মাওলানা শাহ ক্বারী আব্দুল গনী (রহ:) এর জীবনী

নভেম্বর ২৫ ২০২০, ০৪:৪২

নাম : আব্দুল গনী

আল্লামা শাহ ক্বারী আব্দুল গনী (রহ:) পাহাড়ে পর্বতে ঘেরা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরূপ লীলাভূমি চট্টগ্রামের আনোয়ারা থানাধীন বখতিয়ার পাড়া (পশ্চিমচাল )গ্রামে পাহাড়তলী রাজাইরু বাড়ী নামে খ্যাত সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন ,তাকে বাংলাদেশের বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াত চর্চার অন্যতম পথিকৃত মনে করা হয় । তিনি চট্টগ্রামে বড় কারী সাহেব ও উস্তাজুল কুররা নামে পরিচিত ছিলেন

তাহার জন্ম ১২ ই অক্টোবর বৃহস্পতিবার ১৯৪৪ সনে তিন ভাই ও দু\’বোনের (মুহম্মদ শরীফ ও মুহাম্মদ আলী ) মধ্যে কারি আব্দুল গণি সবার ছোট তার পিতা ছেমর আলী ও মাতা হাকিমা বিবি .

তিনি নিজ গ্রাম ছিরাবটতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পশ্চিমচাল ইসলামিয়া ফাজিল ডিগ্রী মাদ্ রাসা ও পরে ছোবহানিয়া আলিয়া মাদ্ রাসা হতে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন
অতঃপর আল-জামিয়াতুল ইসলামিয়া আজিজুল উলুম বাবুনগর ভর্তি হন সেখানে মাধ্যমিক শ্রেণীর পড়ালেখা শেষ করে ভর্তি হন আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায়
সেখানে কৃতিত্বের সাথে ১৯৬৯ সালে জামাতে ছাহারুম হতে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স )পাশ করেন

স্বাধীনতার পর ১৯৭২সনে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের জন্য হাজি মুহাম্মদ ইউনুস রহ.-এর দিকনির্দেশনায় তিনি লাহোরে যান পাকিস্তানের লাহোরে মারকাজি দারুল তারতিলুল কুরআন মাদরাসা হতে তৎকালীন এশিয়ার অন্যতম প্রধান কারী শাকের সাহেবের সার্বিক তত্ত্বাবধানে (ইলমে কেরাত ) রেওয়ায়েতে হাফস সাবআ আশারা ) হতে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন
পরে ওই প্রতিষ্ঠানে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
১৯৭৪ সালে দেশে প্রত্যাবর্তন করে আল জামিয়া আল ইসলামিয়া পটিয়ায় ১৯৭৪ -২০০০ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২৫ বছর জামিয়ার প্রধান কারী ( কিরাত বিভাগীয় প্রধান ) হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন
তিনি দীর্ঘ ২২ বছর উক্ত জামেয়ার মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন
২০০৪ থেকে ২০০৯ পর্যন্ত লন্ডনের বায়তুল আযীয জামে মসজিদের খতিবও ছিলেন

১৯৭৩ সালে একই এলাকার বদল চাঁদ চৌধুরী বাড়ীর বিশিষ্ট সমাজসেবক হাজী মকবুল আহমদের মেয়ের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি চার মেয়ে ও এক পুত্র সন্তানের জনক ছিলেন

১৯৭৭ সালে নিজ জন্মভূমি বখতিয়ার পাড়া তারতীলুল কুরআন মাদ্রাসা
২০০৬ সালে কক্সবাজার সদরে দারুল কোরআন কমপ্লেক্স নামে মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন

মহাগ্রন্থ কোরআনকে সর্বস্তরের জনগণের বিশুদ্ধভাবে পঠনের লক্ষে ১৯৯৩ সালে
তানজিমুল কুররা বাংলাদেশ নামে কোরআনী সংগঠন গঠন করেন
আজীবন তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ছিলেন
এর প্রধান কার্যালয় বখতিয়ার পাড়া তারতীলুল কুরআন মাদ্রাসা দেশব্যাপী এর বিভিন্ন শাখা রয়েছে
তাঁর প্রতিষ্ঠিত মাদরাসায় পুরো বছরব্যাপী ক্বিরাতের প্রশিক্ষণ চলে। এতে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে তালিবুল ইলম এবং আলিমদের সমাগম ঘটে।এছাড়া প্রতি বছর কেরাত সম্মেলন ও কেরাত প্রতিযোগিতার আয়োজন চলে

কোরআনকে সর্বস্তরের পাঠকের সহজবোধ্যতা ও শুদ্ধ তেলাওয়াতের জন্য তিনি তার ছাত্র…কারী জহিরুল হক.. সম্পাদনায় ফয়জুল গনি নামে বই প্রকাশিত হয় যা পাঠকসমাজে সমাদৃত হয়েছে

ক্ষণজন্মা এই ক্বারীর তিলাওয়াতের বিশুদ্ধতা ও স্বতন্ত্রধারার সুনাম ও সুরশিল্পের কথা হয়তো আমরা অনেকেই জানি। কিন্তু এর বাইরেও তিনি তাকওয়া ও ইখলাসে পূর্ণ একজন মহান ব্যক্তিও।
তিনি জামিয়া পটিয়ার প্রতিষ্ঠাতা মুফতি আজিজুল হক(রহ )এর খলিফা, জামিয়া পটিয়ার প্রাক্তন সহকারী পরিচালক মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভী (রহ ) কাছে বায়’আত গ্রহণ করেন
অলীকুলে শিরোমণি হযরত মাওলানা আলী আহমদ বোয়ালভী রহঃ থেকে ১৯৯৮ সালে খেলাফত প্রাপ্ত হন তিনি।
১৯৯১,৯২ সালে প্রথম বার পবিত্র হজ বাইতুল্লাহর জন্য পবিত্র মক্কা মদিনা গমন করেন

প্রখ্যাত হাদীস বিশারদ আল্লামা আমীর হুসাইন (মীর সাহেব), আল্লামা ইসহাক (গাজী সাহেব), আল্লামা আহমদ (ইমাম সাহেব), আল্লামা নুরুল ইসলাম (কদীম সাহেব), ক্বারী জিয়াউল হুসাইন, পাকিস্তানের বিখ্যাত কারি শাইখুল কুররা ক্বারি শাকের ও ক্বারী আতাউল্লাহ রহিমাহুমুল্লাহ প্রমুখ তাঁর ওস্তাদদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

পটিয়ার মুফতি শামসুদ্দীন জিয়া, মাওলানা আবু তাহের নদভী, প্রফেসর ড. আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামুদ্দিন নদভী এমপি, আন্তর্জাতিক ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর শাকের আলম শওক, ড. মুহাম্মদ রশীদ জাহেদ, ক্বারী আব্দুল মাবুদ (বসুন্ধরা মাদরাসা), ক্বারী আব্দুল মালেক (ইছাপুর মাদরাসা), ক্বারী আব্দুল হক (ঢাকা), ক্বারী জহিরুল হক (হাটহাজারী মাদরাসা)
মুফতি আব্দুর রহমান (বাংলাদেশ ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রবর্তক)
আল্লামা ওবায়দুল্লাহ হামজা (আন্তর্জাতিক ইসলামিক স্কলার্স বহুভাষাবিদ ইসলামী অর্থনীতিবীদ )
ড মাহমুদুল হাসান আজহারী ( লন্ডন ইসলামিক স্কলার্ )
সহ খ্যাতনামা আলেম ও প্রখ্যাত ক্বারীদের ওস্তাদ ছিলেন তিনি।

কারি আব্দুল গনী রহ আজীবন কোরআনের হেকমতে ও উম্মতের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কোরআন শিক্ষায় শিক্ষিত করার সাধনায় ছিলেন সর্বদা নিয়োজিত ও আত্মমগ্ন। তিনি ছিলেন এদেশে সহীহ কুরআন শিক্ষা বিপ্লবের রূপকার। তিনি তাসহীহে কুরআনের শিক্ষাধারাকে বিপ্লব আকারে ছড়িয়ে দিয়েছেন দেশ-দেশান্তরে। আজীবন কুরআন-হাদীসের শিক্ষার প্রসারে হুজুরের ইখলাসপূর্ণ অবদান প্রশংসনীয়

সমাজ গঠনেও তার অসামান্য অবদান রয়েছে ঐতিহবাহী সামাজিক সংগঠন বখতিয়ার সোসাইটি উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য

পরোপকারী, সদাচারী, কুরআন প্রেমিক দীর্ঘদিন তিনি অসুস্থ ছিলেন শেষ বয়সেও কোরআনের দারসে মাদরাসায় ছুটে যেতেন যখন সুস্থ বোধ করতেন তখনই কোরআনের ক্লাস নিতেন
শেষ বয়সে যখন তিনি রোগের কারনে দৈহিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন, তখনও তিনি ছাত্র এবং খাদেমদের কাঁধে ভর করে মসজিদ পানে ছুটে চলতেন। এক নব উদ্যমে উপস্থিত হতেন আল্লাহর ঘরে। আল্লাহর দরবারে। আল্লাহর কুদরতি পায়ে সিজদায় লুটিয়ে পড়তে। বারেগাহে ইলাহিতে নিজেকে সঁপে দিতে। তার ইশকে ইলাহি এবং আল্লাহ প্রেমের কাছে দৈহিক দুর্বলতা এবং শারীরিক অক্ষমতা যেন ম্লান হয়ে গেছে। রবের প্রতি তার এ বেনজির আত্মসমর্পণ নবীপ্রেম ও ইত্তিবায়ে সুন্নাহর এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যা আমরা দেখতে পাই প্রিয় রাসূলের (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) পবিত্র সিরাতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শেষ বয়সে অসুস্থ অবস্থায় সাহাবায়ে কেরামের কাঁধে ভর করে মসজিদে জামায়াতে উপস্থিত হতেন।

অবশেষে আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তার এই কুরআনের খাদেমকে পবিত্র জুমাবার
২৩ আগস্ট ২০১৯ সালে ৭৬ বছর বয়সে তার রহমতের কোলে তুলে নিলেন …..
পরে বাদে আসর বখতিয়ারপাড়া মাদরাসায় প্রাঙ্গণে অসংখ্য ছাত্র দেশ বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম বিশিষ্ট রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ ও সর্বস্তরের লোকের উপস্থিতিতে আনোয়ারায় সর্ব বৃহৎ জানাযা অনুষ্ঠিত হয়
। জানাযায় ইমামতি করেন মাওলানা আবুল হুসাইন (কাফকো মসজিদের ইমাম) পরে তাঁকে মাদরাসার কবরস্থানে দাফন করা হয়।

তাঁর ইন্তেকালে বাংলাদেশ হারালো এক প্রোজ্জ্বল ব্যক্তিত্বকে আর আলেম সমাজ, ও বখতিয়ারবাসী হারালো একজন অতি আপন অভিভাবককে। মহান আল্লাহ কুরআনের মুখলেস এই সেবককে তাঁর সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় দিন। চিরস্থায়ী জান্নাতের বাসিন্দা বানিয়ে দিন। (আমিন )

Spread the love

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.