সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাহে রামাজান : কিছু কথা ও কিছু করণীয়

এপ্রিল ২৪ ২০২০, ১৩:২৭

লিখেছেন – আবু তাইয়ুব রুমান

কয়েক দিন পরেই মাহে রমজানের বাঁকা চাঁদ পশ্চিমাকাশে উদিত হবে। রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের সওগাত নিয়ে আমাদের মধ্যে হাজির হবে মাহে রমজান। পবিত্র এ মাসকে বরণ করে নিতে চলছে বিভিন্ন প্রস্তুতি।

রমজান শব্দটি মূলত এসেছে ‘রমজ’ থেকে-এর অর্থ ভস্মীভূত করা। কী হবে ভস্মীভূত? সঠিকভাবে সিয়াম সাধনার মাধ্যমে আমাদের পাশবিকতা, কু-প্রবৃত্তি, রিপু ও পাপসমুহ ভস্মীভূত হবে, আর আমরা হয়ে উঠব মানবতার কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ পরিপূর্ণ মানুষ। এটাই রোজার মূল লক্ষ্য। এ লক্ষ্য অর্জনে সফল ব্যক্তিদের জন্য বেহেশতে ‘রাইয়ান’ নামে একটি দরজা সদা উন্মুক্ত থাকবে। হাদিসে কুদসিতে এসেছে,আল্লাহ তা’আলা বলেন,রোজা আমার জন্য,আর আমি নিজেই এর পুরস্কার দেবো। বাস্তবে সব ইবাদাতই মানুষ দেখতে পায়। একমাত্র রোজা এমন এক ইবাদাত,যা মানুষ দেখতে পায় না। রোজাদারের মতো থেকেও একজন মানুষ যদি গোপনে কোন কিছু খেয়ে নেয়,তাহলে তা কারো পক্ষেই জানা সম্ভব নয়। এটা একমাত্র জানবেন মহামহিম আল্লাহ তা’আলা।

আর এ জন্যই এ রোজার প্রতিদান আল্লাহ তায়ালা নিজেই দেবেন। সারা জাহানের প্রতিপালক, মহাপরাক্রমশালী আল্লাহর নিজের দেয়া পুরস্কার কত মূল্যবান হবে তা আমাদের কল্পনার রাজ্যেও রূপ দেয়া অসম্ভব।

দ্বিতীয় হিজরীর শাবান মাসে মদিনায় রোজা ফরজ সংক্রান্ত আয়াত অবতীর্ণ হয়,আল্লাহ তা’আলা বলেন ” হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেরূপ ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যেন তোমরা পরহেজগারি অর্জন করতে পার।

পবিত্র রমজান মাসের ফযিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলে আকরাম (সা) অনেক হাদিস বর্ণনা করেছেন। নিম্নে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করা হল —

[1] হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন,পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ,এক জুমু’আ থেকে অন্য জুমু’আ,এক রমজান থেকে অপর রমজান পর্যন্ত মধ্যবর্তী গুনাহসমূহ মাফ করে দেওয়া হয়।যখন কবিরা গুনাহ থেকে বেঁচে থাকা হয়।(মুসলিম :552)

[2] হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন,যে আল্লাহ তা’আলাকে খুশি করার জন্য একদিন রোজা রাখবে,একটি কাক বাচ্চাকাল হইতে বৃদ্ধ হয়ে মৃত্যু পর্যন্ত(এক হাজার বছর)যতদুর উড়তে পারে আল্লাহ তা’আলা রোজাদারকে জাহান্নাম থেকে তত দূরে রাখবেন। (মুসনাদে আহমাদ : হাদিস-10427)

[3] হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন,রাসূলুল্লাহ (সা) ইরশাদ করেছেন,যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে সাওয়াবের আশায় রমজান মাসের রোজা রাখবে,তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে।(বুখারী : 934, মুসলিম : 760)

[4] হযরত আবু হুরায়রা (রা) বলেন,রাসুলে আকরাম (সা) ইরশাদ করেছেন,তোমাদের নিকট রমজানের বরকতময় মাস এসেছে,আল্লাহ তা’আলা ওটার রোজা তোমাদের উপর ফরজ করেছেন। এ মাসে আসমানের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় এবং জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ রাখা হয়।ওটাতে(এই মাসে) অবাধ্য শয়তানগুলোকে শৃঙ্খলিত করা হয়।আল্লাহ তা’আলার বিশেষ রহমতে ওটাতে (এই মাসে) এমন একটি রাত্রি রয়েছে যা হাজার মাস(83 বছর 4 মাস) অপেক্ষাও উত্তম। যে ব্যক্তি তার কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়েছে সে প্রকৃতপক্ষে সর্বপ্রকার কল্যাণ হতে বঞ্চিত হয়েছে।( আহমাদ ও নাসায়ী )

নবীয়ে কারীম (সা) এর এই সকল হাদিস দ্বারা আমরা রমজানের ফযিলত সম্পর্কে জানতে পারলাম।

প্রিয় পাঠকগণ! রমজান মাস বারাকাতের মাস। ইহা এমন একটি মাস যেই মাসে মু’মিনদের রিজিক বৃদ্ধি করে দেয়া হয়। আল্লাহ তা’আলা রমজান মাসে রোজাদারের ইবাদাতের সাওয়াব ও প্রতিদান বাড়িয়ে দেন। কোন নফল ইবাদত করলে ফরজ ইবাদাতের সমপরিমান করে দেন। আর কোন একটি ফরজ আমল করলে সত্তরটি ফরজ আমলের সমান সাওয়াব দান করেন।

হযরত সালমান ফারসী (রা) বলেন,একবার রাসূলে আকরাম (সা) শাবানের শেষ দিন আমাদের উদ্দেশ্যে নসিহত করে বল্লেন,হে মানবমন্ডলী,একটি মহান মাস,একটি কল্যাণবহ মাস তোমাদের উপর ছায়াপাত করেছে,ইহা এমন একটি মাস যাতে একটি রাত রয়েছে যা হাজার মাসের চেয়ে ও উত্তম। আল্লাহ তা’আলা এই মাসের রোজা ফরজ করেছেন এবং তার রাতে নামাজ পড়াকে পুণ্যের কাজ নির্ধারণ করেছেন। যে ব্যক্তি এ মাসে আল্লাহর নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে একটি নফল কাজ করবে সে এই ব্যক্তির সম মর্যাদা হবে,যে অন্য মাসে একটি ফরজ কাজ সম্পন্ন করে।আর যে ব্যক্তি এই মাসে একটি ফরজ কাজ সম্পন্ন করল,সে ঐ ব্যক্তির সমমর্যাদার হবে যে অন্য মাসে সত্তরটি ফরয আদায় করে।এটা ধৈর্যের মাস।আর ধৈর্য এমন এক গুণ যার প্রতিদান হল জান্নাত।এটা পারস্পরিক সহানুভূতির মাস।এটা এমন এক মাস যাতে মুমিনের রিজিক বৃদ্ধি করে দেওয়া হয়।এ মাসে যে ব্যক্তি একজন রোজাদারকে ইফতার করাবে,সেটা তার গুণাহসমূহের জন্য ক্ষমাস্বরূপ হবে,এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে।অবশেষে তাকে রোজাদার ব্যক্তির সমান সাওয়াব দান করা হবে।অতচ রোজাদারের সাওয়াব হতে এতটুকু কম করা হবে না। রাবী বলেন,আমরা জিজ্ঞেস করলাম,হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের প্রত্যেক ব্যক্তি তো এমন সামর্থ্য রাখে না,যা দ্বারা সে রোযাদারকে ইফতার করাতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সা) বললেন,আল্লাহ তা’আলা এই সাওয়াব ঐও ব্যক্তিকেএ দান করবেন যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে এক চুমুক দুধ বা একটি খেজুর দ্বারা অথবা এক চুমুক পানি দ্বারা ইফতার করাবে। আর যে ব্যক্তি কোন রোযাদারকে পরিতৃপ্তির সাথে খানা খাওয়াবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে আমার হাওজ হতে পানি পান করাবেন। ফলে বেহেশতে প্রবেশ করা পর্যন্ত সে কখনো তৃষ্ণার্ত হবে না। এটা এমন এক মাস,যার প্রথম অংশ রহমত,দ্বিতীয় অংশ মগফেরাত বা ক্ষমা এবং শেষ অংশ জাহান্নাম হতে মুক্তির। যে ব্যক্তি এ মাসে নিজের অধিনস্থদের কর্মভার হালকা করে দিবে, আল্লাহ তা’আলা তাকে মাফ করে দিবেন এবং পরিশেষে তাকে জাহান্নাম হতে মুক্তি দান করবেন।( বায়হাকী )

এই হাদিসের আলোকে আমরা জানতে পারলাম যে, উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য রমজান মাস আল্লাহ তা’আলা পক্ষ থেকে একটি বড় নি’য়ামাত,কেননা কোন বান্দা যদি এই মাসে(রমজানে)সামান্য একটি আমল করে আল্লাহ তা’আলা এই সামান্য আমল কে অনেক বড় আমল হিসেবে বান্দার আমল নামায় লিখে দেন। তাই আমরা বেশী বেশী করে নফল ইবাদাত করব,বিশেষ করে শেষ রাতে তাহাজ্জুদের নামাজের আমল ঘরে ঘরে গড়ে তুলবো,রমজান মাসে তাহাজ্জুদের নামাজ পড়া খুবই সহজ। আমরা যাদের রাত্রে ঘুমানোর প্রয়োজন,তারা যেন তারাবীহের নামাজ শেষ করেই ঘুমিয়ে পড়ি,গল্প-গুজব,আড্ডা বাজিতে যেন মেতে না উঠি,অর্থ্যাৎ অযথা সময় নষ্ট না করি। তাহলে ঠিক যে সময় আমরা সেহরি খাওয়া আরম্ভ করি,তার আধা ঘন্টা আগে ঘুম থেকে উঠে অতি সহজেই আমরা তাহাজ্জুদের নামাজ আদায় করতে পারব। আর আমরা যাদের রাতে ঘুমানোর প্রয়োজন হয় না,তাদের তো শুধুমাত্র ইচ্ছা-শক্তির প্রয়োজন,ইচ্ছা করলে সারা রাত তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ে কাটিয়ে দিতে পারব। আমরা বেশী বেশী করে কোরআন তিলাওয়াত করব এবং দান-সাদাকাহ করব। গোপনে দান-সাদাকাহ করা উত্তম।যদি সম্ভব হয় তাহলে গোপনেই দান-সাদাকাহ করব।( যে বান্দা গোপনে দান-সাদাকাহ করে,একমাত্র আল্লাহ তা’আলার সন্তুষ্টির জন্য,আল্লাহ তা’আলা এই বান্দাকে খুবই পছন্দ করেন। আল্লাহ তা’আলা এই বান্দার উপর খুশি হয়ে তাকে এমন একটি পুরস্কার দিবেন,তা হলো- হাশরের ভয়াবহ ময়দানে আল্লাহ তা’আলা এই বান্দাকে তাঁর আরশের নিচে ছায়া দান করবেন। যেই দিন আল্লাহর আরশের ছায়া ব্যাতিত আর কোন ছায়া থাকবে না।)

পৃথিবীর এই ক্রান্তিলগ্নে আমরা বিত্তবানরা এগিয়ে আসি,আমরা আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেই। চারিদিকে শুধু হাহাকার আর হাহাকার,মানুষ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়ার আগেই অনাহার মারা যাবে। তাই আমরা বিত্তবানরা পেটপুরে না খেয়ে,ঘরে তিন-চার মাসের খাবার মজুদ না করে,গরিব-অসহায়দের পাশে দাঁড়াই। আমরা বিত্তবানরা আমাদের প্রতিবেশী,এলাকার গরিব-অসহায়দের ঘরে ঘরে খাবার পৌছে দেই। মনে রাখবেন! রমজান মাসে যদি মাত্র এক টাকা আল্লাহর রাস্তায় দান করা হয় তাহলে আপনার আমল নামায় সত্তর টাকা দান করার সাওয়াব লিপিবদ্ধ করা হবে।

তাই বিত্তবানদের সামনে এখনই সাওয়াবের পাল্লা বারী করে নেওয়ার উত্তম সুযোগ হাতছানি দিচ্ছে। আর আমরা যারা গরিব-অসহায় আমাদের নিরাশ হওয়ার কোন কারণ নেই,আমরা বেশি বেশি করে নফল আমল করব,কোরআন তিলাওয়াত করব,সাধ্যমত আল্লাহর রাস্তায় দান করব।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবাইকে রোজার পরিপূর্ণ হক আদায় করে রোজাগুলো রাখার তাওফিক দান করুন।”আ-মীন”

রোজার কয়েকটি আদব রয়েছে,সেগুলোর উপর আমাদেরকে খুবই মনোযোগী হতে হবে। যাতে করে আমাদের রোজাগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়।

মাশায়েখগণ রোজার ছয়টি আদব বর্ণনা করেছেন,তা হল-

[1] দৃষ্টির হেফাজত করা। যেমন -প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ,প্রাপ্তবয়স্কা নারীর দিকে দৃষ্টি না দেওয়া,তেমনিভাবে প্রাপ্তবয়স্কা নারী,প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দিকে দৃষ্টি না দেওয়া। যে জিনিসগুলা দেখা না জায়েয,সেগুলোর উপর দৃষ্টিপাত না করা। অর্থাৎ শরিয়ত যে জিনিসগুলো দেখা হারাম সাব্যস্ত করেছে তার প্রতি দৃষ্টি না দেওয়া।

[2] জবানের হেফাজত করা। যেমন-অযথা গল্প-গুজব না করা। অশ্রাব্য কথা-বার্তা না বলা,কারো গীবত না করা,নিন্দা না করা ইত্যাদি খারাপ কাজ থেকে নিজের জবানকে হেফাজত করা।

[3] কানের হেফাজত করা। যেমন-গান-বাজনা ইত্যাদি না শোনা।

[4] শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের হেফাজত করা।যেমন-হাতকে নাজায়েজ বস্তু ধরা হতে বিরতা রাখা। পা-কে নাজায়েজ বস্তুর দিকে অগ্রসর হওয়া থেকে বিরত রাখা। পেটকে সন্দেহযুক্ত খাবার থেকে বিরত রাখা।

[5] ইফতারের সময় কিছুটা কম আহার করা। যাতে রোজার উদ্দেশ্য কাম-প্রবৃত্তির শক্তিকে দুর্বল করা হাসিল হয়।

[6] রোজা কবুল হওয়ার জন্য ভীত হওয়া। না জানি আমার এই রোজা কবুল হচ্ছে কি না।

রোজা অবস্থায় আমাদের এই ছয়টি বিষয়ের উপর খুবই যত্নবান হতে হবে,যাতে আমাদের রোজাগুলো পরিপূর্ণভাবে আদায় হয়।এবং আমরা যেন রোজার পূর্ণ বারাকাত অর্জন করতে পারি।

সম্মানিত পাঠকবৃন্দ! এখন আমরা রোজা সম্পর্কে কয়েকজন বিশেষ ব্যাক্তি বর্গের মনবাসনা জানব।

 

“গান্ধীজির বাসনা”

— — — — — —

গান্ধীজির ক্ষুধার্ত থাকার ব্যাপারটা খুব প্রসিদ্ধ । জনাব ফিরোজ রাজ গান্ধীজির জীবনী গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি ছিলেন রোযা রাখার পক্ষপাতী । তিনি বলতেন, মানুষ খেয়ে খেয়ে নিজের শরীরকে অলস বানিয়ে ফেলে । এ অলস শরীর না জগতবাসীর আর না মহারাজের । যদি তোমরা শরীরকে সতেজ  ও সচল রাখতে চাও, তাহলে শরীরকে দাও তার ন্যূনতম আহার এবং পূর্ণ দিবস রোজা রাখ ও সন্ধ্যাবেলা বকরির  দুগ্ধ দ্বারা রোজা খোল ।                                                                      (দাস্তানে গান্ধী বিশেষ সংখ্যা)

“অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিস্ময়”

প্রফেসর মুর পাল্ড দিল অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির পরিচিত নাম । তিনি তার আত্মজীবনীতে লিখেন, আমি বহু ইসলামি বইপত্র অধ্যয়ন করেছি । যখন রোজার অধ্যায়ে পোছলাম, তখন আমি বিস্মিত হলাম যে, ইসলাম তার অনুসারীদেরকে এক মহৎ ফর্মূলা শিক্ষা দিয়েছে । ইসলাম যদি শুধু রোজার ফর্মূলাই শিক্ষা দিত, তা হলেও এর চেয়ে উত্তম আর কোনো নেয়ামত তাদের জন্য হত না ।

আমি একবার চিন্তা করলাম, ব্যাপারটা পরীক্ষা করে দেখা উচিত । সুতরাং আমি মুসলমানদের পদ্ধতিতে রোজা রাখা শুরু করে দিলাম । আমি দীর্ঘদিন যাবৎ পেটের ফোলা (Stomach Inflammation) রোগে আক্রান্ত ছিলাম । অল্পদিন পরেই অনুভব করলাম, রোগ অনেকটা হ্রাস পেয়েছে। আমি রোজার অনুশীলন অব্যাহত রাখলাম । কিছুদিনের মধ্যে শরীরে আমূল পরিবর্তন প্রত্যক্ষ করলাম । এভাবে চলতে থাকলে দেখতে পেলাম, আমার শরীর স্বাভাবিক হয়ে গেছে এবং দীর্ঘ একমাস পর শরীরে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে ।

 

ডা. লুথরজেম অব ক্যামব্রিজ

তিনি ছিলেন একজন ফার্মাকোলজি (Pharmacology) বিশেষজ্ঞ । প্রতিটি বস্তুকে গভীরভাবে দেখা ছিল তার স্বভাবগত ব্যাপার । একবার তিনি ক্ষুধার্ত মানুষ (রোজাদার)- এর পাকস্থলীর আর্দ্র পদার্থ (Stomach Secretion) নিয়ে তার ল্যাবরেটরীতে টেস্ট করেছিলেন । পরীক্ষা করে তিনি দেখতে পেলেন, তাতে সেই খাদ্যের দুর্গন্ধময় উপাদান (Food Particles Septic) যার দ্বারা পাকস্থলী রোগ-ব্যাধি গ্রহণ করে, তা একেবারে নিঃশেষ হয়ে যায় । মি. লুথর বলেন, রোজা শারীরিক রোগ-ব্যাধি বিশেষভাবে পাকস্থলীর রোগ-ব্যাধি থেকে মুক্তির গ্যারাণ্টি।

উনাদের বক্তব্য দ্বারা আমরা জানতে পারলাম,রোজা আমাদের জন্য কতটা উপকারী।

আসুন! এখন আমরা বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখব,রোজা কিভাবে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষার সহায়ক হতে পারে।

(ক) হজম প্রক্রিয়ার উপর রোজার প্রভাব

হজম প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমরা জানি, যে অঙ্গগুলি এ প্রক্রিয়ার অংশ নেয়, সেগুলি একে অপরের সাথে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত । তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ, যেমন- মুখ ও চোয়ালের মধ্যে লালার কোষ, জিহ্বা, গলা, খাদ্যনালী ( Alimentary Canal) পাকস্থলী, বার আঙ্গুল বিশিষ্ট অন্ত্র, যকৃতের আঠাযুক্ত পদার্থ এবং অন্ত্রের বিভিন্ন অংশ । এ পেঁচানো অঙ্গগুলি স্বয়ংক্রিয় কম্পিউটারাইজড পদ্ধতিতে কার্যকর হয় । যেমন : আমরা যখন আহার শুরু করি অথবা আহারের ইচ্ছা পোষণ করি, তখনই এগুলো সচল হয়ে ওঠে এবং প্রতিটি অঙ্গই তার নির্দিষ্ট কাজে নিয়োজিত হয়ে যায় । এ প্রক্রিয়ায় সমস্ত অঙ্গগুলো ২৪ ঘণ্টা ডিউটিরত থাকে । স্নায়ু চাপ এবং কুখাদ্য খাওয়ার ফলে তাতে একপ্রকার ক্ষয় সৃষ্টি হয় ।

আর রোজা একদিকে এসব হজম প্রক্রিয়ার উপর একমাসের জন্য বিশ্রামের ব্যবস্থা করে দেয় । তবে এর আশ্চর্যজনক প্রভাব পড়ে যকৃতের ওপর । কেননা যকৃতের দায়িত্বে খাবার হজম করা ব্যতীত আরও ১৫ প্রকার কাজ রয়েছে । যেসব দায়িত্ব পালন করতে করতে যকৃত অবসাদগ্রস্থ হয়ে পড়ে । ফলে হজমের জন্য নির্গত পিত্তের আর্দ্র পদার্থে বিঘ্ন সৃষ্টি হয় এবং যকৃতের কাজের উপরও বিরূপ প্রভাব বিস্তার করে থাকে । তাই যকৃতের বিশ্রাম দরকার ।

রোজার উসিলায় যকৃত চার থেকে ছয় ঘণ্টা পর্যন্ত বিশ্রাম গ্রহণ করে । যা রোজা ব্যতীত অন্য কোনোভাবেই সম্ভব নয় । কেননা ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর খাবার এমনকি ১ গ্রামের এক-দশমাংশও যদি পাকস্থলীতে প্রবেশ করে, তখন হজম প্রক্রিয়ার সমস্ত অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে । বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এ দাবি খুবই যুক্তিযুক্ত যে, যকৃতের এ অবসর গ্রহণের সময়কাল বছরে কমপক্ষে একমাস হওয়া বাঞ্ছনীয় ।

আধুনিক যুগের লোকজন যারা নিজেদের জীবনের অসাধারণ মূল্য নিরূপণ করে থাকে, তারা অনেকবার ডাক্তারি পরীক্ষা দ্বারা নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে চেষ্টা করে; কিন্তু যদি যকৃতের মধ্যে কথা বলার শক্তি অর্জিত হত, তাহলে সে নির্দ্বিধায় উচ্চস্বরে চিৎকার করে বলত, রোজার দ্বারাই তোমরা আমার উপর বিরাট বড় করুণা করতে পার ।

রোযার বরকতসমূহের মধ্যে একটি হল রক্তের রাসায়নিক ক্রিয়ার উপর প্রভাব সংক্রান্ত । যকৃতের কঠিনতর কাজের মধ্যে একটি হল হজম না হওয়া খাদ্যদ্রব্য এবং হজম হওয়া খাদ্যদ্রব্যের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা । তার কাজ হল প্রতি গ্রাস খাবারকে নিয়ন্ত্রণে রাখা । বস্তুত রোজার কারণে সেই যকৃত বলবর্ধক খাবারকে নিয়ন্ত্রণে রাখার কাজ থেকে মুক্ত থাকতে পারে । তেমনিভাবে যকৃত তার শক্তিকে রক্তের মধ্যে Globulin; (যা দেহকে হেফাযতকারী Immune সিস্টেমকে শক্তিশালী করে) সৃষ্টিতে ব্যয় করতে সক্ষম হয় । রোজা রাখার কারণে গলা ও খাদ্যনালী যে শক্তি পায়, তার মূল্য দেওয়া আদৌ সম্ভব নয় । মানুষের পাকস্থলী রোজার সাহায্যে যে প্রভাবগুলি অর্জন করে, তা খুবই উপকারী । এ পদ্ধতিতে পাকস্থলী থেকে নির্গত আর্দ্র পদার্থসমূহ উত্তমভাবে তার ভারসাম্য রক্ষা করতে সক্ষম হয় । যার কারণে রোজা রাখাকালীন সময়ে গ্যাস জমা হতে পারেনা । যদিও সাধারণ ক্ষুধায় তা বৃদ্ধি পায়, কিন্তু রোযার নিয়ত ও উদ্দেশ্যের পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস সৃষ্টি থেমে যায় । এর দ্বার পাকস্থলী আঠাযুক্ত পদার্থ ও আর্দ্রতা তৈরিকারী কোষগুলি রমজান মাসে বিশ্রাম গ্রহণ করে । যারা জীবনে কোনো দিন রোজা রাখেনি, তাদের দাবির বিপরীতে একথা প্রমাণিত হয়েছে যে, রোজা বিশ্রামক্রিয়া সম্পাদন করতে পারে । রোজা অন্ত্রগুলিকেও প্রশান্তি দেয় এবং তাতে শক্তি সঞ্চার করে । রোজার দ্বারা সুস্থ আর্দ্র পদার্থ সৃষ্টি ও পাকস্থলীর আঠাযুক্ত পদার্থের নড়াচড়া হয়ে থাকে । এভাবে আমরা রোজা দ্বারা অসংখ্য রোগ-ব্যাধির আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারি ।

(খ) রক্তের উপর রোজার প্রভাব

দিনের বেলা রোজা রাখার দ্বারা রক্তের পরিমাণ হ্রাস পায় । এর প্রভবে যকৃত পায় এক অনাবিল শান্তি । সবচেয়ে বড় কথা হল, Intercellular-এর মধ্যে প্রবহমান পদার্থের পরিমাণ হ্রাস পাওয়ার কারণে আঠাল পদার্থের উপর চাপ কম পড়ে । আঠাযুক্ত পদার্থের উপর চাপ হৃদয়ের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । রোযার দ্বারা Diastolic প্রেসারের স্তর সর্বদা কম থাকে অর্থাৎ যকৃত তখন বিশ্রামে থাকে । তদুপরি আজকের যুগের মানুষ মর্ডান জিন্দেগীর বিশেষ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সর্বদা টেনশনে ভুগতে থাকে । রমজানের একমাসের রোজা বিশেষ Diastolic প্রেসারকে হ্রাস করে মানুষকে এক অনাকাঙ্ক্ষিত উপকার সাধন করে । রোজার সময়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রক্তপ্রবাহের উপর হয় অর্থাৎ এর দ্বারা রক্তের ধমনীসমূহের উপর প্রভাব পড়ে ।

রক্ত প্রবাহের ধমনীর দুর্বলতার মূল কারণ হল রক্তের অবশিষ্ট পদার্থ Diastolic পূর্ণভাবে মিশ্রিত হতে না পারা । অথচ রোজার দ্বারা বিশেষভাবে ইফতারের নিকটবর্তী সময়ে রক্তে বিদ্যমান আহার্যের যাবতীয় ক্ষুদ্র অংশসমূহ মিশ্রিত হয়ে পড়ে । তন্মধ্যে কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, তেমনি রক্ত প্রবাহিত ধমনীর গায়ে চর্বি বা অন্য কোনো কিছু জমতে পারেনা । এভাবে ধমনীসমূহ কুঞ্চিত হওয়া থেকে রক্ষা পায় । বর্তমান যুগের সর্বাপেক্ষা মারাত্মক রোগ থেকে বাঁচার একমাত্র পথই হল রোজা । রোজাকালীন সময় কিডনী (Kidney) , যাকে রক্ত প্রবাহের প্রধান অঙ্গ মনে করা হয় , তা তখন বিশ্রামে থাকে । সুতরাং মানব দেহের এহেন গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গও রোযার দ্বারা উপকৃত হয় ।

 

(গ) কোষের (CELL) উপর রোজা রাখা প্রভাব

রোজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হল, শরীরে প্রবহমান পদার্থসমূহের মধ্যে ভারসাম্য ঠিক রাখা । যেহেতু রোজার দ্বারা বিভিন্ন প্রবহমান পদার্থের পরিমাণ হ্রাস পায়, তাই ওসবের কার্যক্রমে ব্যাপক প্রশান্তির সৃষ্টি হয় । মুখের লালাযুক্ত ঝিল্লির উপরের অংশ সম্পৃক্ত Cell সমূহ, যাকে প্রাপথেলীন সেল বলা হয় এবং যেগুলি দেহের আর্দ্রতাসমূহকে অনবরত বের করার দায়িত্বে নিয়োজিত, সেগুলিও রোজার দ্বারা অর্জন করে এক অনাবিল শান্তি এবং তাদের সুস্থতায় যুক্ত হয় নতুন মাত্রা । বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে একথা সহজেই বলা যায়, লালা তৈরিকারী মাংসগ্রন্থি, গর্দানের মাংসগ্রন্থি এবং Pencereas-এর মাংসগ্রন্থিসমূহ অধীর আগ্রহের সাথে মাহে রমজানের অপেক্ষায় থাকে । যাতে রমজানের বরকতে কিছুটা বিশ্রামের সুযোগ পায় এবং অধিক কাজ করার ক্ষেত্রে নিজের অপারগতাসমূহ পেশ করতে পারে ।

 

প্রিয় পাঠকবৃন্দ! আমরা যদি জানতাম রোজা রাখার দ্বারা আমাদের ইহকালীন ও পরকালীন কি কল্যাণ সাধিত হয় ? তাহলে আমরা প্রতি মাসেই তিন/চারটা রোজা রাখতাম।

আসুন! আমরা জেনে নেই,মাহে রমজান মাসে কোন আমলগুলো নবীয়ে কারীম (সা) বেশী বেশী করতেন ।

রমজান মাসে নবীয়ে কারীম (সা) তিনটি বিষয় খুব বেশী করতেন।

[1] নবীয়ে কারীম (সা) এর ইবাদত-বন্দেগী খুব বৃদ্ধি পেত। তিনি এই পরিমান নামাজ পড়তেন যে,তাঁর পা মুবারাক ফুলে যেত৷ এবং কোরআন তিলাওয়াত বৃদ্ধি পেত, তিনি রমজান মাসে খুব বেশী তিলাওয়াত করতেন।

[2] রমজান মাসে নবীয়ে কারীম (সা) খুব বেশী দান-সাদাকাহ করতেন। দু’হাত খুলে দান করতেন।

[3] রমজান মাসে নবীয়ে কারীম (সা) খুব বেশী দোয়া ও কান্নাকাটি করতেন।

আল্লাহ তা’আলা আমাদেরকে নবীয়ে কারীম (সা) এর দেখানো পথে চলার সক্ষমতা দান করুন। সাথে সাথে আসন্ন মাহে রমজানের রোজাগুলো যেন সুস্থতার সহিত এবং রোজার পরিপূর্ণ হক আদায় করে রোজাগুলো রাখার তাওফিক দান করুন।

আমাদের সবাইকে করোনা নামক ভাইরাসের থাবা থেকে হেফাজত করুন।

সবাই ঘরে থাকুন,সুস্থ থাকুন,অন্যকে সুস্থ রাখতে সহায়তা করুন।

নিজের ঘরকেই যেন মসজিদে রুপান্তরিত করুন।

 

শিক্ষার্থী- ফযিলত ২য় বর্ষ।

 

Spread the love