সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

শায়খুল হাদিস মাওলানা মুহাম্মাদ শায়খে লক্ষীপুরী দা. বা.

জুলাই ১৪ ২০২০, ০৯:৪৩

নাম :- মুহাম্মাদ

জন্ম  :- লক্ষীপুর গ্রামে ১৯২৭ সালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের দীনদার মায়েরকোল আলোকিত করে এ পৃথিবীতে আগমন করেন। তাঁর দীনদার পিতা মাওলানা ইদ্রিস সাহেব লক্ষীপুরী পুত্রের নাম রেখেছিলেন মুহাম্মদ। সে সময়ই তিনি তাঁর পুত্রকে দীনের তরে উৎসর্গ করেছিলেন।

শিক্ষা জীবন :-
তাঁর পিতা ছিলেন তৎকালীন কানাইঘাট ইসলামিয়া মাদরাসার মুহতামিম। এছাড়া তাঁর পিতা হযরত মাওলানা ইদ্রিস রহ. ছিলেন লালারচক রাহমানিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম। তিন বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে হারান। পিতৃহারা সন্তান মায়ের কাছ থেকে স্নেহের পরশ নিয়ে বড় হন। মা ই হলেন তাঁর প্রথম প্রতিষ্ঠান। এর পর তিনি লক্ষীপুর মসজিদ থেকে কুরআনের শিক্ষা অর্জন করেন।
তিনি বায়মপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারী শিক্ষা অর্জন করে লালারচক রাহমানিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। লালারচক মাদরাসায় শরহে জামি জামাত পর্যন্ত অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অধ্যায়ন করে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য ১৯৫৭ সালে কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসায় ভর্তি হন। মুখতাসার থেকে হাদিস পর্যন্ত তিনি কানাইঘাট দারুল উলুম মাদরাসায় অত্যন্ত সুনাম সুখ্যাতির সম্পন্ন করেন।

তিনি ১৯৬২ সালে কানাইঘাট দারুল উলুম দারুল হাদিস মাদরাসা থেকে কৃতিত্বের সাথে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করে ছাত্র জীবনের ইতি টানেন। এবং তৎকালীন জামেয়া দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাট এর মুহতামিম শায়খুল হাদিস শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ এর সান্নিধ্য গ্রহণ করেন। তিনি ইলমের প্রতি ছিলেন বিমুগ্ধ। ইলমের আলোয় নিজেকে আলোকিত করার জন্য অনেক বুজুর্গদের কাছে গিয়েছিলেন। ছাত্র জীবনে তৎকালীন সময়ের বিখ্যাত মুফতি মাওলানা ফয়জুল হক সাহেব বায়মপুরি রহ. এর কাছ থেকেও ফয়েজ এবং বরকত অর্জন করেছিলেন। যাদের কাছ থেকে তিনি ইলমের আলোয় আলোকিত হয়েছিলেন… তাঁদের মধ্যে অন্যতম শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ। যুগের কাশ্মীরি শায়খুল হাদিস আল্লামা মুজ্জাম্মিল বায়মপুরি রহ।

ইখলাসিয়তে পাহাড় শায়খুল হাদিস আল্লামা শহর উল্লাহ শায়খে চটি রহ.। হযরত মাওলানা শায়খ আব্দুল হাফিয কুরওরমাটি রহ., সিরাতের ইমাম শায়খুল হাদিস আল্লামা ফয়জুল বারী মহেষপুরী রহ. সহ প্রসিদ্ধ অনেক বুজুর্গানে মিল্লাত। যাদের সান্নিধ্য থেকে তিনি নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন। হাদিসের আলোয় আলোকিত হয়ে আজও দারুল উলুম কাননে হাদিসের মসনদ আলোকিত করে বসে আছেন।

কর্ম জীবন :-
হযরত মাওলানা মুহাম্মাদ বিন ইদ্রিস লক্ষিপুরী দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাট থেকে সর্ব্বোচ্চ জামাত তাকমিল ফিল হাদিস শেষ করার পর শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ তাঁর মেধা এবং যোগ্যতার নিরিখে নিজ প্রতিষ্ঠান দারুল উলুম কানাইঘাটে শিক্ষক হিসেবে তাকে নিয়োগ প্রদান করেন। তিনি দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাট থেকেই তাঁর কর্মজীবনের সূচনা করেন। দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাটে পাঁচ বছর শিক্ষকতা করার পর অার্থিক কারনে প্রিয় মুর্শীদ আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ এর অনুমতিক্রমে কোম্পানীগঞ্জ মুশাহিদিয়া খাগাইল মাদ্রাসায় সদরুল মুদাররিস হিসেবে যোগদান করেন। মুশাহিদিয়া খাগাইল মাদরাসা শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ নামে প্রতিষ্ঠিত একটি মাদরাসা। আল্লামা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষিপুরী এই মাদ্রাসায় তিন বৎসর শিক্ষকতা করেন।

১৯৭০ সালে শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ ইনতিকাল করলে তিনি খাগাইল ত্যাগ করেন। হযরত মাওলানা মুজাম্মিল বায়মপুরি রহ. এর নির্দেশে আবারো যোগদান করেন প্রিয় মুর্শীদের প্রতিষ্ঠিত জামেয়া দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাটে। তিনি দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাট মাদরাসায় দীর্ঘ পঞ্চান্ন বছরের অধিক সময় থেকে শিক্ষকতা করে আসছেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে নাহবেমির, হেদায়েতুন ন্নাহু, কাফিয়া, নাফহাতুল আরব, শরহে জামি, মুখতাসারুল মাআনি, শরহে আকাইদ, বাইযাওয়ি শরিফ, আবু দাউদ শরিফ, মুসলিম শরিফ, বুখারি শরিফসহ অনেক কঠিন কঠিন কিতাবের দরস তাদরিস প্রদান করে আসছেন।পারিবারিক জীবন!

শায়খুল হাদিস আল্লামা মুহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষিপুরী হাফিজাহুল্লাহ ছাত্র জীবন শেষ করার পর শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরীর কাছে হয়ে উঠেন আদরের ধন, চোখের মণি, মুখের বচন।
শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ তাঁর নিজের আদরের কন্যাকে বিয়ে দিয়ে তার প্রমাণ রাখলেন। শায়খ লক্ষীপুরী হাফিজাহুল্লাহ প্রথম বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁর প্রিয় মুর্শিদের কন্যার সাথে। এ বন্ধনে তিনি নিঃসন্তান। পরবর্তীতে আল্লামা শায়খ লক্ষীপুরী হুজুর চড়িপাড়া গ্রামের এক দীনদার পরিবারের সাথে দ্বিতীয় বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই বন্ধনে এক কন্যা সন্তানের জন্ম হলেও জন্মের পরেই সে মৃত্যু বরণ করে। পারিবারিক জীবনে তাঁর এক ভাই এবং তিন বোন রয়েছেন।
বুখারী শরিফের শায়খ তিনি!

শায়খুল হাদিস আল্লামা চটি রহ. এর ইহতেমামির সময় থেকে তিনি দারুল উলুম জামেয়ায় বুখারি শরিফের দরস দিয়ে আসছেন। এখন পর্যন্ত তিনি দারুল উলুম প্রাঙ্গনে তিনি বুখারী শরিফের দরস প্রদান করেন। বুখারি শরিফ নেসাব পাওয়ার পিছনেও এক অদ্ভুত ঘঠনা উল্লিখিত রয়েছে। শায়খে চটির সময়ে বুখারী শরীফের একটি অংশ কে পড়াবেন এ নিয়ে তিনি কিছুটা সংশয়ে ছিলেন। স্টাফদের মধ্যে বুখারি শরিফ পড়ানোর জন্য কয়েকজন আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু শায়খে লক্ষীপুরী আগ্রহীদের তালিকায় ছিলেন না। শায়খুল হাদিস আল্লামা শহর উল্লাহ চটি রহ. সুন্দর সমাধানের জন্য কুরা (লটারী) মারার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি কুরা মারার সময় শায়খে লক্ষীপুরী সিনিয়র শিক্ষক হওয়ার কারণে তাঁর নামটাও নিলেন। তিনবার কুরা মারলেন, তিনবারই শায়খে লক্ষীপুরী দা. বা. এর নাম উঠলো। এর পর থেকে আজ পর্যন্ত তিনি দারুল উলুম দারুল হাদিস কানাইঘাট মাদরাসায় বুখারি শরিফের দরস প্রদান করে আসছেন শায়খে লক্ষীপুরী হুজুর দা. বা.।

ইহতেমামির দায়িত্বগ্রহণ:
২০০৭ সাল। বার্ধক্যজনিত কারনে আল্লামা ফয়যুল বারী মহেষপুরী রহ. ইহতেমামির দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন। জামেয়া দারুল উলুম নিয়ে কিছুটা মতানৈক্য সৃষ্টি হয়। মতানৈক্য থেকে মাদরাসাকে উদ্দার করে ঢেলে সাজানোর লক্ষে ইহতেমামির দায়িত্ব সুষ্ঠ ভাবে আঞ্জাম দেয়ার জন্য দেশবাসী মুরব্বিয়ানে কেরাম সর্বসম্মতিক্রমে আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরীর অত্যন্ত আদরের জামাতা আল্লামা মুহাম্মদ বিন ইদ্রীস লক্ষীপুরী সাহেবকে ২০০৭ সালে জামেয়ার মুহতামিম হিশেবে নিযুক্ত করেন।

তাঁর কাছে এ মহান দায়িত্ব চলে আসলেও হুজুর নিজেকে মুহতামিম হিসাবে পরিচয় না দিয়ে মাদরাসার খাদিম হিশেবে পরিচয় দেন। কসর নফসির আশ্রয় নিয়ে মাদরাসার গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজের শরণাপন্ন হয়ে সবার মতামতের ভিত্তিতেই ফয়সালা করেন। যাই হোক ২০০৭ ইং হইতে অাজ পর্যন্ত এ গুরু দায়িত্ব তিনি যথাযথ ভাবে পালন করে আসছেন।
তাসাউফ ও আত্মাধ্যিকতা।

তাসাউফ আত্মশুদ্ধির অন্যতম মাধ্যম হলো কারো হাতে বায়াআত গ্রহণ করেই। শায়খ মোহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষিপুরী তাঁর প্রিয় উস্তাদ শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ এর হাতে বায়াত হন। এবং কিছুদিন মেহনত মুশাক্কাতের পর মুশাহিদিয়া খাগাইল কোম্পানীগঞ্জ মাদরাসার শিক্ষক থাকা অবস্থায় শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ এর ইনতিকালের বৎসর তিনি ইজাজত প্রাপ্ত হোন। শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি সর্বশেষ খলিফা তিনি ছিলেন।
তিনি একজন জীবন্ত ওলি। তাঁর শত কারামত আমাদের সামনে বিদ্যমান রয়েছে।

একটি রোগ ও মাওলার পুরস্কার:
ধবল রোগাক্রান্ত ছিলেন প্রথম দিকে। কিন্তু আল্লাহ যে তাঁর অলৌকিকতা প্রকাশ করেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের উপর, সেই অলৌকিকতা প্রকাশ পেলো আল্লামা লক্ষীপুরী হুজুরের শরীরে। ধবধবে সাদা মানুষটি আজ আর ধবল রোগী নয়। ১৯৮২ সালে মহান আল্লাহর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে হজ্বে গিয়েছিলেন আল্লামা লক্ষীপুরী। তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন করে বলেছিলেন যে, হে আল্লাহ সাদা রংয়ের সৃষ্টিকর্তাও তুমি, কালো রংয়ের সৃষ্টিকর্তাও তুমি। হয় আমার সমস্ত শরীর কালো করে দাও না হয় সাদা করে দাও। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার কথা কবুল করেছেন। সমস্ত শরীর সাদা রংয়ের করে দিলেন। হজ্ব থেকে আসার পর তাঁকে কেউ চিনতেই পারেননি। আগের লক্ষ্মীপুরী আর এখনকার লক্ষ্মীপুরী আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এখন আর তিনি ধবল রোগী না।

অবদান :- বিভিন্ন দায়িত্বগ্রহণ:
দুই হাজার সাত সাল থেকে তিনি পূর্ব সিলেট আযাদ দীনি আরবি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, (যার প্রতিষ্ঠাতা শায়খুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ.) তিনি এই বোর্ডের সভাপতির দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে আসছেন।
এছাড়া আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরি রহ এর নামে গঠিত মুশাহিদিয়া কিরাত প্রশিক্ষণ বোর্ড এবং অরাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামা বাংলাদেশ এর প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিশেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংগঠনের প্রদান কর্তার দায়িত্ব তিনি পালন করেছেন।
খতিব:
আল্লামা শায়খ লক্ষীপুরী দীর্ঘদিন থেকে কানাইঘাট বাজার জামে মসজিদের খতিব এর দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তিনি ২০০৭ সালে প্রথম খতিব নিযুক্ত হন। এর পর থেকে তিনি প্রতি শুক্রবার কানাইঘাট বাজার মসজিদে নসিহত প্রদান করেন। কানাইঘাট বাজার মসজিদ আলোকিত হয় শায়খ লক্ষীপুরী দা. বা. এর আগমনের মাধ্যমে।

মোবাইল :- 01727667760

তথ্য দানকারীর নাম :- মুহা. জুনায়েদ শামছী ও গোলাম কিবরিয়া।

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- 01768642635 /01788906031

Spread the love