সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা সাজিদুর রহমান দা.বা. এর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

November 11 2019, 04:15

Manual3 Ad Code

নাম: সাজিদুর রহমান

সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামে হাফিয আরজ আলী রাহ. ও আরিগুন নেছা বেগমের ঘরে তিনি ১৯৬৭ ইংরেজি সনের ২০ এপ্রিল জন্মগ্রহণ করেন। ৫ ভাই ও ২ বোনের মধ্যে তিনি জ্যেষ্ঠ।

শিক্ষা: সবাহি মক্তবের পড়া ও কুরআন তেলাওয়াত শেখা অর্থাৎ প্রাথমিক ধর্মীয়শিক্ষা তিনি তাঁর আব্বা মুহতারামের কাছে লাভ করেন।

Manual3 Ad Code

তারপর পার্শ্ববর্তী গ্রাম জাল্লাবাজ সরকারি প্রাইমারি স্কুলে ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত পড়েন। বার্ষিক পরীক্ষার আগেই তার আব্বা তাকে স্কুল থেকে নিয়ে এসে এলাকার নবনির্মিত ‘নওয়াগাঁও অষ্টগ্রাম আলিম’ মাদ্রাসায় ভর্তি করে দেন। তার কথা ছিল “আমার ছেলেকে আলিম বানাতে চাই।” ওখানে দাখিল ৮ম পর্যন্ত পড়েন। তারপর কাওমি মাদ্রাসায় পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি হয়।
কওমি মাদরাসায় আসার মূল ঘটনা মাওলানা সাজিদুর রহমান নিজেই লিখেন- “আমাদের গ্রামের এক কাফিয়া পর্যন্ত পড়ুয়া মৌলভী চাচা একদিন শুক্রবারে কয়েকজনের সামনে আমাকে ‘মিসওয়াক’ কিসের ছিগা ধরান। আমি বলতে পারিনি। আমাকে লজ্জা দেন, তিরস্কার করেন। আমি ১ নম্বর হতাম, জলসায় পুরস্কারও পেতাম প্রতিবছর। তিনি খোটা দিয়ে বলেন- ১ নম্বর হও পুরস্কারও পাও শুনি। এই বুঝি তোমার পড়া?
লজ্জা পেয়ে আলিয়ায় পড়া বাদ দিলাম। পরের শাওয়ালে ‘বর্মাউত্তর রামনগর বাণীপুর মাদ্রাসায়’ ভর্তি হতে গেলাম। কিন্তু মুহতামিম সাহেব আমাকে আলিয়া থেকে আসায় তেমন একটা গুরুত্ব দেননি। মনঃক্ষুণ্ন হয়ে চলে এলাম। ভর্তি হলাম না। পরের বছর রবিউল আউয়ালে ১ম সাময়িক পরীক্ষার পর আবারও ঐ মাদ্রাসায় ভর্তি হওয়ার জন্য গেলাম। এবার সদয় হয়ে নাহবে মীরের জামাতে ভর্তি করলেন, উপেক্ষা করলেন না। পরবর্তী ষান্মাসিক পরীক্ষায়ই ১ম স্থান অধিকার করি। এখানে পড়াকালীন ২য় হইনি কখনো। অত্র মাদ্রাসায় আমার গুরুউস্তাদ হলেন শায়খ মাও. গোলাম নবী রাহ.। তিনিই আমার সবচে বেশি গুরুজন ও শফীক উস্তাদ। আমার জীবনজুড়ে যার একক প্রভাব এবং অবদান বিদ্যমান। তিনি মুফতি আবুল কালাম জাকারিয়া রাহ. সহ অনেক খ্যাতনামা আলিমের গুরুউস্তাদ ছিলেন।”

রামনগর মাদ্রাসায় হেদায়াতুন নাহু পড়ে জামিয়া কাসিমুল উলুম দরগায় কাফিয়া জামাতে ভর্তি হন। ঈদুল আযহা পর্যন্ত পড়েন। কোরবানির চামড়াও কালেকশন করেন। বন্ধে বাড়ি যাওয়ার পর এর পূর্বে মাদ্রাসা থেকে শুরু হওয়া অসুস্থতা বেড়ে যায়। আড়াই/তিন মাস অসুস্থ থাকেন। দরগায় আর পড়তে যাওয়া হয়নি তাঁর।
পরের রামাযানে তাঁর আব্বার মুর্শিদ ঢাকাদক্ষিণ হোসাইনিয়া মাদ্রাসার তৎকালীন শায়খুল হাদীস শায়খ মুফাজ্জল আলী সিকন্দরপুরী তাঁদের বাড়িতে দ্বীনী সফরে গেলে তার আব্বা তাকে হযরতের হাতে সঁপে দেন। শাওয়ালে ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসায় গিয়ে আবারও কাফিয়া জামাতে ভর্তি হন। ওখানে জালালাইন পর্যন্ত পড়েন। মিশকাত জামাত পড়তে চট্টগ্রামের ২য় বৃহত্তম মাদরাসা আল জামেয়াতুল ইসলামিয়া পটিয়ায় ভর্তি হন।

ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসায় তাঁর উস্তাদদের মধ্যে মাও. ইউনুস আলী রাহ. শায়খে রায়গড়ি, মাও. মুফাজ্জল আলী রাহ. শায়খে সিকন্দরপুরি, মাও. ওয়ারিস উদ্দিন রাহ. শায়খে হাজীপুরি, মাও. ইসহাক সাহেব রাহ. শায়খে তালবাড়ি, মাও. আব্দুল কুদ্দুস শায়খে বারহালি, মাও. ফজলে হক শায়খে বারহালি, মাও. হিলাল উদ্দিন আহমদ শায়খে ঘুষগাঁও, মাও. মাহমুদুর রহমান রাহ. জকিগঞ্জি, মাও. ইব্রাহিম আলী রাহ. বড়লেখি, মাও. আহমদ আলী ভাদেশ্বরি, মাও. আব্দুস সামাদ রাহ. (মক্তবের হুযুর), মাও. আব্দুল গাফফার শায়খে গাগুয়া লন্ডনপ্রবাসী, মাও. সাইফুল আলম চইলতাবাড়ি, মাও. খালেদ আহমদ মিশ্রপাড়া লন্ডনপ্রবাসী প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।

পটিয়ায় মিশকাত, দাওরা ও ইফতা পড়েন। মিশকাতের পরীক্ষা ইত্তেহাদুল মাদারিস বোর্ডে ও দাওরা পরীক্ষা বেফাকুল মাদারিস বোর্ডে দান করেন। তৎকালে পটিয়ার দাওরা পরীক্ষা বেফাকে দেওয়া হত। তাদের বছর দাওরার বেফাক পরীক্ষায় বোর্ডে ১ম স্থান অধিকার করেন ঢাকা মালিবাগ জামেয়ার মাও. আব্দুস সালাম, ২য় স্থান অধিকার করেন পটিয়ার মাও. কেফায়েত উল্লাহ শফীক আর ৩য় স্থান অধিকার করেন মাওলানা সাজিদুর রহমান। মিশকাতের পরীক্ষায় ইত্তেহাদ বোর্ডেও তিনি ৩য় স্থান অধিকার করেছিলেন।
পটিয়ায় তাঁর উস্তাদদের মধ্যে শায়খ ইমাম আহমদ রাহ., শায়খ ইসহাক রাহ., শায়খ আলী আহমদ বোয়ালীছাব রাহ., শায়খ হারুন ইসলামাবাদি রাহ., শায়খ নুরুল ইসলাম কাদীম রাহ., শায়খ নুরুল ইসলাম জাদীদ রাহ., শায়খ আইয়ুব রাহ., শায়খ আব্দুল হালিম বোখারি, শায়খ হাফিয আহমদুল্লাহ, শায়খ মুফতি মুজাফফর আহমদ রাহ., শায়খ আনওয়ারুল আজীম রাহ., শায়খ রফিক আহমদ, শায়খ মুফতি শামসুদ্দিন জিয়া সাহেবান প্রমুখ অন্যতম। শায়খ ইসহাক আলগাজি রাহ. এর কাছে একদিন পড়ে তার কাছ থেকে বোখারি শরীফ কামিল এবং মুআত্তা ইমাম মালিকের লিখিত সনদ হাসিল করেন। তিনিও তাঁর অন্যতম শায়খ ছিলেন।

Manual5 Ad Code

শিক্ষকতা: ১৪১৩ হিজরি থেকে শিক্ষকতা জীবন শুরু হয় দারুল উলূম হোসাইনিয়া ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসা থেকে নিজ আসাতেজায়ে কেরামের মায়াময় নেগরানিতে। এখানে ১৪২১ হিজরি পর্যন্ত পাঠদান করেন। এই ১৩ থেকে ২১ পর্যন্ত ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসায় থাকাকালীন মাঝখানে এক বৎসর দারুল হাদীস জাউয়া, ছাতক মাদ্রাসায়ও পড়ান। তারপর আবার ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসায় চলে আসেন। অর্থাৎ এ ৮ বছরের মধ্যে ১ বছর জাউয়া মাদ্রাসায় এবং ৭ বছর ঢাকাদক্ষিণ মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। ঢাকাদক্ষিণ প্রথম বছর মিশকাত জামাতে সাবয়ে মুআল্লাকা এবং ৩য় বছর থেকে শরহে মাআনিল আসার পাঠদান করেন।
তারপর ১৪২১-২২ হিজরি শিক্ষাবর্ষ মোতাবেক ২০০০ ইংরেজি সনে দস্তারবন্দির বছর জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরে চলে আসেন। অদ্যাবধি এখানে নিরলসভাবে মুহাদ্দিস হিসেবে পাঠদান ব্যাপৃত আছেন।
সুলুক:
প্রথমে খলিফায়ে মাদানি মাদফুনে মক্কী হযরত মাও. আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী রাহ. এর হাতে বায়আত হন। তার মৃত্যুর পর খলিফায়ে মাদানি হযরত মাও. আব্দুল মুমিন শায়খে ইমামবাড়ির কাছে তাজদীদে বায়আত করেন এবং তার নেগরানিতে আছেন।
রাজনীতি:
শিক্ষকতা জীবনের শুরু থেকেই জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের রাজনীতির সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত। ঢাকাদক্ষিণ মাদ্রাসায় ছাত্র জমিয়ত তাঁর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হত। আঙ্গুরায়ও প্রায় ১৯ বছর ধরে ছাত্র জমিয়ত জামিয়া শাখার সভাপতির দায়িত্বে আছেন। অপরদিকে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম জামালগঞ্জ উপজেলার সহসভাপতি ও সুনামগঞ্জ জেলা জমিয়তের প্রশিক্ষণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
নিজ এলাকার সামাজিক সংগঠন “প্রত্যাশা ইসলামি যুবসংঘ”- এর বিগত ৯ বছর ধরে সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

কৈশোরকাল থেকেই লেখালেখির প্রতি তাঁর প্রবল ঝোঁক ছিল। চেষ্টা করতেন। কবিতা লিখতেন। এখনও চর্চা আছে। মাসিক মদিনা, আত-তাওহীদ, পয়গামে হক, তাওহিদী পরিক্রমা, দৈনিক জালালাবাদ, সপ্তাহিক জমিয়ত, আল-হিলাল ইত্যাদি পত্রিকা ও সাময়িকীতে তাঁর গবেষনালব্ধ লেখা ছাপা হতো। এখনো হয়।

২০০৫ ইংরেজিতে ১২৯টি কবিতা সম্বলিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ “বনফুল” ছাপা হয়। সাংবাদিক শিউল মঞ্জুর দৈনিক সিলেটের ডাকে বইয়ের গঠনমূলক সমালোচনায় লম্বা একটি আর্টিকেল লিখেন। অারো অনেক কবিতা আছে প্রকাশের অপেক্ষায়।
“স্বপ্নমুগ্ধ রাত” তাঁর অমর একটি উপন্যাস। ২০১৭ সালে ফেব্রুয়ারি বইমেলা উপলক্ষে ছাপা হয়।
এছাড়া “খুলাফায় শায়খুল ইসলাম” ও “বিষয়ভিত্তিক বয়ান” ও “মাসাইলে কোরবানি” নামে তিনটি বই তাঁর সম্পাদনায় ছাপা হয়। জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের মুখপত্র বৃহত্তর সিলেটের সুপ্রাচীন সাড়া জাগানো বার্ষিকী “আল-হিলাল” দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর ধরে প্রকাশিত হচ্ছে তার সম্পাদনায়। মুতা: ২য় বর্ষের বাংলা সাহিত্যের সহায়ক, মুতা: ৩য় বর্ষের বাংলা সাহিত্যের সহায়ক, নূরুল আনওয়ার ১ম খন্ডের উর্দু ভাষায় প্রশ্ন-উত্তরে খাইরুল আনসার লি হাল্লি আসইলাতি নূরিল আনওয়ার নামে একটি সহায়ক প্রকাশিত হয়।
এছাড়াও প্রকাশের অপেক্ষায় আরো বেশকিছু পাণ্ডুলিপি আছে তাঁর।

সন্তানাদি: বৈবাহিক জীবনে ৩ ছেলে ও ১ মেয়ে সন্তানের জনক।

Manual6 Ad Code

ভবিষ্যৎ-স্বপ্ন:
ভবিষ্যৎ-স্বপ্ন সম্পর্কে তিনি বলেন- আমার বাচ্চারা যেন আলিম ও দ্বীনদার হয়, দ্বীনদার হিসেবে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়- এ স্বপ্ন দেখি।
আর একটা মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখি, যাতে হেদায়াতুন নাহু পর্যন্ত জরুরিয়াতে দ্বীন সবাই পড়বে। এর পর থেকে দাওরা ও তাখাসসুস পর্যন্ত যারা মেধা তালিকাভুক্ত হবে কেবল তারাই পড়বে।

লিখেছেন- মাওলানা লুকমান হাকীম

Manual6 Ad Code

Spread the love