সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা ক্বারী ছায়াদুল্লাহ রহ.

July 18 2026, 10:52

Manual3 Ad Code

নাম :- মাওলানা ক্বারী ছায়াদুল্লাহ রহ.

জন্ম তারিখ / জন্মস্থান :- 27/05/1932 ইং, চাঁদপুর

Manual8 Ad Code

শৈশব কাল :- মাওলানা ক্বারী ছায়াদুল্লাহ খান রহ.
জীবন ও কর্ম
ভুমিকা
চাঁদপুর সদরের দক্ষিণে ঐতিহ্যবাহী মুমিনবাড়ীর স্বনামধন্য আলেম হযরত মাওলানা ইসমাঈল সাহেব রহ. [মৃত্যু : ১৯৮৪ ইং] এর ঔরষে ১৩ জৈষ্ঠ্য ১৩৩৯ বাংলা মোতাবেক ২৭ মে ১৯৩২ ইং সনে মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. এর জন্ম। মরহুমের জীবন কেটেছে কেবল মাদরাসার খেদমত আর তালিবুল ইলমদের জীবন গড়ার মধ্য দিয়ে। সুখে-দুঃখে তিনি মাদরাসার স্বার্থকে রাখতেন সবার আগে। তালিবুল ইলমদের জীবন গড়তে গিয়ে নির্দ্বিধায় বিলিয়ে দিয়েছেন নিজের জীবন-যৌবন সবটাই। নিজে না খেয়ে একজন তালিবুল ইলমকে খাইয়েই তিনি সুখ পেতেন। কোন ছাত্র অসুস্থ হয়ে গেলে তার সেবায় নির্ঘুম রাত কাটিয়ে দেয়াকে গ্রহণ করে নিতেন খুবই সানন্দে। যার ফলে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার পর ৫ বছর অতিক্রম হয়ে গেলেও এখনও বহু ছাত্র স্মরণ হলে ছুটে যান চাঁদপুরের সুদূর মুমিনবাড়ি। আল্লাহ তার কবরকে জান্নাতের বাগান বানিয়ে দিন। আমীন।
জন্ম ও বংশ পরিচয়
নাম- আবুল খায়ের মুহাম্মদ ছায়াদুল্লাহ খান
পিতা- পীরে কামেল মাওলানা ইসমাঈল খান রহ.
মাতা- রহমতেন্নেছা
দাদা- মুনশি ছালামত উল্লাহ খা
নানা- মৌলবী মুহাম্মদ সায়ীদ (তাওয়ারীখে মোহাম্মদী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও কোরআনের মুক্তাহার এর লেখক)
দাদার দিকের বংশধারা যতটুকু জানা যায়, তা এমন- ছায়াদুল্লাহ বিন ইসমাঈল বিন সালামাতুল্লাহ বিন রোকন খাঁ/কোকন খাঁ ওরফে মমিন।

শিক্ষা জীবন :- প্রাথমিক শিক্ষা
কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. এর পৈত্রিক বাড়িতেই ছিল বড় মাদরাসা। মুমিনবাড়ি মাদরাসা। সেখানেই নিজ জ্যেঠা কারী ইবরাহীম রহ. এর হাতেই প্রাথমিক শিক্ষার হাতেখড়ি। আলিফ-বা-তা থেকে শুরু করে পবিত্র কুরআন শরীফ বিশুদ্ধ তেলাওয়াতের শিক্ষা তিনি গ্রহণ করেন এখানেই।
উচ্চ শিক্ষা
এরপর স্বীয় পিতার প্রতিষ্ঠিত ফরক্কাবাদ ইসলামিয়া সিনিয়র [আলিম] মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে দুই বছর অধ্যয়নের পর উচ্চ শিক্ষালাভের উদ্দেশ্যে চলে যান শাহ্তলী কামিল মাদরাসা, চাঁদপুর-এ। সেখানে একটানা জামাতে উলা (মেশকাত) পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
১৯৬৪ ইং সালে হাদিস অধ্যয়নের জন্য চলে যান দারুল উলুম মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। সেখানে তার সাথী ছিলেন নরসিংদীর শেখেরচর মাদরাসার সাবেক মুহতামিম ও হাফেজ্জী হুজুর রহ. এর খলীফা মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব রহ., ফরিদাবাদ মাদরাসার মিনার হুজুর, কচুয়া তুলপাই এর মাওলানা শহিদুল্লাহ সাহেব প্রমুখগণ।
উস্তাদবৃন্দ
হাটহাজারী সাদরাসার মাওলানা আব্দুল ওয়াহহাব রহ., মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম রহ., মাওলানা হামেদ সাহেব রহ., মাওলানা আব্দুল আযীয রহ. প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত আলেমগণের নিকট তিনি শিক্ষালাভ করেন। হাটহাজারী মাদরাসায় পড়াকালীন তিনি হযরত মাওলানা হামেদ সাহেব রহ. এর একান্ত খাদেম ছিলেন। হযরতের বাড়ির যাবতীয় কাজসহ ধান ইত্যাদি চাষাবাদের কাজগুলো তিনি আঞ্জাম দিতেন খুবই দক্ষতার সাথে।
ছাত্রবৃন্দ
লালমাটিয়া মাদরাসার দীর্ঘদিনের মুহাদ্দিস মাওলানা মুরতাজা রহ. ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহাদ্দিস মুফতি ইমাদুদ্দিন দা.বা., মাওলানা আব্দুল কাইয়ুম সোবহানী, জামিয়া কারিমিয়া রামপুরার মুহতামিম মাওলানা মকবুল সাহেব, মাওলানা জাফর সাহেব, শেখেরচর মাদরাসার বর্তমান মুহতামিম মাওলানা আশরাফ আলী সাহেব, লালমাটিয়া মাদরাসার সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি মাসুদ সাহেবসহ অসংখ্য ছাত্র তিনি নিজ হাতে গড়েন।

Manual5 Ad Code

কর্ম জীবন :- কর্ম জীবন
হাটহাজারী মাদরাসা থেকে ফারেগ হওয়ার পর ১৯৬৬ ইং সনে তিনি গাজিপুরের জয়দেবপুরস্থ ভাওয়াল এলাকার ফিরোজ আলি আমানিয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে তার কর্মজীবন শুরু। এরপর সেখান থেকে ঢাকার জিনজিরা এলাকার এক মাদরাসায় ছয় মাস কাটিয়ে চলে যান হাফেজ মহসিন সাহেব প্রতিষ্ঠিত চাঁদপুরের ঐতিহ্যবাহী মুমিনপুর মাদরাসায়। সেখানে দুই বছর শিক্ষকতার পর দেশে স্বাধিনতা যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায় বিভিন্ন মাদরাসা। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি কিছুদিন চাঁদপুরের ওছমানিয়া কামিল মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন।
ফরিদাবাদ মাদরাসা : [প্রথম বার] অন্যান্য মাদরাসার মত ফরিদাবাদ মাদরাসাও বন্ধ ছিল যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে। দীর্ঘদিন পর মাদরাসা খোলা হলে ১৯৭২ ইং সালে হযরত মাওলানা হেদায়েতুল্লাহ সাহেব রহ. এর আহ্বানে তিনি চলে আসেন ফরিদাবাদ মাদরাসায়। ১৯৮৪ ইং সাল পর্যন্ত তিনি জামিয়া ফরিদাবাদেই শিক্ষকতা করেন।
নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন : কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. অর্পিত দায়িত্ব পালনে পূর্ন সচেষ্ট থাকতেন। দায়িত্ব পালনে অবহেলা লক্ষ্য করা যায়নি তার দীর্ঘ জীবনের কোনদিনই। একবারের ঘটনা-
তখন ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন তার পিতা মাওলানা ইসমাঈল রহ.। অন্যান্য দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. বোর্ডিং এর দায়িত্বও পালন করতেন। একদিন মুহতামিম সাহেবের ছোট ভাই ও ভাতিজা কোন এক কাজে ফরিদাবাদ মাদরাসায় এলেন। তখন দুপুর বেলা খাবারের সময়। মুহতামিম সাহেবের খাদেম মেহমান দেখার পর বোর্ডিং এ গেল খানা আনতে এবং বাবুর্চির নিকট মুহতামিম সাহেবের মেহমান আসছেন বলে খানা বাড়িয়ে দিতে বলল। বাবুর্চিও অতিরিক্ত খাবার দিয়ে দিলেন। তখন বোর্ডিং এর হাজিরা ডাকছিলেন কারী ছায়াদুল্লাহ রহ.। তিনি অতিরিক্ত খাবার নেয়ার বিষয়টি টের পেয়ে গেলেন। সাথে সাথে বাবুর্চি ও খাদেমকে ধমক দিয়ে অতিরিক্ত খাবার রেখে দিলেন।
বাবুর্চি-খাদেম তো হতবাক! মুহতামিম সাহেবের মেহমানের জন্য নেয়া খাবার ফেরৎ রেখে দিলেন! তাও মেহমান অন্য কেউ নন; নিজের চাচা ও চাচাতো ভাই। খাদেম গিয়ে বিচার দিলেন মুহতমিম সাহেবের নিকট। মুহতামিম সাহেব সব শুনে বললেন, তুমি অতিরিক্ত খানা আনতে যাও কোন সাহসে? নির্ধারিত পরিমাণ থেকে একটি ভাতও অতিরিক্ত দেয়ার মানুষ উনি না! যাও হোটেল থেকে খাবার নিয়ে আস মেহমানের জন্য।
১৯৮৪ ইং সালে ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতমিম নিজ পিতা মাওলানা ইসমাঈল এর মৃত্যুর পর দাওরার সহপাঠি মাওলানা আব্দুল মতিন রহ. এর আহŸানে চলে যান নরসিংদীর জামিয়া ইমদাদিয়া আরাবিয়া শেখেরচর। ১৯৮৫ ইং থেকে ২০০১ ইং সাল পর্যন্ত উনিশ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেন।
এ সময় শেখেরচর মাদরসার ব্যাপক উন্নতি হয়। মাদরাসার দাতা সংগ্রহ, ব্যবস্থাপনা, বিল্ডিং নির্মাণ, পড়া-লেখার মানোন্নয়নসহ সকল বিষয়ে বিশেষ অবদান রাখেন কারী ছায়াদুল্লাহ রহ.। এলাকার সকল মানুষ তখন একবাক্যে ‘বড় কারী সাহেব’ নামে চিনতেন। যে কোন কঠিন পরিস্থিতি তিনি বিচক্ষণতার সাথে খুব সহজেই সমাধান করে ফেলতেন।
২০০১ ইং সালের মাঝামাঝি সময় একবার তিনি বাড়িতে যাওয়ার পর এক দূর্ঘটনায় তার ডান পা ভেঙ্গে যায়। পূর্ণ পা ব্যান্ডেজ থাকায় চলাফেরা একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। যার ফলে তিনি মাদরাসা কর্তৃপক্ষকে কর্মজীবন ইতি টানার ইচ্ছার কথা জানিয়ে বাড়িতেই থেকে যান। এভাবেই তিনি বাড়িতে দুই-তিন মাস সময় কাটান। কিন্তু মাদরাসা ও ছাত্রদের খেদমতের নেশায় তিনি সর্বদা আনচান করতেন। অবসর সময় কাটাতে তার কোনভাবেই ভালো লাগছিল না।
ফরিদাবাদ মাদরাসা : [দ্বিতীয় বার] তখন ২০০৩ সাল। হঠাৎ একদিন মুমিনবাড়ি মাদরাসার নম্বরে ফোন করে কারী ছায়াদুল্লাহকে তলব করলেন একজন দায়িত্বশীল। তার সাথে জরুরী কথা আছে। পরে ফোন করবেন জানিয়ে কেটে দেন। নির্ধারিত সময় কল রিসিভ করার পর সালাম আদান-প্রদানের পর বুঝতে পারলেন, ফোন করে তলবকারী হলেন ফরিদবাদ মাদরাসার হযরত মুহতামিম আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস সাহেব। [দা.বা.] মুহতামিম সাহেব সরাসরি বললেন, আপনি বাড়ি বসে আছেন কেন? ফরিদাবাদ চলে আসেন; আগামীকালই চলে আসেন। ততোদিনে তিনি মোটামুটি সুস্থ।
মুহতামিম সাহেবের নির্দেশমত তিনি পরদিনই চলে এলেন। সাধারণ পোষাকে। দু’একটি জামা আর লুঙ্গি গামছা নিয়ে। তিনি জানেন না, মুহতামিম সাহেব তাকে কেন ডেকেছেন। ফরিদাবাদ মাদরাসায় এসে হযরত মুহতামিম সাহেবের সাথে সাক্ষাত করেন। সালাম-মুসাফাহা ও কুশলাদী বিনিময়ের পর মুহতামিম সাহেব তালিমাতের যিম্মাদার মাওলানা ফয়জুল্লাহ সাহেবকে ডেকে বললেন, ইনি মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ সাহেব। উনাকে অমুক অমুক কিতাব পড়ানোর সব ধরণের ব্যবস্থা করে দিন।
মুহতামিম সাহেবের কথা শুনে কারী ছায়াদুল্লাহ সাহেব অবাক হয়ে গেলেন। বললেন, আমি তো বাড়ি থেকে কাঁথা-বালিশ কিছুই আনিনি। মুহতামিম সাহেব বললেন, লাগবে না; আপনি আব্দুল কাদির সাহেব এর সাথে থাকা শুরু করেন। আমি উনাকে বলে রেখেছি।
ফরিদাবাদ মাদরাসায় তখন আমরা তিন ভাই পড়তাম। ফরিদাবাদ মাদরাসায় আব্বার একাধিক দিন অবস্থান দেখে আমরাও আশ্চর্য হয়ে যাই। জিজ্ঞেস করার সাহস হয়নি, আব্বা কী প্রয়োজনে এখানে অবস্থান করছেন। আব্বা আমাদেরকে এ বিষয় কিছুই বলেন না। দুই-তিন দিন পর বিভিন্নজনের কাছে জানতে পারি, আব্বা এখন থেকে ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষক!
হ্যাঁ! তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষক। আমৃত্যু শিক্ষক। ২০০৩ সালে ফরিদাবাদ মাদরাসায় নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে যতদিন বেঁচে ছিলেন, ফরিদাবাদ মাদরাসার শিক্ষক হিসেবেই বেঁচে ছিলেন। জীবন সায়াহ্নে যখন অসুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যান এবং বিছানায় পড়া অবস্থায় চার বছর কাটান, তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসার কথা স্মরণ করতেন প্রতিটি মুহূর্তে। তাকেও ভুলেননি ফরিদাবাদ মাদরাসার মুহতামিম সাহেব ও কর্তৃপক্ষ। সর্বদাই খোঁজ খবর নিতেন। সুযোগ হলে জামিয়ার আসাতিযায়ে কেরাম ও ছাত্রবৃন্দ বাড়ি গিয়ে দেখে আসতেন।
বিরল ঘটনা : কওমী মাদরাসাগুলোতে সাধারণত কোন একজন উস্তাদকে যতদিন চাকুরি করেন, ততদিনই অযীফা দেয়া হয়। যে কোন কারণে মাদরাসা থেকে চলে গেলে তার অযীফা চালু রাখা ফান্ড দৈনতার কারণে সাধারণত সম্ভব হয়ে ওঠে না। তবে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ ব্যক্তিগত পর্যায়ে প্রয়োজন অনুপাতে যথাসম্ভব সহযোগিতার হাত বাড়ান। কারী ছায়াদুল্লাহ সাহেব রহ, এর ব্যপারটি ছিল ভিন্ন। তিনি অসুস্থতার কারণে একটানা চার বছর যাবৎ মাদরাসা ছেড়ে বাড়িতেই ছিলেন। তথাপি ফরিদাবাদ মাদরাসার হযরত মুহতামিম সাহেব তার বেতন চালু রেখেছেন। প্রতি মাসে মাসে বেতন দিয়ে দিতেন। এমনকি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত গুনে বেতনের সমস্ত টাকা দিয়ে দেন। ফরিদাবাদ মাদরাসা তো বটেই; কওমী অঙ্গনেও যা এক বিরল ঘটনা।
ঠিক এমনই ঘটনা ঘটেছিল তার পিতা মাওলানা ইসমাঈল রহ. এর বেলায়ও। মৃত্যুর পূর্বে যবান বন্ধ হয়ে (ষ্ট্রোক করে) তিনি বেশ কিছুদিন বাড়িতে ছিলেন। ঐ কয়েক দিনের বেতন তাকেও দিয়ে দেন তৎকালীন ফরিদাবাদ জামিয়া কর্তৃপক্ষ।
মক্তবে শিশুদের জীবন গড়ার প্রত্যয়
কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. খুবই মেধাবি ও মেহনতি ছিলেন। যার কারণে দরসী কিতাবের সকল কিতাবের উপরই এক বিশেষ পান্ডিত্য ছিল। বিশেষত হেদায়া কিাতবের বেশ কিছু জটিল মাসআলা তিনি খুব সাবলীলভাবে বুঝিয়ে দিতেন। ফরিদাবাদ মাদরাসায় প্রথমবার এবং শেখেরচর মাদরাসায় থাকাকালে হেদায়া ও সিরাজীসহ আরও বিভিন্ন কিতাবের পাঠদানও করেছেন বিভিন্ন সময়। সিরাজী কিতাবের উপর পারদর্শিতা তার এক বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল। মৃত্যুর আগে অসুস্থ থাকাকালীনও ফারায়েয সংক্রান্ত যে কোন বিষয় সামনে এলে তিনি মুখস্থ ইবারত বলে দিয়ে মাসআলা সমাধান করে দিতেন। শুনলে মনে হতো, এইমাত্র তিনি মুতালা করে এসেছেন।
গণিত বিষয়ে পারদর্শিতা : বাংলা ও গণিতে এক বিশেষ পান্ডিত্ব ছিল কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. এর। বাংলা লেখা-লেখিতে শব্দ/বানান তার কখনোই ভুল হত না। আর গণিতে তিনি কী পরিমাণ পারদর্শী ছিলেন, তা বেফাকের মহাসচিব মাওলানা আব্দুল জাব্বার জাহানাবাদী রহ. এর মুখেই শুনুন-
আব্বাজান [কারী ছায়াদুল্লাহ রহ.] একবার ব্যক্তিগত কোন প্রয়োজনে বেফাক অফিসে আমাকে নিয়ে গেলেন এবং মাওলানা আব্দুল জাব্বার জাহানাবাদী রহ. এর নিকট আমার পরিচয় দিলেন। মহাসচিব রহ. দীর্ঘ সময় কথাবার্তা বলার পর খাদেমকে চা আনতে বললেন। আমিসহ সেখানে তিনজন; তাই মহাসচিব তিন কাপ চায়ের কথা বললেন। মুরুব্বিদের সামনে বসে খেতে সংকোচ বিধায় আমি আমার জন্য চা আনতে নিষেধ করলাম। মহাসচিব রহ. সাথে সাথে বলে উঠলেন, ভাতিজা! চা-টা খাও। বেফাক প্রতিষ্ঠাকালীন তোমার বাবার কষ্টের সেই দিনগুলোর কথা পৃথিবীবাসী ভুলে গেলেও আমি কখনও ভুলতে পারবো না। তখনকার দিন আমরা পরীক্ষার পর থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত সমস্ত কাজ করতাম হাতে। এত বেশি লোক ছিল না। ছিল না কোন ফান্ডও। রমযান মাসে তারাবীহর পর থেকে সাহরী পর্যন্ত সারা রাত আমরা কাজ করতাম। এক কাপ চা-ও জুটতো না আমাদের কপালে। সমস্ত ফলাফল কাগজে উঠানোর পর খুব বেশি প্রয়োজন হতো তোমার বাবার। ওনার কোন ক্যলকুলেটর লাগত না। শুধু প্রাপ্ত নম্বরের উপর হাত বুলিয়ে যেতেন। আর মোট এর ঘরে মোট লিখে ফেলতেন। আশ্চর্যের ব্যপার ছিল, ঐ হিসাবটা কখনোই ভুল হত না!
দরসী নেসাবের সমস্ত কিতাবের উপর এত বেশি পারদর্শিতা থাকা সত্বেও তিনি সর্বদা মক্তবের ছোট ছোট বাচ্চাদের পড়াতে সাচ্ছন্ধ বোধ করতেন। যে কারণে তিনি সর্বদা কারী সাহেব বা কারী ছায়াদুল্লাহ নামেই পরিচিত। কিতাব বিভাগে না পড়িয়ে মক্তব নিয়ে পড়ে থাকা প্রসঙ্গে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এটা আমার উস্তাদের নির্দেশ। হাটহাজারী মাদরাসায় পড়াশোনা শেষ করে বাড়ি চলে আসার সময় আমি আমার মাখদুম উস্তাদ মাওলানা হামেদ সাহেব রহ, এর কাছে দোয়া চাওয়ার জন্য গেলাম। হুজুর আমাকে বললেন, তোমার মাঝে ছাত্র গড়ার যোগ্যতা আছে, তুমি বাচ্চাদেরকে পড়াইও। সেই থেকে আমি বাচ্চাদের পড়াতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করি। এ ছাড়া কিতাব বিভাগের বড় ছাত্ররা সাধারণত উস্তাদগণের খেদমত করে থাকে। কিন্তু মক্তবের বাচ্চারা উস্তাদদের খেদমতের উপযুক্ত নয়; বরং নিজেরাই খেদমত গ্রহণের উপযুক্ত। মক্তবে পড়ালে তাদের খেদমত করা যায়। তিনি বলতেন, আমি তালিবুল ইলমদের খেদমত করে সুখ পাই।
বাস্তবেই তিনি ছিলেন মক্তবের ছাত্রদের খাদেম। ছোট ছোট বাচ্চাদের খানা খাইয়ে দেয়া, প্লেট-বাটি ধুইয়ে দেয়া, বিছানা বিছিয়ে দেয়া, অসুস্থ হলে মাথায় পানি দেয়া, কোন ছাত্রের কাপড়-চোপড় ছিঁড়ে গেলে নিজ হাতে সেলাই করে দেয়াসহ অসুস্থদের সেবা-শুশ্রƒষা করা এমনকি কেউ পেশাব-পায়খানা করে দিলে তা পরিষ্কার করা- সবই তিনি নিঃস্বংকোচে করে ফেলতেন।
বিবাহ বন্ধন
মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. তার বিবাহের বৃত্তান্ত বেশ রসিয়ে বলতেন। একবার তার নানি অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার বাবা মাওলানা ইসমাঈল রহ. তাকে নানিকে দেখতে যাওয়ার জন্য আদেশ দেন। হাতে দ্ইু আনা দিয়ে বলেন, তোর নানির অসুখ। তার জন্য একপোয়া আঙ্গুর নিয়ে যা। বাবার আদেশ মত আঙ্গুর কিনার জন্য তিনি পায়ে হেঁটে লাকসাম (প্রায় ৪০ কিলোমিটার) গেলেন এবং একপোয়া আঙ্গুর কিনে নানির জন্য হাদিয়া নিয়ে গেলেন। তিনি তখন চাঁদপুর পুরাণ বাজার জামে মসজিদের কোয়ার্টার বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। নানি আঙ্গুর দেখে অত্যন্ত খুশি হলেন। চালনিতে করে ধুয়ে বাড়ির সবার মাঝে একটি-দুটি করে বিলাতে লাগলেন। আর বলতে থাকলেন, আমার নাতি আমার জন্য বিদেশি ফল আঙ্গুর আনছে!
নানিকে দেখতে গিয়ে তিনি সেখানে দুইদিন অবস্থান করলেন। এই দুই দিন নাস্তা-খানা ইত্যাদি কখনো নানি নিজেই দিয়ে যেতেন। আবার কখনো নাতনিকে (কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. এর মামাতো বোন) দিয়ে পাঠাতেন। মামাতো বোনের বয়স ৮/৯ এর মত হওয়ার কারণে তার সাথে খুব একটা কথা বলতে চাইতেন না। বারবার নানি তাকে পাঠায় বলে আবার কিছুটা বিরক্তও ছিলেন। দুই দিন বাড়ি ফিরে আসার পর বাবা তার নানা-নানি ও অনান্যদের খবরাখবর নেয়ার পর জিজ্ঞেস করলেন, তোর মামাতো বোন অমুককে দেখেছিস? তিনি উত্তর দিলেন, দেখেছি তো! নানি খালি তাকে দিয়েই খানা পাঠাইত। ঘরে বুঝি আর কোন মানুষ নাই! বাবা টিপ্পুনি কেটে বললেন, এই মানুষই তোর মানুষ। যার অর্থ কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. তখন বুঝেননি। বিবাহ-শাদীর পর তিনি বুঝতে পারেন যে, তাকে আঙ্গুর নিয়ে নানির বাড়ি পাঠানো, নানি তার নাতনিকে দিয়ে খাবার পাঠানো সবই শাশুরী-জামাতার পূর্বপরিকল্পিত। আর বাবার কথার অর্থও তখন বুঝে ফেলেন।
১৯৬৬ সালের ফেব্রæয়ারি মাসের ৬ তারিখ শুক্রবার জুমার দুই আযানের মধ্যবর্তি সময়ে আকদ সম্পাদিত হয়। বিবাহের খুৎবা প্রদান করেন, হযরত মাদানী রহ. এর বিশেষ খলীফা মাওলানা দেলোয়ার হুসাইন ফেনবী (ফেনওয়ার হযরত) রহ.।
মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. স্বীয় মামাতো বোনকে বিবাহ করেন। তার মামা ও শ^শুর ছিলেন চাঁদপুরের কৃতীসন্তান বাংলাদেশের খ্যাতনামা আলেমদের মধ্যমণি, বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, রাজনীতিক, সাহিত্যিক, সমাজসেবক, অলিয়ে কামেল হযরত মাওলানা আব্দুল হক রহ.।
ইসলাহী তাআল্লুক
লেখাপড়ার অধ্যায় ঘুচিয়ে নিজের আত্মশুদ্ধির লক্ষ্যে নিজ পিতার পরামর্শে হযরত হুসাইন আহমদ মাদনী রহ. এর খলীফা ফেনুয়ার হযরত, মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন রহ. এর হাতে বাইয়াত হন। তার ইন্তেকালের হযরত হাফেজ্জী হুজুর রহ, এর খলীফা হযরত মাওলানা আব্দুল হাই পাহাড়পুরী রহ. এর হাতে বাইয়াত হন। পাহাড়পুরী রহ. এর ওফাতের পর জীবনের শেষ দিকে শাইখুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী রহ. এর বাতানো সাবক আদায় করতেন। এ ছাড়াও ফরিদাবাদ মাদরাসার প্রধান মুফতী, ফুলছোয়ার পীর সাহেব মুফতী আবু সাঈদ সাহেব এর বিভিন্ন ইসলাহী মাহফিলগুলোতে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করতেন।

অবদান :- কারামত
এ ঘটনা মরহুম আব্বাজানের মুখেই আমরা অনেকবার শুনেছি। বাড়ীর নিকটেই চাপিলা গ্রামের গাজী বাড়ীতে তখন তিনি লজিং থাকতেন। লজিং ঘরের মালিক মরহুম আব্দুর রশিদ গাজী ছিলেন তার পিতা মাওলানা ইসমাঈল রহ. এক একান্ত ভক্ত। পেশায় একজন মাছ ব্যবসায়ী/জেলে। দলবেঁধে জাল দিয়ে সারাদিন যে মাছ শিকার করতেন, সন্ধ্যার পর তা বিক্রি করতেন চাঁদপুরের পুরাণ বাজারে। মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে (চাল কিনার সাধ্য না থাকায়) কিনে আনতেন আটা।
তাদের ঘরের পাশেই ছিলো একটি বারোমাসি তালগাছ। গাছ থেকে পাঁকা তাল পড়লে তাই হতো রুটির সাথে ব্যাঞ্জন। কোনোদিন তাল না পড়লে সেদিন শুধু শুকনো রুটি; মাছ বিক্রি না হলে শুধু তাল। আর কোনোটিই না হলে সেদিন অনাহার। এই ছিলো তাদের জীবন।
একবার অনাহারের দিন এলো। মাছ বিক্রি হচ্ছে না, গাছ থেকে তালও পড়ছে না। পেটের ক্ষুধা নিয়ে চলে এলেন নিজ বাড়ীতে। লজিং-এ আর গেলেন না। কেটে গেল একদিন, দুইদিন, তিনদিন। তৃতীয় দিন মরহুম আব্দুর রশিদ গাজী নালিশ নিয়ে এলেন পিতা মাওলানা ইসমাঈল রহ.-র কাছে।
নালিশের কারণ শুধু তার লজিং-এ না যাওয়া নয়; তাদেরকে অর্ধাহারে রাখাও। নালিশকারীর ভাষ্য ছিলো এমন- হুজুর! জানি আপনার ছেলের কষ্ট হয়। কিন্তু কী করবো। কয়েকদিন যে মাছ বিক্রি হয় না। আজ তিনদিন যাবৎ যদিও কিছু মাছ বিক্রি হচ্ছে; কিন্তু তাল তো পড়ছে না। শুকনো রুটি ক’দিন খাওয়া যায়! আপনার ছেলেকে পাঠিয়ে দেন। ভালো-মন্দ যাই হয়, মিলিমিশে খাবো। মাওলানা ইসমাঈল রহ. ছেলে ছায়াদুল্লাহকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে তার সাথে পাঠিয়ে দিলেন।
আল্লাহর ইচ্ছা! মাওলানা ছায়াদুল্লাহ তিনদিন পর লজিং-এ যাওয়ার সাথে সাথেই তাল পড়া শুরু হলো। এক-দু’টি নয়; পর পর তিনটি তাল।
এ ঘটনা বলে আব্বাজান রহ. হেসে দিয়ে বলতেন- তিনদিনের কাযা।
সন্তানাদী
মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. এর সন্তানাদী সর্বমোট নয় জন। সাত ছেলে ও দুই মেয়ে। বড় ছেলে হাফেজ ইউসুফ ছিলেন নয় সন্তানের মাঝে সবার প্রিয়। তার প্রখর মেধা, তাকওয়া-ত্বহারাত ও খোদাভীরুতাই ছিলো এই সবচেয়ে প্রিয় হওয়ার কারণ। কিন্তু অসুস্থতার দরুন তাকে পড়া-লেখায় শেষ পর্যন্ত নিয়ে যেতে পারেননি। পবিত্র কুরআন হিফজ করার পর কাফিয়া জামাত পর্যন্ত পড়ার সুযোগ হয়েছিলো। এরপর নানান অসুস্থতার কারণে বাড়ীতে চলে যান। মাত্র ২১ বছর বয়সে ১৯৯৪ ইং সালে আগস্ট মাসের ৬ তারিখ শুক্রবার তিনি ইন্তেকাল করেন। তিনি শেষ বয়সে বেশ কিছু লেখালেখি শুরু করেছিলেন। ছন্দাকারে শরীয়তের বিভিন্ন বিষয় খুব সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতেন এবং ছোট ভাই-বোন ও অক্ত-অনুরাগীদেরকে ওগুলো শিক্ষা দিতেন। যার কিছু কিছু পান্ডুলিপি আজও ঘরে সংরক্ষিত। বেঁচে থাকলে হয়তো দ্বীনের আরও বহুত খেদমত করে যেতে পারতেন।
মাওলানা ছায়াদুল্লাহ রহ. জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এ শোক ভুলতে পারেননি। ইউসুফ নামটি মনে পড়লেই যেন তার চোখ অশ্রæসিক্ত হয়ে যেত। আল্লাহ তাদের উভয়কে জান্নাতের সুউচ্চ মাকাম দান করুন এবং তাদেরকে আমাদের সকলের জন্য সুপারিশকারী Ñযার সুপারিশ কবুল করা হবেÑ হিসেবে কবুল করুন। আমীন।
নয় সন্তানের ধারাবাহিকতা এরূপÑ
১. হাফেজ মুহাম্মাদ ইউসুফ খান রহ.
২. হাফেজ মাওলানা ইয়াহইয়া খান
৩. হাফেজ মাওলানা ইয়াকুব খান
৪. মাওলানা ইউনুছ খান
৫. মাওলানা ইয়াসীন খান
৬. হাফেজ মাওলানা ইউশা খান
৭. মুসাম্মাৎ শুকরিয়া
৮. মুসাম্মাৎ জিকরিয়া
৯. হাফেজ মাওলানা মুফতী ইউহান্না খান
মাওলানা কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. তার সকল সন্তানকেই দ্বীনী শিক্ষা দিয়েছেন। শত কষ্টের পরও কখনও কোনো ছেলেকে সংসারের আয়ে একটু সহযোগিতার উদ্দেশ্যে পড়া-লেখা থেকে বিরত রাখেননি।
২ মেয়েকে উপযুক্ত আলেমদের হাতে সোপর্দ করে গেছেন। ছোট ছেলে ছাড়া বাকীদের বিয়ে-শাদীর কাজ নিজেই আঞ্জাম দিয়ে গিয়েছেন। পড়ালেখায় ব্যঘাত হবে বিধায় পড়া-লেখা চলাকালীন ছোট ছেলের বিয়ের কাজ সমাপ্তের চিন্তা করেননি।
বর্তমানে সবাই বিভিন্ন মাদরাসা মসজিদে দ্বীনের বিভিন্ন শাখায় খেদমত করে যাচ্ছেন।
জীবন সায়াহ্নে/অসুস্থতা
১ম বার ষ্ট্রোক : ২০০৬ ইং সালের মাঝামাঝি সময়। তিনি তখন ফরিদাবাদ মাদরাসায়ই অবস্থান করছিলেন। একদিন তাহাজ্জুদ পড়তে উঠে শরীরে খুবই দূর্বলতা অনুভব করেন। একাকী রুম থেকে বেরিয়ে অযু করবেন, এতটুকু শক্তি পাচ্ছিলেন না। কাউকে ডেকে জাগিয়ে তোলবেন, তাও সম্ভব হচ্ছে না। এভাবেই কেটে গেল ফজর আযান পর্যন্ত সময়টুকু। আযানের পর ধীরে ধীরে ছাত্ররা উঠতে শুরু করল। একজন ছাত্রকে ইশারায় ডেকে এনে অন্যান্য শিক্ষককে খবর দিতে বললেন। অল্প সময়ের মধ্যে অন্যান্য আসাতিযায়ে কেরাম এসে অফিসের মাধ্যমে যোগাযোগ করিয়ে আঞ্জুমান মুফীদুল ইসলামের এম্বুলেস নিয়ে এসে ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যাওয়া হল। ডাক্তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালেন, ব্রেন ষ্ট্রোক হয়েছে। সকলের দোয়া ও আল্লাহর খাছ মেহেরবনীতে চিকিৎসা শুরুর তিনদিনের মাথায় তিনি সুস্থ হয়ে যান। ডান হাত ও ডান পা হালকা একটু দূর্বলতা/অবস ভাব নিয়েই তিনদিন পর তিনি পুনরায় মাদরাসায় চলে আসেন।
২য় বার ষ্ট্রোক : ২০১৪ সালের শুরুর দিকে তার আবারো ব্রেন ষ্ট্রোক হয়। তখনও তিনি ফরিদাবাদ মাদরাসায় অবস্থান করছিলেন। স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজে [মিটফোর্ট হাসপাতাল] পনের দিন ভর্তি থাকার পর ডাক্তারগণ বোর্ড বসে সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদেরকে জানিয়ে দেন, এই রোগীর আর উন্নতি হবে না। এখন বাড়ি নিয়ে খেদমত করেন।
কারী ছায়াদুল্লাহ রহ. তখন মুখে কোন কথা বলতে পারতেন না এবং মুখে কোন খাবারও খেতে পারতেন না। এমনকি শোয়া থেকে একাকী বসতেও পরতেন না। ডান হাত-পা অবস। এ অবস্থাতেই বাড়ি নিয়ে যাওয়া হল। আল্লাহর মেহেরবানী! বাড়ি যাওয়ার দুই দিন পর থেকেই ধীরে ধীরে দু’একটি করে কথা বলতে সক্ষম হয়ে ওঠলেন। বলতে না পরা কিছু কথা তখন শ্লেটে লিখে বুঝাতেন। জ্ঞানী মানুষ বলে কথা! এর কিছুদিন পর মুখে কিছু কিছু খাবার খাওয়াও শুরু করলেন।
বাড়ি যাওয়ার সপ্তাহখানেক পর পূর্ণ স্মৃতিশক্তি ফিরে পেলেন এবং মুখে খাবার খাওয়া ও কথা-বার্তা স্বাভাবিক হয়ে গেল। স্মৃতিশক্তি পূর্ণরূপে ফিরে পাওয়ার পর তিনি প্রথমেই জানতে চাইলেন, আমার কতদিনের নামায কাযা হয়েছে? হাসপাতালের কাগজপত্র ও ক্যলেন্ডার নিজেই হিসাব বের করে ফেললেন, বাইশ দিনের নামায কাযা! একটি খাতায় তারিখওয়ারী [বিতরসহ] ছয় ওয়াক্ত নামাযের ছক এঁকে ছুটে যাওয়া নামায কাযা করা শুরু করলেন এবং এক সপ্তাহের মধ্যেই ছুটে যাওয়া সমস্ত নামাযের কাযা আদায় করে ফেললেন। মৃত্যুকালেও তার এক ওয়াক্ত নামাযও কাযা হয়নি। যোহরের নামায আদায় করার পর আসরের ওয়াক্ত হওয়ার পূর্বেই তার মৃত্যু হয়। এভাবেই কাটে চারটি বছর। স্মৃতিশক্তি ফিরে পাওয়া, কথা বলতে পারা ইত্যাদি সবই হলেও শারীরিক শক্তি আর ফিরে পাননি। শোয়া ও শোয়া থেকে ওঠার ক্ষেত্রে অন্যের সাহায্যের প্রয়োজন হত।
মৃত্যু
আল্লাহর খালেছ বান্দাগণ আগ থেকেই মৃতুর ইঙ্গিত পেয়ে থাকেন। মৃত্যুর এক সপ্তাহ আগ থেকেই তিনি বারবার মৃত্যুর কথা স্মরণ করে যাচ্ছিলেন। আযান হওয়ার সাথে সাথে নামাযের জন্য অস্থির হয়ে যেতেন। খাবারে একটু বিলম্ব হলে রাগ করতেন না। যদিও ডায়াবেটিস রোগী হওয়ার কারণে খাবারের বিলম্বে তার অনেক কষ্ট হত। কিন্তু নামাযের ব্যবস্থা করে দিতে দেরি হলেই তিনি রেগে যেতেন। একজনের পর একজনের নাম ধরে ডাকা-ডাকি শুরু করে দিতেন। তায়াম্মুম করিয়ে নামাযের ব্যবস্থা করে দেয়ার আগ পর্যন্ত কোনভাবেই ক্ষান্ত হতেন না।
ঈদুল আযহার আগের রাতে তিনি হঠাৎ খুব গুরুত্বের সাথে আম্মাকে ডাকলেন। আম্মা কাছে যাওয়ার পর বললেন, কোরবানীর টাকা আলাদা করার পর আমার আর কত টাকা আছে? [আব্বাজান রহ. এর বড় একটি ব্যাগ ছিল। আব্বার মালিকানা যাবতীয় টাকা ঐ ব্যাগেই রাখা হতো।] আম্মা বললেন, এখন আমার ভালো লাগছে না। কাল না হয় গুনে দিব। আব্বাজান তাকিদ দিয়ে বললেন, না! এখনই গুনে দেখ। নিরুপায় হয়ে আম্মা গুনে জানালেন এত টাকা। [সত্তুর হাজারের কাছাকাছি] এরপর আব্বা বললেন, নেও, এই সমস্ত টাকা আমি তোমাকে দিয়ে দিলাম। আম্মা আশ্চর্য হয়ে বললেন, এত টাকা দিয়ে আমি কী করব? আব্বা বললেন, ছোট ছেলেটার বিয়ে বাকি আছে। ওর বিয়েতে খরচ করে বাকি টাকা [আমাদের পরিবারে বিয়ের খরচ একেবারে কমই হয়ে থাকে- চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ হাজারের মধ্যেই সমস্ত খরচ শেষ হয়ে যায়।] তোমার ইচ্ছামত খরচ করবা। সারা জীবনে তো কিছুই দিতে পারিনি। নেও মৃত্যুকালে কিছু টাকা দিয়ে গেলাম। তোমার যা করতে মন চায়, তাই কইরো। আম্মাজানও তাই করেছিলেন। ছোট ভাই ইউহান্না এর বিয়েতে কিছু টাকা খরচ করার পর বাকি সমস্ত টাকা তিনি রেখে দিয়েছেন প্রায় বছরখানেক। এরপর সেই টাকা খরচ করেছেন পবিত্র উমরাহর সফরে।
১০ জিলহজ। পবিত্র ঈদুল আযহার দিন। সকাল সকালই ছেলে-মেয়েদের সকলের খোজ-খবর নিলেন। সুন্দরভাবে নিজ নিজ মাদরাসার দায়িত্ব আদায়ের তাগিদ দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে সার্বিক নিরাপত্তার জন্য দোয়া দিলেন। খোজ নিতে ভুললেন না বাড়ীতে কোরবানীর জন্য ক্রয় করা পশুরও।
নিয়ম মাফিক নাস্তা খেলেন, বারবার কোরবানীর খবরাখবর নিলেন। যোহরের আযানের সাথে সাথেই নামাযের ব্যবস্থা করে দিতে বললেন। যোহর নামায আদায় করলেন। দুপুরের খাবার খেলেন। পছন্দের খাবার গোশত ও ভুনা খিচুরি খুব আনন্দের সাথে আহার করলেন। আম্মা এসে খাবারের বাটি সরিয়ে পাশের রুমে নামাযে দাঁড়ালেন। নামাযে দাঁড়িয়ে তৃতীয় রাকাতে হঠাৎ গোঙ্গানীর শব্দ শুনলেন। যা আস্তে আস্তে বেড়ে যাচ্ছিল। আম্মা তৎক্ষণাৎ নামায ছেড়ে দিয়ে আব্বার কাছে এলেন। এসে দেখলেন, আব্বা বারবার মুখে কী আওড়াচ্ছেন আর তাসবীহ পড়ার ন্যয় হাতে কী যেন গুনছেন। আম্মা দৌড়ে গিয়ে অন্য ঘরে থাকা বড় ভাই ও সেঝ ভাইকে ডেকে আনলেন। তারা এসে একই অবস্থা দেখলেন। মুখে কী আওড়াচ্ছেন আর তাসবীহ পড়ার ন্যয় হাতে কী যেন গুনছেন। ভাইয়েরা কালিমার তালকীন দিতে শুরু করলেন। আব্বা শেষবারের মত চোখ খুলে সবার দিকে তাকালেন আর অনুচ্চস্বরে কালিমা পড়লেন। এরপর চোখ বন্ধ করে পাড়ি জমালেন পরপারে।
আব্বার ভাই, ছেলে, জামাতা ও আত্মীয়সজন সবাই যেহেতু কওমী মাদরাসা সংশ্লিষ্ট। আর কওমী মাদরাসা সংশ্লিষ্ট সকলের জন্য ঈদুল আযহার দিনটি খুবই ব্যস্ততার দিন। তাই সংবাদ শুনে আসতে আসতে বেশ সময় গড়িয়ে গিয়েছিল। যে কারণে রাত দশটায় জানাযার নির্ধারিত সময় ঘোষণা থাকলে এগারটা পর্যন্ত বিলম্ব হয়ে যায়।
সকল ভাই, ছেলে, জামাতা, আত্মীয়সজনের উপস্থিতিতে বড় ছেলে মাওলানা ইয়াহইয়া খান এর ইমামতেতে মুমিনবাড়ি মাদরাসা মাঠে জানাযা সম্পন্ন হয় এবং মুমিন বাড়ি মসজিদের দক্ষিণে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়। আল্লাহ তার কবরকে জান্নাতের বাগিচা বানিয়ে দিন। আমীন।

মৃত্যু তারিখ :- 020/9/2017 ইং

Manual7 Ad Code

মোবাইল :-

তথ্য দানকারীর নাম :- ইউশা খান সাদী

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- +8801918535929

Manual4 Ad Code

Spread the love