সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

কুতবুল আলম আল্লামা শাহ সুলতান আহমদ নানুপুরী (রহ.)

July 19 2026, 06:12

নাম :- মাওলানা  শাহ সুলতান আহমদ

জন্ম তারিখ / জন্মস্থান :- ২৬ জুন ১৯১৪ইং ফটিকছড়ি উপজেলার ধর্মপুর গ্রামে।

শৈশব কাল :- ১৯১৪ সালের ২৬ জুন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার ধর্মপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ফজলুর রহমান বার্মার রেঙ্গুনে চাকরি করতেন এবং মা ওমদা খাতুন। তার পঞ্চম পূর্বপুরুষ আকবর শাহ আরব থেকে আফগানিস্তান হয়ে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে এসেছিলেন এবং বসতি স্থাপন করেছিলেন। ফজলুর রহমানের ঔরসে আরও কয়েকজন সন্তান জন্মগ্রহণ করেছিল। একমাত্র নানুপুরী ছাড়া সকলেই শিশুকালে মারা যায়। পরিবারে তাকে ‘বাদশাহ’ নামে ডাকা হত। আড়াই বছর বয়সে কলেরা মহামারিতে তার মা মারা যান।

শিক্ষা জীবন :- প্রথমে তিনি স্থানীয় ওবায়দুল হক মিয়াজির মক্তবে ধর্মীয় প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেন। পাঁচ বছর বয়সে ভর্তি হন গর্জনিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। পরবর্তীতে পিতার নির্দেশে তাকে নানুপুর কালু মুন্সিরহাটে অবস্থিত মাদ্রাসা হেমায়েতুল ইসলামে ভর্তি করানো হয়। এখানে ওবায়দুল হক (প্রকাশ লাল মিয়া হুজুর) ও মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহর অধীনে তিনি জামাতে ইয়াজদাহুম (প্রাথমিক) থেকে জামাতে শশুম (নিম্ন মাধ্যমিক) পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। জামাতে শশুমে অধ্যায়নকালে তার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। এরপর মায়ের পরামর্শে তিনি চট্টগ্রাম শহরের দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসায় ভর্তি হন। এই শিক্ষাক্রম পছন্দ না হওয়ায় মাসখানেক পর মাদ্রাসা ত্যাগ করে তিনি বাড়িতে চলে যান।

এরপর তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ যেতে মনস্থ করলেন এবং ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে দেওবন্দের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেন। পথিমধ্যে কুষ্টিয়ায় তার মামার সাথে সাক্ষাৎ হয়। মামার মাধ্যমে তিনি পাটনার একটি মাদ্রাসায় ভর্তি হন। মাদ্রাসাটি আহলে হাদিস মতাবলম্বীদের হওয়ায় এক বছর পর পর তিনি বাড়ি চলে আসেন।

এরপর তিনি সরাসরি দারুল উলুম দেওবন্দ চলে যান এবং জামাতে শশুমে পুনরায় ভর্তি হন। পাশাপাশি দারুল উলুম দেওবন্দের কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমামতি করতেন। মাঝখানে কয়েকদিন মাজাহির উলুম, সাহারানপুরে পড়ার পর দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) সমাপ্ত করেন। এরপর দেওবন্দে উচ্চতর দর্শনশাস্ত্রে অধ্যয়ন করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে রয়েছে হুসাইন আহমদ মাদানি, মুহাম্মদ ফয়জুল্লাহ, ইজাজ আলী আমরুহী, ইব্রাহিম বলিয়াভি, জহুর আহমদ, হাবিবুল্লাহ মিরাঠী, রিয়াজ উদ্দিন সহ প্রমুখ খ্যাতিমান ব্যক্তি।

কর্ম জীবন :- দেওবন্দ অধ্যয়নকালে শিক্ষা সমাপ্তির পর নাজিরহাট বড় মাদ্রাসায় যোগদানের জন্য তিনি একটি চিঠি পেয়েছিলেন। এ মোতাবেক দেশে প্রত্যাবর্তনের পর নাজিরহাট বড় মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে তার কর্মজীবনের সূচনা হয়। পরবর্তীতে মাদ্রাসার মহাপরিচালক নুর আহমদ তৎকালীন মুসলিম লীগের সমর্থক জাফর আহমদ উসমানিকে নাজিরহাট বড় মাদ্রাসায় নিয়ে আসেন। “ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে মাদ্রাসাকে রাজনীতির প্রভাব মুক্ত রাখতে হবে” এই যুক্তি দেখিয়ে তিনি পদত্যাগ করে বাবুনগর মাদ্রাসায় চলে যান। বাবুনগর মাদ্রাসায় তিনি ১৫ বছর অধ্যাপনা করেছেন। পরবর্তীতে পটিয়ার মুফতি আজিজুল হকের নির্দেশে কিছুকাল অস্থায়ী এবং ১৯৬১ সালে স্থায়ী মহাপরিচালক হিসেবে জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুর মাদ্রাসায় যোগ দেন।তার ত্যাগ,তিতিক্ষা,ইখলাস এবং রুহানিয়াতের বদৌলতে সেই পল্লী গাঁয়ের \”ওবাইদিয়া হাফেজুল উলুম মাদ্রাসা\” আজ আরব ও আজমে সুপরিচিত জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরে রূপান্তারিত হয়। ১৯৮৫ সালে জমির উদ্দিন নানুপুরীকে তার স্থলাভিষিক্ত করে মহাপরিচালকের দায়িত্ব ছেড়ে দেন।

অবদান :- তিনি শিরক ও বিদআতের বিরুদ্ধে সারাজীবন সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি জামিয়া ইসলামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের দায়িত্ব গ্রহণকালে এর অবস্থা ছিল খুবই নাজুক, তিনি এর পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। জামিয়া নানুপুরকে একটি আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করার পেছনে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তাই অনেক সময় তাকে জামিয়া নানুপুরের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে চিত্রিত করা হয়। যেসব এলাকায় মাদ্রাসা নাই, সেসব এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার ব্যপারে তিনি সর্বদা সচেষ্ট ছিলেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতা উত্তর কক্সবাজারের পোকখালীতে তিনি আল জামিয়া আল ইমদাদিয়া আজিজুল উলুম নামে একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন যা ‘পোকখালী মাদ্রাসা’ হিসেবে সর্বাধিক পরিচিত, বর্তমানে বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় ইসলামি বিদ্যাপিঠ। তার প্রতিষ্ঠিত কয়েকশত মাদ্রাসার মধ্যে উল্লেখযোগ্য:

জামিয়া ইসলামিয়া বায়তুল হুদা
কুমিল্লাহ রানির বাজার মাদ্রাসা
জামিয়া ইসলামিয়া সোলতানিয়া লালপোল ফেনী
জামিয়া আজিজিয়া সুলতানুল উলুম খিরাম
জামিয়া সুলতানিয়া মক্কাতুল মুকাররমা, সৌদি আরব
ঢাকা জোয়ার সাহারা মাদ্রাসা
সুলতানিয়া আজিজুল উলুম মাদ্রাসা মরিচ্যা
ইনানি আজিজিয়া সুলতানুল উলুম মাদ্রাসা
দক্ষিণবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষাপীঠ হরিণাকুলিয়া জামিয়া এমদাদিয়া মাদ্রাসা, বরিশাল
এছাড়াও তিনি অনেক মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি ‘মাসিক আর রশিদ ’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেছিলেন যা পরবর্তীতে বন্ধ হয়ে যায়। তিনি ছিলেন মূলত একজন আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব ও ইসলাম প্রচারক। তার নিকট অনেক অমুসলিম ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন। তার অনুসারীরা তাকে ‘শায়খুল আরব ওয়াল আজম’, ‘ইমামুল আরেফিন’, ‘সুলতানুল আরেফিন’, ‘কুতুবে আলম’, ‘রাহবারে তরীকত’, ‘ওলিকূল শিরোমণি’ ইত্যাদি উপাধিতে ভূষিত করে থাকেন।

মৃত্যু তারিখ :- তিন বছর অসুস্থ থাকার পর ১৯৯৭ সালের ১৬ আগস্ট জামিয়া ওবাইদিয়া নানুপুরের নিজ কক্ষে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরদিন আলী আহমদ বোয়ালভির ইমামতিতে নানুপুর মাদ্রাসার মাঠে তার জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। তার বড় ছেলে হুসাইন আহমদ সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থান করায় তার প্রথম জানাজায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তীতে তিনি দেশে ফিরলে এমদাদুল্লাহ নানুপুরীর ইমামতিতে তার দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে তাকে মাকবারায়ে সুলতানিয়ায় দাফন করা হয়। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৪ বছর।

মোবাইল :-

তথ্য দানকারীর নাম :- সাদেক আহমদ

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- 01617731329

Spread the love