হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ.
July 19 2026, 06:10
নাম :- মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা
জন্ম তারিখ / জন্মস্থান :- হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. অনুমানিক 1870 খ্রিস্টাব্দের কোন এক শুভ মুহূর্তে কানাইঘাট উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মরহুম মোহাম্মদ গাজী এবং দাদা মরহুম হাসিম আলি। বংশগত ভাবে তাদের পরিবার ছিল ধর্মীয় অনুশাসিত।
শৈশব কাল :- সকল দর্শনই যে বিষয় ঐক্যমত পোষণ করে তা হচ্ছে \”প্রত্যেক প্রাণী মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে\”। সুতরাং মানুষ তো আর সেই নীতির বাহিরে যেতে পারে না। মানুষ জন্মগ্রহণ করে আবার মৃত্যুবরণ করে। মানুষ পৃথিবীতে নশ্বর, তবে কিছু মানুষ এমন যারা তাদের স্বীয় কল্যাণকর্মে বেঁচে থাকে অবিনশ্বর হয়ে। যুগ যুগান্তরে, কাল কালান্তরে আগত প্রজন্ম তাদেরকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে। অনেক কিছুই পরিবর্তন হয়। এমন কি পরিবর্তন হয় স্বাধীন দেশের মানচিত্রও। কিন্তু কীর্তিমানের মৃত্যু হয় না। হতে পারে না। বাংলাদেশের আধ্যাত্মিক রাজধানী খ্যাত সিলেট জেলার পূর্ব সীমান্তে জন্ম হয় এমন এক কৃীর্তিমান পুরুষের। যিনি দেশ, জাতি, মানুষ, মাটি ও মায়ের জন্য রেখেছেন অনেক কিছুই। জীবনের পড়ন্ত বেলায়ও নিজেকে রেখেছেন দ্বীন ইসলাম ও দেশ প্রেমের নিষ্ঠাবান। বৃহত্তর জনতার এক কোন জন্য পুরুষের কথা বলছি। যাকে প্রজন্ম শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করার কথা ছিল। শরনা করে যার নাম লিপিত থাকার কথা ছিল ইতিহাসের পাতায়। কিন্তু হায়! আমরা এই কোন প্রজন্ম? বিগত দুইশত বছরেও তার নাম স্থান পায়নি ইতিহাসের স্বর্ণাক্ষরে। গত ২০১৯ সালের মার্চে প্রকাশিত আখলাক হুসাইন রচিত \”আকাবিরে গোয়াইনঘাট\” গ্রন্থে উঠে আসে ক্ষণজন্মা এই পুরুষের কথা। শতবর্ষ পূর্বেকার সেই মহা মনীষী হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ.। শৈশবে যিনি ছিলেন অত্যন্ত শান্ত শিষ্ট স্বভাবে অধিকারী।
শিক্ষা জীবন :- বাঁশবাড়ি মক্তবে তার বাল্য শিক্ষার হাতে খড়ি। এরপর স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করার পর ধারণা করা হয় তিনি জিঙ্গাবাড়ী মাদ্রাসায় মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন। উল্লেখ্য বাঁশবাড়ি এলাকায় আহলে হাদিসের আধিপত্য প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। হযরত মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণকালে নিজের বিবেকে চিন্তা করে দেখলেন যে, আহলে হাদিসরা যেভাবে কোন ইমাম না মেনে সরাসরি হাদিস মানার বক্তব্য প্রদান করে এটা নিতান্তই ভুল কথা। কারণ সকল মানুষ হাদিসের পন্ডিত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়। সুতরাং আহলে হাদিসের মধ্যকার সাধারণ মানুষগুলো তাদের কোন হাদিস বিশেষজ্ঞের অনুসারী হওয়া আবশ্যক হয়ে পড়বে। এই যুক্তি তিনি বিভিন্ন জনের সাথে উত্থাপন করা শুরু করলে সীয় চাচা আহলে হাদিসের একজন বড় আলেম শায়েখ তাহির তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. স্বীয় জ্ঞান-গরীমা নিসঙ্গতার দরূন চাচার বিরোধিতার জবাব না দিয়ে দারুল উলুম দেওবন্দ চলে যান। বিশ্ব বিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে তিনি ফিক্হ, হাদিস ও তাফসীরে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে ও জ্ঞান গরীমায় পূর্ণ হয়ে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। কিন্তু সিওর চাচার শায়েখ তাহির ততদিনে এলাকায় একটি আহলে হাদিস মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং তার বিরুদ্ধে জনসমর্থন তৈরি করে রাখেন। তিনি দেশে প্রত্যাবর্তনের পর এলাকার প্রতিকূল পরিবেশ প্রত্যক্ষ করে তথা হতে হিজরত করার মনস্থ করেন এবং সপরিবারে সেখান থেকে গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেপুর ইউনিয়নস্থ বিন্নাকান্দি গ্রামে গমন করেন।
কর্ম জীবন :- কানাইঘাটের বাশবাড়ি থেকে বিন্নাকান্দি গমনের পর তিনি বিন্নাকান্দি জামে মসজিদে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমান বিন্নাকান্দি বাজারের পশ্চিমের বাড়িটি ক্রয় করে তথায় স্থায়ী বসবাস শুরু করেন। দীর্ঘদিন তিনি বিন্নাকান্দি জামে মসজিদে ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন। লম্বা সময় বিন্নাকান্দি অবস্থানের কারণে সেখানে সকল পেশার মানুষের সাথে তার সম্পর্ক হয়ে যায়। তৎকালে বিন্নাকান্দির সবচেয়ে সম্পদশালী ও জমিদার ব্যক্তি ছিলেন আবিদ আলী চৌধুরী রহ.। তিনি অত্যন্ত নেক ও জনদরদী মানুষ ছিলেন। সাধারণ মানুষের যেকোন প্রয়োজনে এগিয়ে আসতেন তিনি। দান খায়রাতে থাকতেন সর্বদা এগিয়ে। তিনি যে আল্লাহর অতিপ্রিয় বান্দা ছিলেন এর প্রমাণ মিলে তার মৃত্যুতে। তিনি শেষ জামানায় সস্ত্রী হজ্জে গমন করে পবিত্র মক্কায় কাবা ঘর তওয়াফ করা অবস্থায় ইন্তেকাল করেন এবং সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়। আবিদ আলী চৌধুরীর কোন ছেলে সন্তান ছিলেন না। একদা মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. আবিদ আলী চৌধুরী রহ.কে বললেন; জনাব আপনার তো কোন ছেলে সন্তান নেই। আমি কি আপনাকে এমন একটি পন্থা বলব? যার দ্বারা কিয়ামত পর্যন্ত আপনার সন্তানাদি জন্ম নেবে? আবিদ আলী চৌধুরী রহ. বলেন; অবশ্যই বলুন! তখন তিনি বললেন আল্লাহ পাক আপনাকে অনেক সম্পদ দিয়েছেন। আপনি এগুলো অবশ্যই ভালো পথে ব্যয় করছেন এতে কোন সন্দেহ নেই। তথাপি আমি আরও একটি ভালো কাজের কথা বলছি যা থেকে কেয়ামত পর্যন্ত আপনার রুহানি সন্তানাদি জন্ম নেবে। আপনি যদি আপনার সম্পদের কিছু অংশ দিয়ে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন তাহলে কিয়ামত পর্যন্ত যেসব ছেলে মেয়েরা এখানে লেখাপড়া করবে তারা হবে আপনার রুহানি সন্তান। মরহুম আবিদ আলী চৌধুরী এই বক্তব্যে এমন স্পৃহা পেয়েছিলেন যে তিনি তার সম্পদ থেকে ১২ হাল অথবা ১৪ হাল জমি মাদ্রাসার নামে দলিল করে দেন।
অবদান :- মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. মরহুম আবিদ আলী চৌধুরীর দান করা ১২হাল বা ১৪হাল জমিকে ভিত্তি করে ১৯১০ সালে মরহুম আবিদ আলী চৌধুরীর নামে বিন্নাকান্দি আবিদিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মাদ্রাসাটি প্রথমে বিন্নাকান্দি জামে মসজিদের মক্তব থেকে শুরু হলেও পরবর্তীতে মসজিদের উত্তরে একটি ছোট ভবন তৈরি করে সেখানে পড়ালেখা চলতে থাকে। এরপর এলাকার বিশিষ্টজনদের পরামর্শক্রমে বিন্নাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় স্থানান্তর করা হলে, উচ্চ বিদ্যালয়ের ভবনটিও মাদ্রাসার অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
বিন্নাকান্দি থেকে রাতারগুল গমনঃ
একসময় মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. বিন্নাকান্দি গ্রামের স্বীয় বাড়ি বিক্রি করে একই ইউনিয়নের রাতারগুল গ্রামে বাড়ি তৈরি করেন এবং সেখানে বসবাস শুরু করেন। জনমুখে সেই বাড়িটি মৌলভী বাড়ি হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ করে এবং তিনি মৌলভী বাড়ির মেসাব নামে খ্যাতি অর্জন করেন। রাতারগুল গমন করে তিনি এলাকার মুরুব্বিয়ানদের সাথে পরামর্শ করে রাতারগুল জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেন। কথিত আছে, তার বাড়ির উত্তরটিলায় একটি ছোট ঘর ছিল। তাতে তিনি নির্জনে ইবাদত বন্দেগীতে লিপ্ত থাকতেন। তিনি নির্জনে থাকাকে পছন্দ করতেন তাই তিনি বিন্নাকান্দি থেকে রাতারগুল যেখানে তৎকালে খুবই কম জনবসতি ছিল সেখানে গমন করেন।
পারিবারিক জীবনঃ
পারিবারিক জীবনে মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. তার সহধর্মিনী মরিয়ম বিবিকে নিয়ে খুবই সুখী ছিলেন। তিনি ছিলেন পাঁচ ছেলে সন্তান ও তিন মেয়ে সন্তানের গর্বিতজনক। ছেলেদের মধ্যে একজন শিশুকালেই ইন্তেকাল করেন তার নাম ছিল আব্দুর রহিম। অন্য চার ছেলের ক্রমতারা বিদ্যমান। তারা হলেন; ১. মাস্টার সাইদুর রহমান, ২. মরহুম আব্দুল ওয়াহিদ, ৩. মরহুম মুন্সী আব্দুল লতিফ ও ৪. আব্দুল আজীজ। তিনজন মেয়ে সন্তান হলেন, ১. জয়বুন নেসা, ২. আছমা বেগম ও ৩. আছমা বেগম।
মৃত্যু তারিখ :- মাওলানা আব্দুল হামিদ রাজা রহ. অনুমানিক ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দের কোন এক শুভ লগ্নের রাতারগুলে মৌলভী বাড়িতে থাকা অবস্থায় বার্ধক্য জনিত কারণে প্রভুর ডাকে সাড়া দিয়ে চির বিদায় গ্রহণ করেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! রাতারগুল জামে মসজিদ মাঠে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাকে গুলস্ত নিজ বাড়িতে পারিবারিক কবরস্থানে চিরস্নিদ্রায় শায়িত করা হয়।
মোবাইল :-
তথ্য দানকারীর নাম :- কারী মাওলানা আখলাক হুসাইন
তথ্য দানকারীর মোবাইল :- +৮৮০১৭৪৪৯১২৭৪৭
