সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর রহ.এর জীবন দর্শন

এপ্রিল ২৯ ২০১৯, ০৬:৪১

নাম :- মুফতি হাবিবুর রহমান বড় হুজুর

জন্ম / জন্মস্থান :- ১৯১৮ ঈসায়ীতে বি-বাড়িয়া জেলার রসুলপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম মুহাম্মদ রাহিমুদ্দীন

শৈশব কাল :- শৈশব কাল থেকেই তিনি ছিলেন বিনয়ী, নম্র ও মেধাবী; কাজেই উস্তাদদের নেক দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন।

শিক্ষা জীবন :- মামা মাওলানা উবায়দুল্লাহ (রহ.) তাঁকে নিজ জেলার মালিহাতা মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণ করেন। শৈশব কাল থেকেই তিনি ছিলেন বিনয়ী, নম্র ও মেধাবী; কাজেই উস্তাদদের নেক দৃষ্টি আকর্ষণে সক্ষম হয়েছিলেন। শিক্ষকগণ বালক হাবিবুর রহমানের মাঝে সুপ্ত প্রতিভা আঁচ করতে পেরে তাঁকে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইউনুসিয়া বি-বাড়িয়াতে ভর্তি করে দেন। সেখানে প্রতিক্লাসে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে মাধ্যমিক স্তর সমাপ্ত করেন।

পড়া-লেখার পাশাপাশি উস্তাদের খেদমতে এগিয়ে থাকতেন সর্বদা। এতে অল্পতে তিনি স্বীয় উস্তাদগণের স্নেহের পাত্র হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। ছোট কাল থেকেই তার মাঝে ইলমে দীন হাসিলের সুতীব্র আকাংখা পরিলক্ষিত হয়। পাশাপাশি ইলম অনুযায়ী আমল করার বিষয়ে তিনি ছিলেন স্বচেষ্ট। প্রিয় ছাত্রের এহেন আবেগ উদ্বীপনা দেখে শিক্ষকগণ তাঁকে উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্য উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ ইসলামী বিদ্যাপিঠ দারুল উলূম দেওবন্দ ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। পরিবারের বাঁধা, যাতায়াতে অসুবিধা সহ নানা প্রতিকূলতা সত্বেও তাঁর শশুর ছফর আলী মুন্সির সার্বিক তত্বাবাধনে তিনি পাড়ী জমান স্বপ্নের বিদ্যাপিঠ দারুল উলূমে। সেখান থেকে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ স্তর দারুল হাদীস ও ইফতা সমাপ্ত করেন।

কর্ম জীবন :- দারুল উলূম দেওবন্দে উচ্চতর শিক্ষা লাভের পর মুজাহিদে মিল্লাত মাওলানা আতহার আলী (রহ.) কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জামিয়া ইমদাদিয়া কিশোরগঞ্জে অধ্যপনা শুরু করেন। পাঁচ বছর সুনামের সাথে অধ্যপনার দায়িত্ব সম্পাদন করেন। অতঃপর স্বীয় জেলার ষাইটশালা মাদরাসাতে ২ বছর অধ্যপনার দায়িত্ব সম্পাদন করেন।

অবদান :- এদিকে তিনি দেখলেন নিজ জেলার পার্শবর্তী ভৈরবের সর্বস্তরে বিদ‘আত, কুসংস্কার এবং গোমরাহীর সয়লাব। মানুষ ইসলামী তামাদ্দুন ছেড়ে পাশ্চাত্য রীতি নীতিতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে তখন তিনি যারপরনাই মর্মাহত হলেন। মুসলিম উম্মাহর নৈতিক অবক্ষয়ে তিনি চিন্তিত হয়ে পড়েন। ফলে পীরে কামেল আল্লামা দিলওয়ার হুসাইন ফেনোয়ার হযরতের পরমর্শ ও নির্দেশে, মুসলিম সন্তানদের দীনি শিক্ষায় গড়ে তুলতে ভৈরবপুর উত্তর পাড়ায় হাজী আমজাদ আলী ওয়াকফ স্টেটের মুতাওয়াল্লী ও তাবলীগের আমির মরহুম হাজী আব্দুল আজিজ সাহেবের সার্বিক তত্বাবাধনে সেই ওয়াকফ স্টেট মসজিদের উত্তর পাশে ১৯৭৪ইং মোতাবেক ১৩৮১ বঙ্গাব্দ সনের ১লা বৈশাখ সোমবার দিন আরাবিয়া ইসলামিয় মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন। মুসলিম সন্তানদের মাঝে কুরআন – হাদীসের শিক্ষার পাশাপাশি উর্দূ কায়দা জামাআত হতে মিজাান জামাআত পর্যন্ত শিক্ষা দিতে থাকেন, যার সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।

অপরদিকে ১৯৫৩ সালে কমলপুর গাছতলা ঘাটে একটা দুচালা জীর্ণ শীর্ণ কাঁচা ঘরের পাঠশালা ছিল । কয়েকজন ছেলে মেয়ে কুরআন শরীফ পড়তে আসতো । ১৯৭০ সাল পর্যন্ত কখনো চালু কখনো বন্ধ অনিয়মিত কার্যক্রম অবস্হায় ছিল । সর্বশেষ 1971 সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় এ পাঠশালা ঘরটি ভেঙে পড়ে। বন্ধ হয়ে যায় একমাত্র কুরআন শিক্ষার পাঠশালাটি।

এই দূৱবস্থাৱ প্ৰেক্ষিতে কমলপুৱেৱ বাসিন্দাৱা পেৱেশান হয়ে পড়েন, কঁচি কঁচি ছেলে মেয়েদেৱ একমাত্ৰ কুৱআন শিক্ষাৱ পাঠশালাটিও বন্ধ হয়েগেছে। তাৱা নৈৱাশ হয়ে কমলপুৱ নিবাসী সাঈদ মিয়াৱ মাধ্যমে হাজী আৱব আলী সৱকাৱেৱ কাছে পৱামর্শ ও সহযোগীতা কামনা কৱেন। হাজী আৱব আলী সৱকাৱ পাঠশালাটিৱ দায়িত্বেৱত আঃমান্নান সাহেবেৱ সাথে পৱামর্শ কৱে বলেন ভৈৱবপুৱেৱ দাৱুল উলূম ইসলামিয়া মাদৱাসাটি বেশ সুনামেৱ সাথে চলছে সেটিকে আমাদেৱ বন্ধ ও অনিয়মিত পাঠশালাটিৱ এখানে নিয়ে আসলেই আমাদেৱ কমলপুৱ ও ভৈৱবপুৱসহ আশেপাশেৱ সবাই ইলমেদ্বীন হাসিল কৱতে পাৱবে।

এমনবস্থায় হাজী আরব আলী সরকার মুফতী হাবীবুর রহমান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত কওমী মাদরাসাটিকে কমলপুর স্থানান্তর করতে আবদার করেন যার কারণে দারুল উলূম ইসলামিয়া মাদরাসা পরিচালনা পরিষদ হাজী আব্দুল আজীজ , হাজী আনোয়ার হুসাইন আনু খাঁ, হাজী কুতুবুদ্দীন মোল্লা, হাজী দেওয়ান আলী মোল্লা এবং মুফতী হাবীবুর রহমান রহঃ পরামর্শ করে সম্মতি জানান ফলে ১৯৭৬ সালে কমলপুরে বর্তমান জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম ভৈরব কমলপুরের গোড়াপত্তন হয়। যেহেতু এ মাদরাসার গোড়াপত্তন হুজুরের মাধ্যমে এবং তখনকার সময়ে ভৈরবে দারুল উলুম দেওবন্দ ভারতের দাওরা ও ইফতা ফারেগ একমাত্র আমল ওয়ালা আলেমেদ্বীন তিনি ই এ জন্য তাঁকে বড় হুজুর বলে ডাকা হতো ।

☆ত্যাগ ও কুরবানী : ☆

মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে অনেক প্রতিকূল অবস্থা বাঁধা-বিপত্তির সম্মুখীনও হয়েছেন। অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়েছে। এমনকি কমলপুর মাদরাসার সূচনালগ্নে আর্থিক সংকটের কারনে মাদরাসার ছাত্রাবাস বানাতে গিয়ে নিজে মাটি কেটে দিতেন আর হাজী আরব আলী সরকার এবং হাজী দেওয়ান আলী সাহেব মাথায় বহন করতেন। মাদরাসার কালেকশন ও ছাত্রদের আহার ও কিতাবাদীর ব্যবস্থা করতে গিয়ে, কী শীত, কী গরম! কী বর্ষা, কী রোদ! সব কিছু উপেক্ষা করে মাদরাসার খরচ বাঁচানোর জন্য পায়ে হেটে দূর দূরান্ত পর্যন্ত সফর করেছেন।

মদরাসার পিছনে মেহনত করতে গিয়ে নিজ পরিবারের সচ্ছলতার দিকে নজর দিতে পারেন নি। তাঁর পরিবারের দূরবস্থা দেখে একবার, মাদরাসার কমিটিদের কেউ বলেছিল “হুজুর! আপনার বেতন ভাতা বৃদ্ধি করার ব্যাপারে আমরা চিন্তা ভাবনা করতেছি” হুজুর তাদেরকে রেগে উত্তর দিয়েছিলেন “আমি কি আপনাদের কাছে বেতন বৃদ্ধি করার কথা বলেছি? আমার সমস্যা হলে আমি নিজেই আপনাদেরকে জানাতাম।

এভাবেই ত্যাগ-কুরবানী এবং পরম যত্নের সাথে গড়ে তুলেছেন এ জামিয়া। দরস তাদরিসের পাশাপাশি দাওয়াত ও তাবলীগের সাথে জড়িত ছিলেন। জীবনের শেষ সময়টুকু পর্যন্ত তিনি এই কাজে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। ২০০৫ ইং সালের রমজানে দাওয়াত ও তাবলীগের উদ্দেশ্যে ১ সালের জন্য বের হয়ে উম্মাতে মুহাম্মাদীর ফিকির ও দরদে ছুটে বেড়ান দেশের এক প্রান্ত হতে অন্য প্রান্তে ।

✿উস্তাদ ও ছাত্র ✿

তাঁর কয়েকজন উল্লেখযোগ্য উস্তাদ : আল্লামা দেলোয়ার হুসাইন (রহ.) ফেনোয়ার হুজুর, যিনি তার আধ্যত্মিক রাহবার ও ছিলেন। রইছুল মুফাসসিরিন আল্লামা সিরাজুল ইসলাম (রহ.), মালিহাতার বড় হুজুর মাওলানা মুহাম্মদ আলী (রহ.)।

তাঁর উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র :

মুনাযিরে আ’যম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলিপুরী দা.বা., আল্লামা ফরিদ উদ্দিন মাসউদ দা.বা.। মুফতী মুহসিনুল করিম যিনি দারুল উলূম দেওবন্দের ১ম স্থান অধীকারী ছাত্র ছিলেন।

মৃত্যু তারিখ :- বাতিলের আতংক,সুন্নাতে নববীর অনুসারী মুফতি হাবিবুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভূগে ৭ / ৮ /২০১৩ ইং বুধবার রাত ৯টায় জিকির করতে করতে মহান প্রভূর সান্নিধ্যে চলে যান। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। এক স্ত্রী, চার পুত্র ও অসংখ্য ছাত্র, মুহিব্বীন ও মুতয়াল্লিক্বীনকে এতিম করে রেখে যান। অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও মুখে আল্লাহ আল্লাহ আল্লাহ জিকির জারী ছিল। তাঁর ইন্তেকালের খবর শুনে ভৈরবের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। তার আত্মীয় স্বজন, ছাত্র-শিক্ষক এবং মুহিব্বীনদের মাঝে কান্নার রুল পড়ে যায়। সবাই গভীর শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরদিন সকালে নিজ হাতে গড়া জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলূম ভৈরব কমলপুর প্রাঙ্গনে মরহুমের জানাযা অনুষ্টিত হয়। জানাযায় শত শত আলেম-ওলামা থেকে শুরু করে সর্বস্থরের জনতায় মাদরাসার বিশাল মাঠ লোকে লোকারণ্য হয়ে যায়। বিশেষভাবে জানাযায় উপস্থিত ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দ ভারতের শিক্ষক মাওলানা কারী আব্দুর রউফ দা.বা., কওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতিসহ , ভৈরব পৌর মেয়র এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ। জানাযার পূর্বে দারুল উলুম দেওবন্দের শিক্ষক বলেন আমি গর্বিত দেওবন্দের একজন সাবেক ছাত্রের জানাযায় উপস্থিত হতে পেরে। আরো বলেন মুত্তাকি ও পরহেজগারের নমুনা কেউ দেখতে চাইলে, সে যেন দেখে নেন এই মুফতী হাবীবুর রহমান রহ .কে। মুফতী হাবীবুর রহমান রহ. এর জানাযা পড়ান শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর বিশিষ্ট শাগরেদ ও ক্বারী তৈয়ব সাহেব রহ. এর খাদেম মাওলানা আব্দুস সামাদ রহ. দাফন : কমলপুর সরকার বাড়ি ঈদগাহ কবরস্থানে দাফন করা হয় ক্ষণজন্মা এই মহান মনীষীকে। মুফতি হাবিবুর রহমান রহ. তাঁর মৃত্যুর মধ্যদিয়ে মোটেই শেষ হয়ে যাননি। কখনো ও যাবেনও না। আল্লাহর মহিমায় তিনি তাঁর অবিস্মরণীয় কীর্তির মাধ্যদিয়ে চির জাগরুক থাকবেন। যতদিন জামিয়া থাকবে, ততদিন ইট পাথর থেকে শুরু করে জামিয়ার প্রতিটি ধূলি কণা তাঁর বিরহে কাঁদবে। স্মরণ করবে তাঁর মেহনত, মোজাহাদা আর শেষ রাতের আল্লাহু আল্লাহ এর জিকির ও স্বীয় মাহবুবের দরবারে নিরব অশ্র“পাতকে।

মোবাইল :-

তথ্য দানকারীর নাম :- মুফতি শহিদুল্লাহ আবরার শিক্ষক ভৈরব কমলপুর মাদরাসা ও খতিব ভৈরব উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদ

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- 01712012773

Spread the love