সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা মুজ্জাম্মিল আলী : জীবন ও কর্ম

নভেম্বর ১১ ২০১৯, ০৪:২১

পৃথিবীতে কিছু মানুষ মহৎ কর্মগুণের মাধ্যমে মানুষের হৃদয়রাজ্যে জায়গা করে নেন। যাঁদের চারিত্রিক গুণাবলীর আকর্ষণে মানুষ ভীড় করে তাঁদের সান্নিধ্য পেতে।যাঁরা কর্মের দ্যুতিতে আলোকিত করেন চারপাশ।তেমনি একজন নিরব সাধক আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন উস্তাদ মৌলভী মুজ্জাম্মিল আলী দা.বা.।যাঁর সংস্পর্শে আলোকিত হয়েছে অনেক মানুষের জীবন।

কর্মবীর এ ব্যক্তিত্ব নিয়মানুবর্তিতা,পরোপকারিতা, নীতি-আদর্শ ও সততার গুণে চিরভাস্বর।শিক্ষার আলোর মশাল নিয়ে ১৯৫৭ সালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলা থেকে তিনি এসেছিলেন দিরাই উপজেলার দৌলতপুর গ্রামে ।সে সময় থেকে নিয়ে আজোবধি শিক্ষার আলোর স্ফুরণ ঘটিয়ে চলছেন অবিরাম।সমাজ সংস্কারক এ জ্ঞানতাপস শিক্ষার আলোয় আলোকিত করেছেন সমাজকে।পুরো জীবন বিলিয়ে দিচ্ছেন শিক্ষকতার মহান পেশায়।ছাত্র ও একই গ্রামের বাসিন্দা হওয়ার সুবাদে আমি খুব কাছ থেকে দেখছি তাঁর কর্মমুখর দিনগুলোর এখলাছ।আমি দৌলতপুর মাদ্রাসায় লেখাপড়ার সময় মাদ্রাসা ফাঁকি দিলে হুজুর বাড়িতে গিয়ে খুঁজে বের করে মাদ্রাসায় আসতে বাধ্য করতেন।দৌলতপুর গ্রাম সহ পুরো দিরাই উপজেলায় তাঁর এখলাছ বা নিষ্ঠার খ্যাতি রয়েছে।তিনি “ছাতকী হুজুর”মাস্টার সাব” ও “মৌলভী সাব” হিসাবে এলাকায় সমধিক পরিচিত।শিক্ষা ও দ্বীনি প্রয়োজনে দৌলতপুর গ্রামের মানুষের অকৃত্রিম ভালবাসা ও শ্রদ্ধার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ১৯৫৭ সাল থেকেই তিনি দৌলতপুর গ্রামে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।এখানে সংক্ষিপ্ত আকারে হুজুরের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোকপাত করছি।

জন্ম: তিনি ১৯২১ সালে তৎকালীন আসাম প্রদেশের বর্তমান সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার দক্ষিন খুরমা ইউনিয়নের কেজাউড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন।তাঁর খোদাভীরু পিতার নাম পীর আব্দুল মতিন রহ.।মুহতারামা মাতার নাম মরহুমা হাবিবুন নেছা।

শিক্ষা জীবন: তাঁর শিক্ষা জীবনের হাতেখড়ি ঘরোয়া পরিবেশে চাচা মাওলানা আব্দুল মান্নানের কাছে। তিনি ধর্মীয় শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ তথা আরবী বর্ণমালা ও শব্দ পরিচয়ের বই কায়দা, আমপারা ও কুরআন তেলাওয়াত শিক্ষা করেন চাচা মাওলানা আব্দুল মান্নানের কাছেই।এরপর তিনি প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য ভর্তি হন ছাতক উপজেলার মনিরগাতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।সেখান থেকে ১৯৪২ ঈসায়ি সনে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়া সমাপ্ত করেন।১৯৪৬ ঈসায়ি সনে ছাতক শহরের ছাতক মিডল ইংলিশ মাদ্রাসায় (এম.আই মাদ্রাসা) মাধ্যমিক স্তরের পড়াশুনা সমাপ্ত হয়।১৯৪৭ সালে গোলাপগঞ্জ ফুলবাড়ী আজিরিয়া আলিয়া মাদ্রাসায় আলিয়া ১ম বর্ষে ভর্তি হন।ফুলবাড়ী মাদ্রাসা থেকেই ১৯৫০ সালে আলিয়া চতুর্থ বর্ষ সমাপ্ত করেন।পরবর্তীতে গোলাপগঞ্জের রাখালগঞ্জ দারুল কুরআন মাদ্রাসায় ১৯৫১ সালে ইলমে ক্বেরাত ও তাজবিদ বিভাগে বছরব্যাপী কোর্স অধ্যয়ন করে শিক্ষা জীবন সমাপ্তি করেন।

কর্মজীবন: ১৯৫২ সালে দিরাই উপজেলার শরীফপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের মাধ্যমে বর্ণাঢ্য কর্মজীবনের সূচনা হয়।শরীফপুর স্কুলে এক বছর শিক্ষকতার পর দিরাইয়ের ভাটিপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ বদল হয়।১৯৫৩ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত ভাটিপাড়া স্কুলে শিক্ষকতা করেন।সেখান থেকে নিয়োগ বদল হয়ে ১৯৫৭ সালে দিরাই উপজেলার দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আসেন।১৯৯১ সালের ২৮ মার্চ দৌলতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা থেকে অবসরপ্রাপ্ত হন।১৯৬৩ সালে দৌলতপুর গ্রামের মুরব্বিয়ানে কেরামের অনুপ্রেরণা ও সার্বিক সহযোগিতায় দৌলতপুরে ছাবাহী মক্তব প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৯৫ সালে ছাবাহী মক্তবকে ‘দৌলতপুর নোয়াপাড়া দারুল উলূম মাদ্রাসায় ‘রুপান্তরিত করেন।বর্তমানে মক্তব ও মাদ্রাসা উভয় শাখায় দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম চলছে।প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এখন পর্যন্ত ছাবাহী মক্তব ও মাদ্রাসার মুহতামিমের দায়িত্ব সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে দক্ষতার সাথে আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।শিক্ষক হিসাবে তিনি সৎ,যোগ্য ও আদর্শবান শিক্ষক।ছাত্রদের কাছে তিনি আকাশছোঁয়া জনপ্রিয় শিক্ষক। তাঁর স্কুল জীবন ও ছাবাহী মক্তব-মাদ্রাসার জীবনের অসংখ্য ছাত্ররা তাঁকে মানুষ গড়ার কারিগর হিসাবেই মূল্যায়িত করেন।১৯৫৭ সালে দৌলতপুর আসার পর দীর্ঘকাল ব্যাপী দৌলতপুর মসজিদের ইমাম ও খতিবের দায়িত্ব পালন করেন।বার্ধক্যজনিত কারণে কয়েক বছর পূর্বে খতিব পদ থেকে অব্যাহতি নেন।বহুকাল থেকে অধ্যাবদি দৌলতপুর মসজিদের মুতাওয়াল্লি হিসাবে সততা ওনিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।যুগযুগ ধরে তিনি দৌলতপুরসহ এ অঞ্চলে ইলমে দ্বীন ও জাগতিক শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছেন।সততা ও আদর্শের প্রশ্নে তিনি আপোষহীন ব্যক্তিত্ব।আমানতদারিতায় তিনি একজন প্রবাদপুরুষ।দৌলতপুর ও আশপাশ এলাকার মানুষের বিশ্বস্ত ও ভরসার এ ব্যাক্তিত্বের কাছে লোকেরা তাদের মূল্যবান সম্পদ গচ্ছিত রাখতেন এবং রাখছেন।তিনি সুন্নতে নববীর পদাঙ্কঅনুসারী ও হক্কানী বুযুর্গ আলেম।তাঁর আচার-ব্যবহারে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারে না। বর্তমানেও জীবনের পড়ন্ত বিকেলে তিনি মাদ্রাসায় যাওয়া-আসা, অধ্যাপনা ও দৌলতপুর মাদ্রাসার মুহতামিমের দায়িত্ব দক্ষতার সাথে চালিয়ে যাচ্ছেন।এই বয়োবৃদ্ধ সময়ে ও যেন মনে হয় শিক্ষার জন্য তাঁর পুরো জীবনটাই উৎসর্গিত করে রেখেছেন।

আধ্যাত্মিক সম্পর্ক:তিনি শায়খ মাওলানা হাবিবুর রহমান রহ.রায়পরী’র হাতে বায়আত গ্রহন করেন।পরবর্তীতে রায়পুরীর পরামর্শক্রমে মাওলানা আব্দুল হক রহ.শায়খে গাজীনগরীর সাথে ও আধ্যাত্মিক তাআল্লুক ছিলো।

বরেণ্য উলামাদের দর্শন ও সাক্ষাত লাভ:
তিনি আরবী সাহিত্যের দিকপাল মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহ.,মাওলানা ইদ্রিস কান্দলভী’র রহ. এর দর্শন লাভ করেন ও মাওলানা আতহার আলী’র রহ.সাথে ও সাক্ষাত হয়।একদা রাজধানী ঢাকায় এক শিক্ষা সফরে মাওলানা সামছুল হক ফরিদপুরী রহ.ও মাওলানা মুহাম্মদুল্লাহ হাফেজ্জী হুজুরের রহ.সাথে তাঁদের খানকায় সাক্ষাত লাভ করেন ও তাঁদের সুহবতে ধন্য হন।ঢাকার লালবাগ শাহী মসজিদে হাফেজ্জী হুজুরের দরসে বুখারীতে বসার ও সুযোগ হয়।
দুনিয়ার ধন-সম্পদের প্রতি নির্মোহ ও নির্লোভএ ব্যক্তিত্ব একদম সাদা-মাটা জীবনযাপন করছেন।প্রচারবিমুখ নিভৃতচারী বুযুর্গ আমাদের চেতনার বাতিঘর শতবর্ষী আলেম ছাতকী হুজুরের দীর্ঘ জীবন কামনা করি।

তথ্য দাতা: মুহাম্মদ মাহবুবুল হক
Spread the love