নতি স্বীকার করেননি। আন্দোলনকে আগের চেয়েও দুর্বার গতিতে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।
১৯৮৪ সালে ইরাক ইরান যুদ্ধ বন্ধে তিনি হাফেজ্জী হুজুরের সাথে ইরানের শান্তি মিশনের অনুতম সদস্য ছিলেন। বেশ কয়েকবার হজ-উমরা পালনসহ তিনি লন্ডন, সিরিয়া, ভারত, কুয়েত, কাতার, আবুধাবী ও পাকিস্তান সফর করেন।
দেশব্যাপি তার প্রতি তৌহিদী জনতার অকুণ্ঠ সমর্থন থাকায় তাকে সরাসরি কারারুদ্ধ করতে না পেরে সবশেষে সরকার এক নতুন ফন্দি আঁটে। নিরাপত্তার নামে তাকে করা হয় গৃহবন্দি। এরপর থেকে মৃত্য পর্যন্ত দীর্ঘ একুশ মাস তিনি গৃহবন্দি ছিলেন। দীর্ঘ একুশ মাস গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় সংগ্রামী এ বীর সেনানী ২০১২ সালের ১২ ডিসেম্বর মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ১২ টা ২০ মিনিটে শহিদী মর্যাদায় ভূষিত হয়ে প্রিয় প্রভুর সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। বাংলার ইতিহাসে নজিরবিহীন এই জানাজায় হরতালের দিন শত বাধাবিপত্তি উপেক্ষা করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকার জাতীয় ঈদগাহ ময়দান ও তার পার্শ্ববর্তী এলাকায় বিপুল সংখ্যক ভক্তবৃন্দ একত্রিত হয়েছিল। বৃহত্তর এই জানাজায় শরিক হয়ে গৃহবন্দীত্বের শেকলে মুফতি আমিনী রহ. কে বন্দী করে তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়ার এক নিরব এবং জোরদার প্রতিবাদ জানিয়ছিল সেদিন তৌহিদী জনতা। অভিজ্ঞ প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ছয় লাখেরও অধিক মানুষ তার জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিল। আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতের উচু মাকাম দান করুন। আমীন!
মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা মুফতী ফজলুল হক আমিনী রহ.
হযরত মাওনালা আবদুর রব ( মদীনা হুজুর ) দা. বা.

  • জামেয়ার মুহাদ্দিস ও ছদরে শূরা
  • ফোনঃ ০১৭১৪-৭৮৫৯২৭

হযরত মাওলানা আবদুল হাই দা. বা.

  • শাইখুল হাদীসঃ লালবাগ জামেয়া
  • খতিবঃ
  • ফোনঃ ০১৮২৭-৫৪২৯০৩

হযরত মাওলানা হাবীবুর রহমান ( হাজী সাহেব হুযূর ) দা. বা.

  • শাইখুল হাদীসঃ লালবাগ জামেয়া
  • খতীবঃ
  • ফোনঃ ০১৮১৬-৩৯০৮৩৯

হযরত মাওলানা আবদুর রহীম দা. বা.

  • শাইখুল হাদীসঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৮১৮-২২৪২২০

হযরত মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ দা.বা.

  • মুহাদ্দিসঃ লালবাগ জামেয়া
  • খতিবঃ
  • ফোনঃ ০১৮১৯-৪৩৩৮৯২

হযরত মাওলানা রফিকুল ইসলাম দা. বা.

  • মুহাদ্দিসঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৭২৯-১৬৪৪৩৩

হযরত মাওলানা মুফতী ইয়াহইয়া দা. বা.

  • প্রধান মুফতীঃ লালবাগ জামেয়া
  • মুহাদ্দিস লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৩-৩৮২৭০৯

হযরত মাওলানা ফখরুদ্দীন দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৭-৮২৬৭৭০

হযরত মাওলানা জসীম উদ্দীন দা. বা.

  • মুহাদ্দিসঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৭১৩-০১২৫৯৮

হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ তৈয়্যেব হোসাইন দা. বা.

  • মুহাদ্দিসঃ লালবাগ জামেয়া
  • পরিচালকঃ মারকাযুল কুরান
  • বিশিষ্ট লেখক ও অনুবাদক
  • ফোনঃ ০১৭১১-১৭৮৮৫৪

হযরত মাওলানা মুফতী ফায়জুল্লাহ দা. বা.

  • মুহাদ্দিসঃ লালবাগ জামেয়া
  • পরিচালকঃ মারকাযুল কুরআন
  • মহাসচিবঃ ইসলামী ঐক্যজোট
  • উপদেষ্টা ঃ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
  • ফোনঃ ০১৫৫২-৩৭৬৬০৫

হযরত মাওলানা যুবায়ের আহমাদ দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • পরিচালকঃ দারুল উলুম কাকরাইল
  • ফোনঃ ০১৭১১-৮৩৮০৩১

হযরত মাওলানা আহলুল্লাহ ওয়াছেল দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক
  • ফোনঃ ০১৭১১-৩৮৯৪২১

হযরত মাওলানা ইমদাদুল্লাহ দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৬-২১৭৪৫৯

হযরত মাওলানা ইসহাক দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৭-৩৪০৩০২

হযরত মাওলানা ফরীদ আহমদ দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ইমাম ও খতীবঃ
  • ফোনঃ ০১৮১৬-৪৯৯৩৪৬

হযরত মাওলানা আবুল কাশেম দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৭১১-১৭৮৮৫৭

হযরত মাওলানা ক্বারী আবু রায়হান দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • প্রক্ষাত ক্বারীঃ বাংলাদেশ টেলিভিশন
  • ইমামঃ লালবাগ শাহী মসজিদ
  • ফোনঃ ০১৭১১-২৪৩৬৬৮

হযরত মাওলানা মাকসুদুর রহমান দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ইমাম ও খতীবঃ
  • ফোনঃ ০১৯১২-৩৫৫৪৫৫

হযরত মাওলানা সাখাওয়াত হোসাইন রাজী দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • উপদেষ্টাঃ হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ
  • খতীবঃ
  • বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক
  • ফোনঃ ০১৬৭৪-৬০৯৯৮২

হযরত মাওলানা ক্বারী নাসিরুদ্দীন দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ইমামঃ লালবাগ শাহী মসজিদ
  • ফোনঃ ০০১৭১১-২৬৩৯৫৬

হযরত মাওলানা ত্বালহা দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৩-৩৭১৮১২

হযরত মাওলানা ফারুক আহমদ দা. বা.

  • উস্তাযঃ লালবাগ জামেয়া
  • ফোনঃ ০১৯১৪-১৫৯০৪৫
Spread the love