সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

শায়খুল হাদিস প্রিন্সিপাল আবুল হাসান আলী রহ.

ডিসেম্বর ২৬ ২০১৮, ০৫:৫৬

লিখেছেন:-  শামসুল আদনান
জন্ম :
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি, বাংলাদেশের খনিজ সম্পদের ঐশ্বর্য, দুটি পাতা একটি কুড়ির দেশ বলে খ্যাত, শাহ্ জালালের পদস্পর্শে মহিমান্বিত ভূমি সিলেট।
সেই পুণ্যভূমি সিলেটের ইসলামী তাহজিব তামাদ্দুন এ ভাস্বর গৌরবোজ্জ্বল স্থান, উপমহাদেশের বিখ্যাত মুহাদ্দিস, উলামায়ে কেরামের শিরোমণি আল্লামা মুশাহিদ আহমদ বায়মপুরী রহ. এর জন্মভূমি কানাইঘাট। পবিত্র এই কানাইঘাট ভূমিতেই শুয়ে আছেন কীর্তিমান, বর্ষীয়ান, ক্ষণজন্মা অনেক মহামানব।
সেই কানাইঘাট এর পশ্চিম দক্ষিণে সীমান্তের শেষ প্রান্তে সুরমার তীর ঘেষা একটি সাধারণ ছিমছাম গ্রামের নাম লালার চক। যে গ্রামে জন্ম নিয়েছেন আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুজুর রহ.। এই লালার চকে ১৭ নভেম্বর ১৯৫৯ ইংরেজি, ১৬ জমাদিউল আউয়াল ১৩৭৯ হিজরী,  ১ অগ্রহায়ণ ১৩৬৬ বাংলা, রোজ মঙ্গলবার, সকাল ১০ ঘটিকায় এক মৌলভী পরিবারে অখন্ড বাংলায় জন্মগ্রহণ করেন আবুল হাসান আলী রহ.। পিতার নাম- মাওলানা মাহমুদ আলী রহ. এবং মায়ের নাম- মোসাম্মৎ মুতিয়া খাতুন।
বংশের প্রথম সন্তান হিসেবে তিনি পরম যত্ন ও আদরে পিতা মাতার তত্বাবধানে লালিত-পালিত হন। (তাঁরা ছয় ভাই ও চার বোন। এক বোন ও এক ভাই অল্প বয়সে কলেরা রোগে ইন্তেকাল করেন।)
শায়খুল হাদিস ওবায়দুল হক উজিরপুরী রহ. তাঁর নাম রাখেন আবুল হাসান আলী।
আবুল হাসান আলী রহ. উজ্জল ভরাট চেহারা, শ্যামল বর্ণ, নিরব ও গম্ভীর প্রকৃতির ছিলেন।
প্রাথমিক শিক্ষা ;
আবুল হাসান আলীর বাড়ির পূর্ব-দক্ষিণে অবস্থিত লালারচক জামে মসজিদ ও জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম মাদরাসা [প্রতিষ্ঠাকাল : ১৯৩৩ সাল, ১৪৩৯ হিজরী]।
বড়দের হাত ধরে আবুল হাসান আলী রহ. সেই লালারচক মসজিদে যাওয়া আসা শুরু করেন। তাঁর জীবনের প্রথম শিক্ষক হলেন  ঢাকা উত্তর আরবিয়া হুসাইনিয়া রানাপিং মাদ্রাসার শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা ওবায়দুল হক উজিরপুরী রহ. এমপি। যিনি তাঁর নামও রেখেছিলেন। তখনকার সময়ে ওবায়দুল হক উজিরপুরী লালারচক মসজিদে ইমাম ও মাদরাসার মুদাররিস ছিলেন।
বয়স বাড়ার সাথে সাথে আবুল হাসান আলী লালারচক মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম লালচক মাদ্রাসাতে অধ্যায়ন শুরু করেন।
তখনকার সময়ে লালার চক মাদ্রাসা হেদায়াতুন্নাহু আর হিফজ শাখা মসজিদে এটুকুর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।
একাত্তরের যুদ্ধের কারণে পঞ্চম শ্রেণীতে আবুল হাসান আলী ‘আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ’ বোর্ডে পরিক্ষা দিতে পারেননি। তারপর ষষ্ট শ্রেণীতে ২/৩ মাস পড়ালেখা করে  হিফজ শাখায় ভর্তি হয়ে যান। হিফজে ভর্তি হওয়ার পর পবিত্র কোরআনের ছয়পারা তিনি মুখস্ত করেন হাফেজ সিকন্দর আলী রহ. দর্জি মাটি এবং হাফিজ আব্দুস সালাম রহ. তালবাড়ীর কাছ থেকে। তারপর আবার তিনি হিফজ থেকে সরফ (সপ্তম) শ্রেণীতে ভর্তি হন এবং লালারচক মাদরাসায় হেদায়াতুন নাহু (নবম) পর্যন্ত পড়েন। ক্লাসে এক, দুই অথবা তিন সিরিয়ালে উত্তীর্ণ হতেন। তবে সব সময় ফাস্ট ডিভিশনের মার্ক প্রাপ্ত হতেন।
এই লালারচক মাদ্রাসায় আবুল হাসান আলী এর পিতা হযরত মাওলানা মাহমুদ আলী রহ. শিক্ষকতা করেন। আবুল হাসান আলী তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতার কাছে উর্দু দুসরি, তা’লীমুল ইসলাম, সরফ, মাসাদীর, মালাবুদ্দা মিনহু ক্লাসে পড়েন এবং ক্লাসের সকল বই বাড়িতে প্রাইভেট পড়েন।
উচ্চ শিক্ষা
আবুল হাসান আলী এর প্রাথমিক শিক্ষা লালারচক মাদরাসায় সমাপ্ত হওয়ার কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জনের নিমিত্তে তিনি জামেয়া ক্বাসিমুল উলুম দরগাহ মাদরাসায় ১৯৭৭ সালে ভর্তি হন এবং সেখানে জালালাইন (ত্রয়োদশ) ক্লাস এর অর্ধেক বৎসর পর্যন্ত শিক্ষার্জন করেন। জালালাইন পড়াকালীন বৎসরের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর চোখে সমস্যা দেখা দেয়। অনবরত চোখ থেকে পানি নির্গত হয়ে চোখ ঝাপসা হয়ে যেত। ঠিকমতো চোখ মেলে তাকাতেও পারতেননা।
তখনকার সিলেটের চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. নুরুল আম্বিয়া ট্রিটমেন্ট করেন তাঁর। বিদ্যুতের আলোর কারণেই চোখে সমস্যা হয়েছে বলেন ডাক্তার। ডাক্তার পরামর্শ দেন তাঁকে বিদ্যুতহীন কোন মাদরাসায় পড়ার জন্যে। অদম্য ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তিনি দরগাহ মাদরাসা থেকে চলে যান। তখনকার দরগাহ মাদরাসার মুহতামিম আরিফ বিল্লাহ আকবর আলী রহ. এর পরামর্শে বিদ্যুতহীন ‘জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর’ মাদরাসায় ভর্তি হন। আঙ্গুরা মাদরাসায় লজিং থেকে জালালাইনের বাকি অর্ধেক বৎসর ও মেশকাত পর্যন্ত লেখাপড়া করেন।
তখন আঙ্গুরা মাদরাসায় ‘তাকমিল ফিল হাদিস’ ক্লাস ছিলনা।
আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুযুর রহ. এর পরামর্শে নিজ ইউনিয়ন রাজাগঞ্জ এর ‘জামেয়া দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ’ মাদরাসায় ‘তাকমিল ফিল হাদিস’ ক্লাসে ভর্তি হন আবুল হাসান আলী।
১৯৮১ সাল ১৪০১ হিজরীর দিকে ‘ক্বাসিমুল উলুম দরগাহ’ মাদরাসায় শায়খুল হাদিসগণের মধ্যে মনোমালিন্য দেখা দেয়। আর এই মনোমালিন্যের কারণে কয়েকজন শায়খুল হাদিস ‘ক্বাসিমুল উলুম দরগাহ’ থেকে ইস্তফা নেন। সেই শায়খুল হাদিসগণের মধ্যে হযরত মুফতি রহমত উল্লাহ রহ., আল্লামা কুতুব উদ্দীন রহ., আল্লামা ইসহাক রহ., আল্লামা নজীর আহমদ রহ. ‘জামেয়া দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ’ মাদরাসায় চলে আসেন এবং অধ্যাপনা শুরু করেন। আবার সেই সময় ঢাকা উত্তর আরাবিয়া হুসাইনিয়া রানাপিং মাদরাসা এর শায়খুল হাদিস আল্লামা জাওয়াদ আলী রহ. রানাপিং মাদরাসা থেকে রাজাগঞ্জ মাদরাসায় চলে আসেন।
আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুযুর রহ. এর মতে তখনকার সময়ে ‘দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ’ মাদরাসার ‘তাকমিল ফিল হাদিসে’র শায়খুল হাদিসগণ ছিলেন শ্রেষ্ট। এরচেয়ে ভালো মুহাদ্দিস, শায়খুল হাদিসগণ সারা বাংলাদেশে ‘মুঈনুল ইসলাম হাটহাজারী মাদরাসা’ ব্যতীত আর কোথাও নেই। তাই আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান রহ. আবুল হাসান আলীকে ‘জামেয়া দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ’ মাদরাসায় ভর্তির পরামর্শ দেন।
আবুল হাসান আলী রহ. ‘তাকমিল ফিল হাদিস’ পড়ার জন্যে রাজাগঞ্জ মাদরাসায় ভর্তি হন। এবং উপরের উল্লেখিত শায়খুল হাদিসগণের কাছে হাদিস শাস্ত্র অধ্যায়ন করেন।
‘তাকমিল ফিল হাদিস’ ক্লাসের পরিক্ষা তিনি ১৯৮২ সালে ‘বেফাকুর মাদারিস আরাবিয়া বাংলাদেশ’ এর অধীনে দেন। ‘জামেয়া দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ’ মাদরাসার তাকমিল ফিল হাদিসের বেফাক বোর্ডের সেন্টার ছিল জৈন্তাপুর ‘মদিনাতুল উলুম খলিলহাট মাদরাসা’। আবুল হাসান আলী রহ. খলিলহাট মাদরাসায় ফাইনাল পরিক্ষা দেন। এবং ‘জায়্যি জিদ্দান’ হিসেবে উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা সমাপন করেন। উপরের শায়খুল হাদিসগণ আবুল হাসান আলীর মাথায় পাগড়ি তুলে দেন।
কর্মজীবন ও অধ্যাপনা :
১৯৮৩ সালে জামেয়া মুজাহিদুল উলুম গৌরিপুর, বালাগঞ্জ মাদরাসায় শিক্ষতার মাধ্যমে আবুল হাসান আলী রহ. বর্ণাঢ্য কর্মজীবন শুরু করেন।
জামেয়া মুজাহিদুল উলুম মাদরাসার ক্লাস ছিল হেদায়তুন্নাহু পর্যস্ত। আবুল হাসান আলী রহ. সেখানে এক বৎসর যাবত সচিব ও শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর গৌরিপুর মাদরাসা থেকে তিনি চলে আসেন হযরত মাওলানা শায়েখ আব্দুল কুদ্দুস দা.বা. এর অনুরোধে শায়েখ আব্দুল কুদ্দুসের প্রতিষ্ঠিত গোলাপগঞ্জ ঘোষগাঁও ইসলামিয়া মাদরাসায়। এখানেও তিনি সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ঘোষগাঁও ইসলামিয়া মাদরাসার সাথে সাথে ঘোষগাঁও মোকাম জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। নিষ্টা ও সুনামের সহিত তিন বৎসর ঘোষগাঁও মসজিদ-মাদরাসায় ছিলেন তিনি। তারপর আবুল হাসান আলী শুধু গোলাপগঞ্জ গোগারকুল জামে মসজিদে দুই বৎসর ইমাম ও খতীব হিসেবে ছিলেন।
১৯৮৮ সালের দিকে কানাইঘাট থানার রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের ‘জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারুল উলুম খালপার’ মাদরাসা মুহতামিম শূন্য হয়ে যায়। খালপার এলাকার মুরব্বিয়ানরা হযরত মাও. শায়খ আব্দুর কুদ্দুস দা.বা. ঘোষগাঁও এর কাছে একজন মুহতামিমের অনুরোধ করেন। শায়খ আব্দুর কুদ্দুস দা.বা. আবুল হাসান আলীকে ‘জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারুল উলুম খালপার’ মাদরাসায় মুহতামিম বানিয়ে পাঠিয়ে দেন।
আবুল হাসান আলী রহ. ‘জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারুল উলুম খালপার’ মাদরাসায় মুহতামিম এবং মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত জামে মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে অত্যন্ত সুনামের সহিত দায়িত্ব পালন করেন। এখানে দায়িত্বরত থাকতেই তাঁর পিতা আল্লামা মাহমুদ আলী রহ. ২ এপ্রিল ১৯৯৩ ইংরেজি, রোজ শুক্রবার সকাল এগার ঘটিকায় মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে পরপারে চলে যান ইন্নালিল্লাহ… রাজিউন।  আবুল হাসান আলী তাঁর পিতার জানাযার নামায পড়ান।
‘জামেয়া ইসলামিয়া আনওয়ারুল উলুম খালপার’ চার বৎসর দায়িত্ব পালন করার পর আবুল হাসান আলী ১৯৯৩ সালের অক্টোবরের শেষের দিকে চলে যান সৌদিতে হালাল রুজির উদ্দেশ্যে। ওখানে গিয়ে প্রথমে ওমরা পালন করেন। ওমরা শেষে সেখানে কফিলের একটা দোকানে ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৫ সালের মে মাসে জীবনের প্রথম হজ্জ আদায় করেন।
আবুল হাসান আলী ১৯৯৫ সালের শেষের দিকে নিজস্ব দোকান দেন। সৌদির জিযান শহরে নিজস্ব দোকানে আবুল হাসান আলী সাত বৎসর অতিবাহিত করেন। এরপর জিদ্দায় দুই বৎসর ইমামতি করে সৌদির জীবন অবসান করে দেশে চলে আসেন।
মে ২০০৪ ইংরেজিতে আবুল হাসান আলী ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ লালারর চক মাদরাসায় নিজের এলাকাবাসীর অনুরোধে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ লালারচক এর ৫৬ বৎসরের সফল মুহতামিম আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুযুর রহ. তখনও জীবিত ছিলেন। তবে জমশেদ আলী রহ. দুই বৎসর পূর্বে ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ এর মুহতামিম থেকে শারীরিক অসুস্থতার কারণে অবসর নেন। অবসর নিলেও উপদেষ্টা ও সদরে মুদাররিস হিসেবে মাদরাসায় সাথে জড়িত ছিলেন আমৃত্যু জমশেদ আলী রহ.। হযরত আবুল হাসান আলী ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ এর মুহতামিম হওয়ার পূর্বে দুই বৎসর অত্র মাদরাসার ইহতেমামের দায়িত্ব পালন করেন বিশিষ্ট মুফাসসির হযরত মাও. মমতাজ উদ্দীন দা.বা.। একটা জটিলতা দেখা দেয়ার পর হযরত মাও. মমতাজ উদ্দীন দা.বা. ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ এর মুহতামিম থেকে ইস্তফা দেন। হযরত মাও. মমতাজ উদ্দীন দা.বা.ও লালার চক মাদরাসায় পড়া-লেখা করেছেন। আল্লামা জমশেদ আলী রহ. পুত্রতুল্য স্নেহ করতেন মাও. মমতাজ উদ্দীন দা.বা.কে ।
মাও. মমতাজ উদ্দীন মুহতামিম থেকে ইস্তফা দেয়ার পর এলাকাবাসী আবুল হাসান আলীকে ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ এর মুহতামিম হিসেবে মনোনীত করেন।
আবুল হাসান আলী তাঁর পরম উস্তাদ আল্লামা জমশেদ আলী রহ. এর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পাশে থেকে সহযোগীতা করেছেন এবং একে জীবনের সবচেয়ে আনন্দের বিষয় ও সৌভাগ্য হিসেবে ব্যক্ত করেছেন।
আবুল হাসান আলী ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ এর মুহতামিম হিসেবে ৯ মাস দায়িত্ব পালন করার পর আল্লামা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুযুর রহ. ৩০ জানুয়ারি ২০০৫ ইংরেজি, রোজ রবিবার রাত ৩.৩০ সময় সবাইকে শোক সাগরে ভাসিয়ে চির বিদায় নেন। ইন্নালিল্লাহি……… রাজিউন।
আবুল হাসান আলী ২০০৬ সালে ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ মাদরাসার ফান্ডের চাঁদা কালেকশনের জন্যে তাঁর বড় মেয়ের জামাই মাওলানা আহমদ আলী দা.বা. এর মাধ্যমে লন্ডন গমন করেন। তিনি মোট নয় বার লন্ডনে যান মাদরাসার জন্যে।
আবুল হাসান আলী রহ. এর ‘জামেয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম’ মাদরাসায় অনেক অবদান রয়েছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ; মাদরাসার পূর্বদিকের বিল্ডিংয়ের দু’তলা কমপ্লিট করেছেন, মাদরাসার দক্ষিণে সুরমার তীরে নতুন বিল্ডিং কমপ্লিট, ৬ টা ইস্তেঞ্জাখানা নির্মাণ, মাদরাসার উঠান পাকা, ২০১৫ সালে মহিলাদের জন্যে ‘দারুল হাদিস’ ক্লাস সর্বপ্রথম  খুলেছেন এবং ‘এদারাতুল মাদারিসিল ইসলামিয়া লিল বানাত বাংলাদেশ’ বোর্ডের সেন্টার লালার চক মাদরাসায় নিয়ে এসেছেন ইত্যাদি। আবুল হাসান আলীর মাদরাসার উত্তর দিকের টিনসেটের ঘর ভেঙ্গে তিনতলা ফাউন্ডেশন করে নির্মাণ করার এবং ‘বোরহান উদ্দিন রোডে’র পাশে মাদরাসার একটা শাখা (আধুনিক জ্ঞান সমন্বিত) প্রতিষ্ঠা করার প্রবল ইচ্ছা ছিল। মহান আল্লাহ তাঁকে এর আগেই নিজের কাছে নিয়ে নেন।
হযরত মাওলানা আলহাজ্ব আবুল হাসান আলী রহ. পুরো কর্মজীবনে দ্বীনের কাজে
নিয়োজিত ছিলেন বেশি। সবসময় নিজেকে তিনি দ্বীনের খাদিম হিসেবে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দবোধ করতেন। দ্বীনের খেদমতে থাকা অবস্থায় নিজের যেন মৃত হয় এমনটাই অভিপ্রায় ব্যক্ত করতেন তিনি। যশ থাকা সত্ত্বেও অহংবোধ করতেননা। সাদাসিদা চলাফেরা করতেন। সহজেই মানুষকে আপন করে নেয়ার অনন্য এক গুন ছিল। সদা হাস্যোজ্জ্বল, অমায়িক, বিনয়ী, আত্মসংযমী, ধৈর্যশীল ও পরিশ্রমি ছিলেন। স্বয়ংক্রিয় রাজনীতিবীদ না হলেও বাতিল বিরোধী আন্দোলনে সরব থাকতেন। এককথায় আবুল হাসান আলী রহ. সাধারণের মধ্যে ছিলেন অসাধারণ এক ব্যক্তিত্ব। ওয়ায়েজ না হলেও বিভিন্ন মাদরাসার ওয়াজে ওয়াজ করতেন। মন্ত্রমুগ্ধের মত শ্রোতা তাঁর নসিহত শুনত।
নিষ্ঠা ও একাগ্রতার সহিত আবুল হাসান আলী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ‘জামেয়া ইসলামিয়া দারুল হাদিস লালারচক’ এর প্রিন্সিপালের মহান দায়িত্ব পালন করেন এবং ২০১৫ সালে অত্র মাদরাসায় দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স সমমান) ক্লাস খুলে শায়খুল হাদিস হিসেবে পাঠদান করান। ইন্তেকালের দিনও ছাত্রীদের বুখারি পড়িয়েছেন।
বহুসহস্র ছাত্র-ছাত্রী তাঁর কাছ থেকে ইলিম অর্জন করেছে। ছাত্রদের অত্যন্ত স্নেহ করতেন। দরিদ্র ছাত্রদের অর্থ দিয়ে অভিভাবকের মত পাশে থাকতেন।
তাঁর স্নেহাস্পদ ছাত্র হতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
২০১৫ ইংরেজির সেপ্টেম্বরের শুরুর দিকে আবুল হাসান আলী ডায়াবেটিস জনিত রোগের কারণে ‘সিলেট ডায়াবেটিস হাসপাতালে’ চিকিৎসাধীন ছিলেন। অপারেশনও হয়। মানুষ তাঁকে দেখতে লাইন লেগে যায় হাসপাতালে। মানুষ তাঁকে কি পরিমাণ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসত এথেকেই কিছুটা প্রতীয়মান হয়।
আবুল হাসান আলী উনিশশ’ একাত্তরে বার বছরের বালক ছিলেন। বয়সের কারণে যুদ্ধে অংশগ্রহন না করতে পারলেও হানাদার বাহিনীর কিছু কর্মকান্ড নিজ চোখে দেখেছেন। একাত্তরের যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী লালারচক গ্রামে হানা দিয়ে হিন্দুদের তল্লাসি নেয়। হানাদাররা পুরুষ-নারীকে সারিবদ্ধ দাড় করিয়ে কালেমা-নামায বিষয়ে জিজ্ঞেস করে। প্রাণ বাচাতে অনেক হিন্দুও মুসলমানদের সহযোগীতায় মুসলিম বেশ ধরে। ভিন্ন ধর্মাবলম্বী নিরপরাধ মানুষের প্রতি এহেন নির্যাতন বালক বয়সে আবুল হাসান আলীর মনে পীড়া দেয়।
বিবাহ ও সন্তানাদি;
বিয়ে মানব জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বিয়ের মাধ্যেমেই নর-নারীর জীবন পূর্ণতা লাভ করে। কাজেই মানব সভ্যতা বিকাশে বিয়ের গুরুত্ব অপরিসীম। ইসলাম বিয়েকে ইবাদত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আবুল হাসান আলী ২৫ বছর বয়সে ১৯৮৪ সালে তাঁর শ্রদ্ধেয় পিতা হযরত মাহমুদ আলী রহ. এর পছন্দে নবীর সুন্নত পালন ও আত্মশুদ্ধির নিমিত্তে গোলাপগঞ্জ থানার, বাঘা ইউনিয়নের কালাকোনা গ্রামের হাজী মছদ্দর আলী (পাইলট ও বিমান ইঞ্জিনিয়ার) এর চতুর্থ কন্যা মোছাম্মত পিয়ারা বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবন্ধ হন। সার্বিক জীবনে তিনি সাত সন্তানের জনক ছিলেন। তিন ছেলে ও চার মেয়ে। তাঁর ঘর আলোকিত করে প্রথম জন্ম নেয় পুত্র সন্তান। কিন্তু অত্যন্ত বেদনাদায়ক হলো সেই পুত্র জন্মের পরের দিন মারা যায়। এরপর জন্ম নেয় কন্যা। নাম- মোছাম্মত ফাতেমা বেগম (বিবাহ হয়ে বর্তমানে লন্ডনে)। তারপর জন্ম নেয় ছেলে। নাম- ইয়াহইয়া আহমেদ (বর্তমানে লন্ডনে কর্মরত)। এরপর আরেকজন পুত্র সন্তানের জন্ম হয়। নাম- হামজা বিন আলী (এয়ারক্রাফট ইঞ্জিনিয়ার দেশেই আছেন)। পরপর আরো তিনজন কন্যা সন্তান জন্ম নেয়। নাম- মোছাম্মত তায়্যিবা বেগম (বিবাহিত), মোছাম্মত- জুহুরা বেগম (ছাত্রী), মোছাম্মত- বুশরা বেগম (ছাত্রী)।
ইন্তেকাল ;
জামিয়া ইসলামিয়া দারুল হাদীস লালার চক মাদ্রাসার সুনামধন্য প্রিন্সিপাল, দ্বীনের একনিষ্ঠ খাদেম, বহু ছাত্রদের পিতৃতুল্য অভিভাবক, ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের সিপাহসালার, আলোর পিদিম, নিভৃত সমাজসেবী, শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা আলহাজ্ব আবুল হাসান আলী গোলাপগঞ্জ হক ভিলায় তাঁর বাসায় ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৮ ইং, ১৩ আশ্বিন ১৪২৫ বাংলা, ১৭ মুহররম ১৪৪০ হিজরী,  রোজ শুক্রবার, রাত ১.৩০ মিনিতে স্ট্রোক করে আপন রফীক্বে আ’লার সান্নিধ্যে চলে যান ইন্নালিল্লাহি………… রাজিউন।
আলেম-উলামায়ে কেরামের ভূমি কানাইঘাট সেদিন শোকাশ্রুতে ভেসে যায়। অসহায় ও অভিভাবক শূন্য হয়ে যায় জামেয়া ইসলামিয়া দারুল হাদিস লালার চক মাদরাসা। পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাও আরো একটি নক্ষত্র।
জানাযা ও দাফন ;
পরদিন আসরের নামাযের পরে তারই সংস্কারকৃত, আমৃত্যু কর্মরত প্রতিষ্টান, জামেয়া ইসলামিয়া দারুল হাদিস লালার চক মাদরাসার মাঠ ও সাথে সম্পৃক্ত লালার চক জামে মসজিদের আঙিনায় মহান আলেমেদ্বীন শায়খুল হাদিস হযরত মাওলানা আলহাজ্ব আবুল হাসান আলী রহ. এর জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হয়।
শায়খুল হাদিস আহমদ আলী দা.বা. খলিলহাটী আবুল হাসান আলী রহ. এর জানাযার নামায পড়ান। আহমদ আলী দা.বা. এর অত্যন্ত প্রিয়ভাজন ও আত্মীয় হলেন আবুল হাসান আলী রহ.।
বহু দূরদূরান্ত থেকে অজস্র মানুষ জানাযায় সমাগম হয়। লোকে লোকারণ্য তিল ধরানোর ঠাঁই ছিলনা। পরে তাঁকে লালার চক জামে মসজিদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আল্লাহ যেন এ মহান আলেমেদ্বীনকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করেন এবং আমাদেরকে তাঁর মত দ্বীনের খেদমতে কবুল করেন। আমীন
Spread the love