সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা মুফতী জামীল আহমদ রহ. এর জীবন ও কর্ম

অক্টোবর ১৭ ২০১৯, ০৪:১৮

নাম :- মাওলানা মুফতী জামীল আহমদ

জন্ম / জন্মস্থান :- ১৯৩২ সালে সিলেট জেলার ওসমানীনগর উপজেলার সাদীপুর ইউনিয়নের কালনীরচর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতার নাম ছিল মোঃ তমিজ উদ্দিন ও মাতার নাম সজিনা বিবি।

শৈশব কাল :- মাওলানা জামীল আহমদের পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, শৈশবে তিনি খুবই চঞ্চল প্রকৃতির ছিলেন। স্কুল/মাদরাসার প্রতি তাঁর কোনো টান  ছিল না। অবশ্য, অজপাড়া গা’য়ে জন্ম হওয়ার এলাকায় পর্যাপ্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও ছিল না। লেখাপড়ায় প্রতি তাঁর কোনো আগ্রহ নাই দেখে তাঁর বাবা মা খুবই চিন্তিত ছিলেন।
এক পর্যায়ে বাধ্য হয়ে বাবা-মা হাল ছেড়ে দেন। কিন্তু কে জানতো, লেখাপাড়ায় অনাগ্রহী চঞ্চল প্রকৃতির এই ছেলেটিই একদিন অগাধ জ্ঞানের অধিকারী হবে? অগণন মাদরাসা, মসজিদ, দ্বীনী প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করবে?
একটি ঘটনা মাওলানা জামীল আহমদের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিলো। একদিকে লেখাপড়ায় অনাগ্রহ, অন্যদিকে কৃষিকাজে ভাইদেরকে সহযোগিতা না-করে উল্টো তাদেরকে জালালাতন করা- অতিষ্ট হয়ে একদিন তাঁর বড়ভাই তাঁকে আচ্ছামত শাসালেণ। এতেই অভিমানী \”মারফত আলী\” রাগ করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়েন। (মাওলানা মুফতি জামিল আহমদের পারিবারিক নাম ছিল মারফত আলী। শিক্ষা জীবনে তাঁর উস্তাদ মারফত আলী পরিবর্তন করে নাম রাখেন জামিল আহমদ।)
হাঁটতে হাঁটতে রাত্রিবেলা তিনি চলে আসেন বুরুঙ্গা ইউনিয়নের হাজিপুর গ্রামে। সৌভাগ্যবশত দেখা হয়ে যায় তাঁর জীবনের মোড় পরিবর্তনের ওয়াসিলাহ মাওলানা মুহাম্মদ আলী সাহেবের সাথে। পরিশ্রান্ত, এলোমেলো বসনের ১৭/১৮ বছরের এক কিশোরকে দেখে মাওলানা মুহাম্মদ আলী তাঁকে কাছে ডাকলেন। মাওলানা মুহাম্মদ আলী মানে আধ্যাত্মিক জগতের রাহবর, পীরে শরিয়ত ও তরিকত মাওলানা মুহাম্মদ আলী বলরামপুরী রাহিমাহুল্লাহ। তিনি অভিমানি কিশোরকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে বাড়ি ফেরানোর চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে মুজাহিরুল উলুম হাজিপুর মাদরাসায় ভর্তি করে দিলেন। অন্যদিকে ঘুরতে শুরু করল জামীল আহমদের জীবনের চাকা।

শিক্ষা জীবন :- বুরুঙ্গা ইউনিয়নের মুজাহিরুল উলুম হাজিপুর মাদরাসা থেকেই তাঁর শিক্ষা জীবনের সূচনা। ১৯৪৯/৫০ সালে তিনি এই মাদরাসায় ভর্তি হন। বয়স বেশি থাকায় প্রথম বছর তাঁকে নির্দিষ্ট কোনো ক্লাসে দেওয়া হয়নি। শিক্ষকদের বিশেষ তত্ত্বাবধানে মৌলিক বিষয়গুলো পড়ানো হতো। পরের বছর থেকে প্রখর মেধার অধিকারী জামীল আহমদ এক একটি শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে থাকেন। এই মাদরাসার পড়ালেখা সমাপ্ত করে উচ্চ শিক্ষার জন্য চলে যান তখনকার সময়ে বৃহত্তর সিলেটের অন্যতম শীর্ষ ইসলামি বিদ্যাপীঠ ঢাকা উত্তর রানাপিং আরবিয়া হুসাইনিয়া মাদরাসায়। সেই মাদরাসা থেকেই তিনি ১৯৬৩ সালে কৃতিত্বের সাথে মমতাজ (এ+ গ্রেড) পেয়ে দাওরায়ে হাদিস উত্তীর্ণ হন।
মাওলানা জামীল আহমদের ছাত্র জীবনে প্রতি বিষয়েয় মোট মার্কস ছিল ৫০। রানাপিং জীবনে এক পরীক্ষায় তাঁর এক উস্তাদ তাঁকে ৫০ এর মধ্যে ৫৫ মার্কস দিয়েছিলেন। পরে ফলাফল পর্যালোচনায় মাদরাসার মুহতামিম সাহেব ঐ উস্তাদকে যখন জিজ্ঞেস করলেন, \”জামীল, যদি একেবারে যথাযথও লিখে দেয়, তাহলে আপনি তাকে ৫০ এর মধ্যে ৫০ দিতে পারেন! আপনি তাকে ৫০ এ ৫৫ দিলেন কীভাবে\”? জবাবে ঐ উস্তাদ বলেছিলেন, \”দেখুন হুজুর! আমরা ভাল ও গোছানো লেখার জন্য যে কোনো ছাত্রকে ৫ পর্যন্ত নম্বর দিতে পারি। জামীল যথাযথ উত্তর লিখতে পারায় পেয়েছে ৫০ মার্কস, আর সুন্দর গোছানো লেখা আমার ভাল লাগায় আমি দিয়েছি ৫ মার্কস, মোট হয়েছে ৫৫\”।
মাওলানা জামীল আহমদ তাঁর শিক্ষা জীবনের প্রত্যেক শ্রেনির প্রত্যেক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন। উস্তাদদের সাথেও ছিল তাঁর আত্মার সম্পর্ক। তিনি তাঁর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত তাঁর উস্তাদদের সাথে সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। যাদের ইন্তেকাল হয়ে গিয়েছিল, সময় পেলেই তাঁদের কবর জিয়ারতে চলে যেতেন। তাঁর উস্তাদদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা রিয়াসত আলী চৌঘরি রাহিমাহুল্লাহ।

কর্ম জীবন :- যে প্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা জীবনের সূচনা, সেই হাজিপুর মাদরাসা থেকেই তাঁর কর্ম জীবনের সূচনা। তারপর ওসমানীনগর উপজেলার দয়ামীর ইউনিয়নের পারকুল মাদরাসায় অঘোষিত মুহতামিম হিসেবে কয়েক বছর দায়িত্ব পালন করেন। ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জবাসী তাঁকে তখন তাঁকে পারকুলের মুহতামিম হিসেবে চিনতো। কিন্তু মাদরাসার অফিসিয়াল রেকর্ডে মুহতামিম হিসেবে তাঁর নাম খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে তাঁকে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলতেন, ‘ আমি তো মুহতামিম ছিলাম না। মুহতামিম ছিলেন মাওলানা আমির আলী। মুহতামিমের সকল কাজ আমি করতাম। হয়তো সেজন্যেই সবাই মনে করতো আমিই মুহতামিম’।
‘সব নিজে করতেন, তাহলে মুহতামিম হলেন না কেন’- প্রশ্ন করলে তিনি বলতেন, ‘মাওলানা আমির আলী সাহেবও একই কথা বলতেন। তিনিও বলতেন, আপনি সব কাজ করছেন, আর আমি নামে মুহতামিম। আপনি মুহতামিমের দায়িত্বটা নিয়ে নিচ্ছেন না কেন? তখন আমি বলতাম,  দায়িত্বভার ছাড়াইতো কাজ করছি! আমার পদের প্রয়োজন নেই। কাজ করা বা কাজ চালানোর প্রয়োজন’।
তারপর কিছুদিন বালাগঞ্জের হামসাপুর-রশিদপুর নুরুল উলুম মাদরাসায় শিক্ষকতা করেন। তারপর চলে আসেন বালাগঞ্জ উপজেলা সদরে। আশির দশকের শেষের দিকে তিনি বালাগঞ্জ কেন্ত্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসেবে যোগদান করেন। মসজিদে খেদমতের প্রাক্কালে মসজিদ কম্পাউন্ডে প্রতিষ্ঠা করেন আজকের \”বালাগঞ্জ জামেয়া ইসলামিয়া ফিরোজাবাগ মাদরাসা\”। অনেকেই মনে করেন এই মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম মরহুম মাওলানা আব্দুর রহিম সাহেব। বাস্তবে তথ্যটি সঠিক নয়। এখানে মূল ব্যাপারটি ছিল এমন, মাওলানা আব্দুর রহিম রাহিমাহুল্লাহ এই মসজিদ কম্পাউন্ডের পুরাতন মসজিদে ‘মনির হোসেন একাডেমি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালাতেন। তিনি সৌদি আরব চলে যাওয়ার পর সেটি বন্ধ হয়ে যায়। সঙ্গত কারণেই মনির হোসেন একাডেমী এবং ফিরোজাবাগ মাদরাসা সম্পূর্ণই আলাদা। দুটোকে এক করে দেখার সুযোগ নেই।

বালাগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের তৎকালীন ইমাম মাওলানা মুফতি জামীল আহমদ সেখানে একটি সতন্ত্র মাদরাসা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলার হামিদপুর নিবাসী, পাকিস্তানের করাচি প্রবাসী জনাব আব্দুর রশিদ তাঁর মায়ের নামে মাদরাসা করার লক্ষ্যে একক অর্থায়নে মাদরাসার ভবন নির্মাণ করে দেন। ফলে উনার মাতা ফিরোজা খানমের নামেই মাদরাসার নামকরণ করা হয় ‘ফিরোজাবাগ’। প্রতিষ্ঠা লাভ করে আজকের জামেয়া ইসলামিয়া ফিরোজাবাগ।
ফিরোজাবাগ মাদরাসা যখন প্রতিষ্ঠার হয় তখন মাওলানা আব্দুর রহিম সাহেব দেশেই ছিলেন না। তাই মনির হোসেন একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা আব্দুর রহিম হলেও ফিরোজাবাগ’র প্রতিষ্ঠাতা মরহুম মাওলানা মুফতি জামীল আহমদ। এটাই ঐতিহাসিক সত্য।

মাওলানা জামীল আহমদ যখন ইমাম হিসেবে বালাগঞ্জ জামে মসজিদে যোগদান করেন, তখন পুরাতন (বর্তমানে পরিত্যাক্ত) মসজিদ ছিল। একেবারে শুন্য তহবিলে শুরু করে, দেশি-বিদেশী ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সহায়তায় প্রায় তিন বছরে বর্তমান মসজিদটি নির্মাণ করেন তিনি। তখন মসজিদ কমিটির সভাপতি ছিলেন মৌলভীবাজার জেলার রাজনগর উপজেলা হামিদপুরের মরহুম আফতাব উদ্দিন চেয়ারম্যান সাহেব। মসজিদ নির্মাণে মাওলানা জামীল আহমদের প্রাণান্তকর প্রচেষ্টায় অভিভূত হয়ে মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে কমিটির সভাপতি হিসেবে চেয়ারম্যান আফতাব উদ্দিন সাহেব প্রস্তাব আনলেন, ‘যেহেতু শুন্য তহবিলে শুরু করে ইমাম সাহেব এত বিশাল এই মসজিদটি নির্মাণের অসাধ্য সাধন করেছেন, তাই আমার প্রস্তাব হলো মাওলানা জামীল আহমদ আজীবন এই মসজিদের ইমাম থাকবেন’- এই মর্মে রেজুলেশন পাশ করা হউক’।

মাওলানা জামীল আহমদ সাহেব প্রস্তাবটি এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, এটা নিয়ম নয়। কাউকে আজীবন ইমাম ঘোষণা করার মানে হলো তাঁর কাছে মসজিদকে জিম্মি করে রাখা। এটা রাজতন্ত্রের মতো ব্যাপার হয়ে যায়; যা ইসলাম সমর্থন করে না।
ইমাম সাহেবের এই জবাব শুনে চেয়ারম্যান সাহেব তখন দ্বিতীয় প্রস্তাব দিলেন। তিনি বললেন, ‘যেহেতু আজীবন ইমামতির প্রস্তাব আমাদের ইমাম সাহেব গ্রহণ করেননি, তাই আমার দ্বিতীয় প্রস্তাব হলো, আমরা মসজিদ কোয়াটারের মধ্য থেকে একটি বাসা ইমাম সাহেবের নামে বরাদ্ধ করে দেব। যতদিন তিনি বেঁচে থাকবেন, ততদিন তিনি নিজের মতো করে এই বাসায় বসবাস করবেন’।
এই প্রস্তাবও জামীল আহমদ সাহেব এই বলে প্রত্যাখ্যান করলেন যে, আমরা সবাই মসজিদের খাদিম। কেউ মসজিদের মালিক নই। কারো পক্ষেই মসজিদের পূর্ণাঙ্গ বা আংশিক মালিকানা স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে কাউকে প্রদান করা জায়েজ নয়। আমি মসজিদ কোয়াটারে থাকব ঠিকই, তবে যথারীতি মাসিক ভাড়া দেবো।

অত:পর মসজিদ কোয়াটারে মাসিক ভাড়া দিয়ে তিনি ১৩ বৎসর অবস্থান করেন। ফ্রি পেয়েও তিনি মসজিদের স্বার্থ ও মাসআলার দিক বিবেচনা করে ফ্রি বসবাসের অফার গ্রহণ করেননি। নিঃস্বার্থতার আর কী দৃষ্টান্ত হতে পারে? বাস্তবিকই একজন ব্যতিক্রমি মানুষ ছিলেন মাওলানা জামীল আহমদ রাহ.।

মাওলানা জামীল আহমদের ত্যাগী মানসিকতা ছিল উদাহরণ হওয়ার মতো। ইমামতি জীবনের শেষের দিকে মাত্র একজন মানুষ তাঁর উপর অসন্তোষ্ট হয়ে মসজিদে আসা ছেড়ে দেয়ার কারণে তিনি ইমামতি ছেড়ে দিতে মসজিদ কমিটি বরাবরে পদত্যাগপত্র পেশ করেন। আশ্চর্য হয়ে মসজিদ কমিটি বলেছিল, ‘মাত্র একজন মুসল্লির কারণে আপনি আপনার নিজ হাতে গড়া মসজিদের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেবেন? আমরা সবাইতো আপনার প্রতি সন্তোষ্ট। একজনের জন্য আপনি আমাদের সবাইকে ছেড়ে যাবেন কেন’? তিনি বলেছিলেন, ‘আমার কারণে একজন মুসল্লি মসজিদে আসবে না, এটা আমার জন্য কষ্টদায়ক। আমি না থাকলে অন্য ইমাম আসবেন, কোনো সমস্যা হবে না’।

মসজিদের ইমামতির দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার পর তিনি তখন শুধুই ফিরোজাবাগ মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্বে ছিলেন। সম্ভবত তাঁর এই ত্যাগের নীতি দেখে ঐ ব্যক্তিটি মাদরাসার মুহতামিমগিরি নিয়েও আপত্তি তুলেন। মাওলানা জামীল আহমদ নিজ হাতে গড়া মাদরাসার মুহতামিমের দায়িত্বও স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেন।
কাছাকাছি সময়ে যখন তিনি মসজিদ-মাদরাসার ইমামতি-মুহতামিমের দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন, তখন তাঁর আর্থিক অবস্থা স্বচ্ছল ছিল না। কিন্তু আল্লাহর উপর ভরসা করে সব দায়িত্ব থেকে অব্যহতি নেন তিনি। এই যুগে এরকম নির্মোহতা ও আল্লাহর উপর অবিচল আস্থার কল্পনাও করা যায় না।

তারপর তিনি বন্ধুবান্ধব এবং শুভাকাঙঙ্খিদের অনুরোধে কিছুদিন নবীনগর জামে মসজিদে (বর্তমান থানা মসজিদ) ইমাম ও খতীব হিসেবে দায়িত্ব নেন। তখন মসজিদটি ছোট্ট ঝোপড়ি ঘরের মতো ছিল। কাজ পাগল এই মানুষটি মসজিদের দায়িত্বভার কাঁধে নিয়েই তিনি মসজিদ ভবন সংস্কারের উদ্যোগ নেন। পূর্বের মত দেশি-বিদেশী মুসলমানদের সাহায্যে মসজিদের ফাউন্ডেশন করে একতলা পর্যন্ত নির্মাণ করেন। সে সময় মসজিদ কমিটির সভাপতি ছিলেন মরহুম সুজাত মিয়া। কিন্তু তাঁর সরলতা ও উদারতা (যা অনেকের কাছে অতি সরলতা ও অতি উদারতা) তাঁকে এই মসজিদেও থাকতে দেয়নি। মসজিদ নির্মাণ শেষ হবার পর মসজিদ রং করানোর আগেই কিছু লোক তাঁর পিছু লাগে। তিনি নবীনগর মসজিদ থেকেও ইমামতি ছেড়ে দিয়ে নিয়ে পূর্ণ বিশ্রামের লক্ষ্যে বাড়িতে অবস্থান করতে থাকেন।
কিন্তু কর্মচঞ্চল মানুষ কখনো বেকার হয়ে ঘরে বসে থাকতে পারে না। অবসরটা তাঁর কাছে কষ্টদায়ক ছিল। তখন তাঁর কাছে তাজপুর ইউনিয়নের ভাড়েরা মাদরাসা থেকে মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার প্রস্তাব আসে। তিনি মুহতামিম হিসেবে ঐ মাদরাসায় যোগদান করেন। কিন্তু কিছুদিন যেতেই বুঝতে পারেন আগের সেই শারীরিক সামর্থ আর নেই। বাধ্যক্যজনিত কারণে বাধ্য হয়ে সেখান থেকে বিদায় নিয়ে ভরাক্রান্ত মনে বাড়ি চলে আসেন।
বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষার মহান লক্ষ্যে ১৯৮২ ইংরেজি মোতাবেক ১৪০২ হিজরীতে মাওলানা ক্বারী আলী আকবর সিদ্দিক সাহেবকে নিয়ে গঠন করেন আঞ্জুমানে তা’লীমুল কুরআন বাংলাদেশ। যে বোর্ড বর্তমানে বাংলাদেশে আহলে দেওবন্দের সর্ববৃহৎ বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষাবোর্ড। জানা যায় ১৯৮২ সালে মৌলভীবাজার কমলগঞ্জ থানাধিন ভানুগাছের মরহুম মাওলানা ক্বারী আলী আকবর ছিদ্দিক সাহেব বালাগঞ্জে আসেন। তখন বালাগঞ্জ কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের ইমাম ও ফিরোজাবাগ মাদরাসার মুহতামিম ছিলেন মাওলানা জামীল আহমদ। মাওলানা আলী আকবর ছিদ্দিক মাওলানা জামীল আহমদ সাহেবের কাছে মনের অভিলাষ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের কুরআন মজীদ তেলাওয়াতে প্রচুর ভুল হয়। আমার ইচ্ছা, বিশুদ্ধ কুরআন তেলাওয়াতের জন্য একটি সতন্ত্র প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা। কিন্তু কাউকে আমি ব্যাপারটি বুঝাতে পারছি না। দেশের অনেক স্থানে আমি আমার এই ইচ্ছাটি ব্যক্ত করেছি, কিন্তু কেউ আমাকে স্থান দেয়নি, সহযোগিতা করেনি। আপনি যদি সুযোগ দেন এবং সহযোগিতা করেন, তাহলে আপনার মাদরাসা-মসজিদ থেকে আমি এই কার্যক্রম চালু করতে চাই’।

ক্বারী আলী আকবর সিদ্দিক সাহেবের মহৎ উদ্দেশ্য জেনে মাওলানা জামীল আহমদ বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষার জন্য তাঁকে স্থান দেওয়াসহ সার্বিক সহযোগিতার প্রতিশ্রুতি দেন। শুরু হয় কার্যক্রম। দু’জনের অক্লান্ত পরিশ্রমে এলাকার মুরব্বীয়ানসহ সর্বস্থরের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের সাবির্ক সহযোগিতায় ১৯৮২ সালের ১০ মার্চ, মোতাবেক ১৪০২ হিজরী সালের ৫ জুমাদাল উলা প্রতিষ্ঠা লাভ করে এই বিশুদ্ধ কুরআন শিক্ষার বোর্ড। তিনি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত এই বোর্ডে খাদিম থাকাবস্থায় ইন্তেকাল করেন।
উল্লেখ্য ২০০৪ ইংরেজি সালে তিনি
ইসলামের মহান বিধান ‘হজ্ব’ করেন।

ব্যবসা : শিক্ষকতার পাশাপশি তিনি টুকটাক ব্যবসার সাথে জড়িত ছিলেন। জানা যায় বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি কাপড়ের ব্যবসা করতেন। স্বাধীনতার পর পারকুল থাকাবস্থায় স্থানীয় বাজারে তাঁর একটি টেইলারির দোকান ছিল। তারপর বালাগঞ্জ আসার পর ‘আর এইচ মাইক সার্ভিস’ নামে বালাগঞ্জ বাজারে একটি মাইক ভাড়া দেওয়ার ব্যবসা শুরু করেন। (তাঁর দুই ছেলে রশীদ ও হুসাইন। তাদের নামেই ছিল এই আর এইচ ব্যবসা)। একজন ম্যানেজার ব্যবসাটি পরিচালনা করতেন। তিনি যখন জানতে পারেন তাঁর ম্যানেজার গানের অনুষ্ঠানেও মাইক ভাড়া দেয়, তখন তিনি কড়া করে তাকে নিষেধ করে দেন। বলে দেন, মাইক কেউ না নিলে পড়ে থাকবে, তবুও গানের অনুষ্ঠানের জন্য ভাড়া দেওয়া যাবে না। কিন্তু এভাবে তো আর ব্যবসা হয় না। তিনি মাইকসেট বিক্রি করে এই ব্যবসাই ছেড়ে দেন। তারপর তিনি কিছু দিন টেইলারি ব্যবসাও করেছেন। বালাগঞ্জ বাজারে উনার একটি টেইলারি দোকান ছিল।

অবদান :- প্রচারবিমুখ নিঃস্বার্থ দ্বীনের একজন সেবক ছিলেন মাওলানা মুফতি জামীল আহমদ রাহিমাহুল্লাহ। তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ আলিম, দক্ষ শিক্ষক, নন্দিত বক্তা, অসংখ্য মসজিদ-মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা। তিনি ছিলেন অনৈসলামিক কার্যকলাপের প্রতিবাদে এক সোহসী নেতা, শরয়ী সমস্যার সমাধানে বিচক্ষণ মুফতি, যৌক্তিক মুনাজির। নিজের বাড়ি থেকে আল্লাহ ও রাসুলের বাড়ি তথা মসজিদ ও মাদরাসা নির্মাণের প্রতিই তাঁর ঝোঁক ছিল বেশি। বর্নাঢ্য জীবনে তিনি অসংখ্য মসজিদ মাদরাসা নির্মাণ করলেও নিজের জন্য একটি মানসম্পন্ন বাড়ি পর্যন্ত নির্মাণ করে যাননি। তিনি যে মাদরাসা মসজিদের সাথেই সম্পৃক্ত হয়েছেন, সেটাতেই ইতিবাচক সংস্কার এনেছে। প্রতিষ্ঠা করেছেন ঐতিহ্যবাহী \”জামেয়া ইসলামিয়া ফিরোজাবাগ বালাগঞ্জ\”। তৈরি করেছেন \”বালাগঞ্জ কেন্দ্রী জামে মসজিদ\” ও বালাগঞ্জের বর্তমান থানা সংলগ্ন \”নবীনগর জামে মসজিদ\”। সংস্কার করাছেন হাজিপুর মাদরাসা, পারকুল মাদরাসা।
বালাগঞ্জে ইসলাম বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধেও অগ্রণি ভূমিকা রেখে গেছেন। ইসলাম ও সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ বন্ধে এলাকার ধর্মপ্রাণ মুসলিম জনতাকে নিয়ে গঠন করেছিলেন ইসলাম ও সমাজ বিরোধী কার্যকলাপ প্রতিরোধ কমিটি। প্রতিষ্ঠা থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত তিনি এই কমিটির সেক্রেটারীর দায়িত্ব পালন করে গেছেন তিনি। যে কমিটির মাধ্যমে ২০০১ সালে বালাগঞ্জ ডিএন হাই স্কুল মাঠের বিশাল আয়োজনের গানের প্রোগ্রাম বন্ধসহ অসংখ্য অনৈসলামিক ও অসামাজিক কার্যকলাপ প্রতিরোধ করা হয়েছে। বালাগঞ্জের অনৈসলামিক ও অসামাজিক অঙ্গনের আতংকের বিষয় ছিল এই কমিটি।

মৃত্যু তারিখ :- ২০০৬ সালের ৪ অক্টোবর ১৭ রমজান দিনের বেলা তিনি যথারীতি প্রিয়বোর্ড আঞ্জুমানের প্রতিষ্ঠাকেন্দ্র বালাগঞ্জে শিক্ষাদান করে বাসায় আসেন। রাতে শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের সদস্যরা সেটা নিয়ে খুব একটা বিচলিত হলেন না। কারণ, তিনি দির্ঘদিন থেকে গ্যাস্টিক আলসারে ভুগছিলেন। মাঝেমধ্যেই বমিটমি করতেন। শেষ রাতের দিকে তাঁর কথা বলায় জড়তা চলে আসে। তখন পরিবারের সদস্যরা একটু ভড়কে গেলেন। তাঁকে সাহরি খেতে বারণ করলেন। কারণ, সাহরি খেলে তিনি আর রোজা ছাড়বেন না, ঔষধও খাবেন না। তিনি সাহরি খেতে না-পেয়ে শুধু পানি পান করেই রোজা রাখার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন। সুস্থ হলে এই রোজার কাজা আদায় করবেন এবং পরিবারের সকল সদস্যরা উনার জন্য একটি করে নফল রোজা রাখবেন- এই শর্তে অনেক বলেকয়ে তাঁকে রোজা ভেঙে ঔষধ খেতে রাজি করানো হলো। সকাল ৯টার দিকে জ্ঞান হারালেন তিনি। প্রথমে বালাগঞ্জ উপজেলা সদর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার হলে ডাক্তাররা সিলেট উসমানী মেডিকেল কলেজ এন্ড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন। সিলেট নিয়ে যাওয়ার পর ডাক্তার জানালেন তিনি স্টোক করেছেন। তাঁরা তাঁদের সাধ্যমতো চিকিৎসা এবং চেষ্টা চালালেন। প্রায় ছাব্বিশ ঘণ্টা জ্ঞানশূন্য অবস্থায় হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকলেন নীরবে। ৬অক্টোবর দুপুর ২.৩৯ মিনিটে জ্ঞান ফিরল তাঁর। চোখ খুললেন তিনি। প্রায় ৩০ সেকেন্ড এভাবেই তাকিয়ে থাকলেন। তারপর শব্দ করেই পড়তে লাগলেন, ‘আশহাদু আল্লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ওয়া আশহাদু আন্না মুহাম্মাদান আবদুহু ওয়া রাসুলুহ’ এবং চোখ বন্ধ করলেন। ৬ অক্টোবর ১৯ রমজান বিকাল ২টা ৪০ মিনিটে জীবনের যবনিকা টেনে মাওলায়ে হাকিকীর সান্নিধ্য লাভের লক্ষ্যে ইহকাল ত্যাগ করলেন। ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

তথ্য দানকারীর নাম :- হুসাইন আহমদ মিসবাহ

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- +৮৮০১৭১২১০০০৫৭

Spread the love