সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী’র সংক্ষিপ্ত জীবন ও কর্ম

December 27 2020, 03:45

Manual3 Ad Code

মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দি ১৫ নভেম্বর ১৯৬৮ ইং মোতাবেক ১লা অগ্রহায়ন ১৩৭৫ বাংলা রোজ শুক্রবার নীলফামারী জেলার ডোমার থানার অন্তর্গত সোনারায় গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

পিতার নাম আলহাজ্ব মোঃ রশিদুল হাসান। (প্রাক্তন চেয়ারম্যান সোনারায় ইউনিয়ন) তিনি এক অনন্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন। তাঁর সততা ও ধর্মভীরুতার জন্য তিনি সর্বত্রই খ্যাত।

Manual6 Ad Code

মাতা মোছাঃ সাহিদা বেগম। দাদার নাম হযরত মাওলানা এহসানুল হক আফেন্দী রহ.। জন্মের পর নাম রাখা হয় মঞ্জুরুল ইসলাম। তার পরদাদা মরহুম হাজী রাজাতুল্লাহ (রহ.) ছিলেন একজন বিশিষ্ট উচূঁ স্তরের পীর ও বুযুর্গ ব্যক্তি।

কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম করে বেলায়েত হাসিল করেছিলেন। বৃহত্তর উত্তরবঙ্গে তাঁর প্রচুর মুরিদ ও ভক্তবৃন্দ রয়েছে। এখনও দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তাঁর মাকবারার জিয়ারতে আসেন। তাঁরই যোগ্যতম উত্তরসূরী ছিলেন হযরত মাওলানা এহসানুল হক আফেন্দী রহ., তার দাদা। বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে জমিয়তের প্লাটফর্ম থেকে গোটা উত্তরবঙ্গে নেতৃত্ব দেন তিনি। তাঁর জ্বালাময়ী বক্তৃতায় তখন উত্তরবঙ্গের মানুষ বৃটিশ খেদাও আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে বৃটিশ সরকার তাঁকে জেলখানায় বন্দি করে তার লেখা “বর্তমান রাজনৈতিক সংকট ও আমাদের করণীয়” নামক পুস্তিকাটিও বৃটিশ সরকার বাজেয়াপ্ত করে দেয়। অবশেষে টানা আড়াই বছর কারাবরণ করে জেল থেকে মুক্তি পেলেও মুক্তির অল্প দিনের মাথায় কারা বন্দী অবস্থায় কারা নির্যাতনের প্রভাবে মৃত্যু বরণ করেন। এর দুঃসংবাদ তাঁর মুর্শিদ আওলাদে রাসূল হযরত হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. এর নিকট পৌঁছলে, শুনা মাত্রই তিনি এই ভক্ত পাগলের শোক সন্তুপ্ত পরিবারকে এক নজর দেখা ও শান্তনা দেয়ার জন্য সুদূর সাহারানপুর থেকে নীলফামারীতে ছুটে আসেন।

Manual3 Ad Code

পরবর্তীতে প্রতি বৎসরেই হযরত মাদানী রহ. স্বপরিবারে সোনারায় গ্রামে এই ভক্তের বাড়িতে আসতেন। এই বাড়ীটিই ছিল তাঁর খানকা। (সোনারায় ও আফেন্দী সাহেব রহ. এর বাড়ী) যে খানকা থেকে তিনি মুরিদদেরকে ইলমে মারিফাত ও তা’লীম তরবিয়ত শিক্ষা দিতেন। যা আজও কালের স্বাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সেই খানকায় এখনও টেবিল, চেয়ার, আলনা ও একটি পুরাতন খাট বিদ্যমান, যা হযরত নিজে ব্যবহার করতেন। এমনকি তাঁর ব্যবহৃত পায়ের জুতা ও হাতের লাঠি আজও সেই বাড়ীতে সংরক্ষিত।

পিতা রশিদুল হাসান ছিলেন একজন সম্ভ্রান্ত, ধার্মিক ও সম্পদশালী ব্যক্তি। তিন বছর সোনারায় ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন। শিশু মঞ্জুরুল ইসলাম আক্ষরিক জ্ঞান-অর্জনের উপযুক্ত হলে তাঁর পিতা প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের জন্য স্কুলে না পাঠিয়ে হাফেজ ছফিউল্লাহ সাহেবের হাতে তুলে দিলেন। তখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। হাফেজ ছফিউল্লাহ সাহেব ছিলেন ওলামা বাজার মাদরাসার কাতিব সাহেব হুজুরের ছেলে। পরবর্তীতে তিনি হয়ে যান ভারতের মুর্শিদাবাদের অধিবাসী। তিনি হাজি রাজাতুল্লাহ সাহেবের সূত্র ধরেই রাজাতুল্লাহ পরিবারের মসজিদের ইমাম ও খতিব ছিলেন।

হাফেজ ছফি উল্লাহ সাহেব তাকে কায়দা, আমপারা না পড়িয়ে সরাসরি সূরা ফাতেহা থেকে মুখস্থ করাতে লাগলেন। মাত্র ২ বছরেই সম্পূর্ণ কোরআন শরীফ হেফজ করে ফেলেন, তখন তার বয়স মাত্র আট বছর। রমজান মাসে সবাই খতম তারাবীর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে- কিন্তু হাফেজ মঞ্জুরকে বয়স জনিত কারণে তারাবাহীর নামাজের ইমাম বানানো যাচ্ছিল না তখন এ অবস্থা দেখে তাঁর পিতা তাঁর সন্তানের জন্য এক অভিনব পন্থা বেছে নিলেন। প্রতিদিন সকাল ১০টায় তাকে নামাজে দাঁড় করিয়ে বেত হাতে নিয়ে চেয়ারে বসে কোরআন শরীফ খুলে পড়া ধরতেন, কোথাও কোন ভুল হলে নামাজের মধ্যেই বেত্রাঘাত করতেন। এ নিয়মে প্রতি দিন সন্তানের কাছে থেকে বিশ রাকাতের তিলাওয়াত তিনি রুটিন মাফিক আদায় করে নিতেন।

পরবর্তীতে ১৯৮০ ইং সনে তাকে দেশের সু-পরিচিত প্রসিদ্ধ ফেনীর ওলামা বাজার মাদরাসায় ভর্তি করে দেন। নীলফামারী থেকে ওলামা বাজারের দূরত্ব প্রায় ছয়শত কিলোমিটার। তখন গাড়ী ঘোড়া ও রাস্তাঘাট তেমন ভালো ছিলনা। ওলামা বাজার পৌঁছতে প্রায় দু’দিন সময় লেগে যেত। পিতা-মাতার স্নেহ মায়া-মমতা যেন সন্তানের পড়া-শুনায় বিঘ্ন সৃষ্টি করতে না পারে সেজন্য দূরে ভর্তি করে দিয়েছিলেন। আরো বড় কারণ হলো অলিয়ে কামেল হযরত মাওলানা আব্দুল হালীম সাহেব রহ. তাকে নিজের কাছে রেখে আলেম বানাতে চেয়েছিলেন এবং তিনি তা কাফিয়া জামাত পর্যন্ত পড়িয়েছেনও।

তিনি মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে যথারীতি পড়া-শুনায় আত্মনিয়োগ করেন এবং প্রতি পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখেন এবং ১ম স্থান অধিকারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখেন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ৬ বছর পড়া-শুরা করেন। অতঃপর ১৯৮৮ ইং হযরত মাওলানা আব্দুল হালীম রহ. এর সম্মতিক্রমে মুজাহিদে মিল্লাত আল্লামা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. এর তত্ত্বাবধানে মিরপুর জামেয়া হোসাইনিয়া আরাজাবাদ মাদরাসায় শরহেজামী জামাতে ভর্তি হয়ে যান। তিনি জামেয়া হোসাইনিয়া আরজাবাদ মাদরাসায় শরহে জামি জামাত থেকে জামাতে মেশকাত পর্যন্ত খুবই সুনামের সাথে পড়া-শুনা করে ১৯৯৩ইং সনে উচ্চ শিক্ষা এলমে ওহীর ফুয়ুজ ও বারাকাত হাসীলের উদ্দ্যেশে দেওবন্দ যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন যেহেতু মাদানী পরিবারে সঙ্গে ঘনিষ্ট সম্পর্ক থাকায় দাদী রাবেয়া বেগমের একখানা নাতীদীর্ঘ চিঠি নিয়ে দেওবন্দে চলে যান।

Manual8 Ad Code

ফিদায়ে মিল্লাত হযরত আসআদ মাদানী রহ. কে লেখা রাবেয়া বেগমের এ চিঠি নিয়ে মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম তাঁর কাছে গেলে তিনি পরম স্নেহে আফেন্দী দৌহিত্রকে দেওবন্দে দাওরায়ে (মাস্টার্স) সম্পন্ন করার ব্যবস্থা করে দেন। দেওবন্দে পড়া-শুনা শেষ করে তিনি দেশে ফিরে আসলে অল্প কিছুদিন পরেই সৌদি আরবে চলে যান। সেখানেই তার কর্ম জীবনের যাত্রা শুরু। সেখানে তিনি ধর্মমন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত রিয়াদস্থ দাওয়াত ও ইরশাদ সংস্থায় লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন।

দীর্ঘ চার বছর স্বপরিবারে বসবাস করে সুনাম ও দক্ষতার সাথে অর্পিত দায়িত্ব পালন করত ১৯৯৯ইং সনে ছুটিতে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন। অতঃপর তাঁর উস্তাদ হযরত মাওলানা ইমরান মাজাহরী সাহেব দা. বা. সৌদি আরব যেতে না দিয়ে ইলমে দ্বীনের খেদমতের জন্য তাকে ইসলামবাগ মাদরাসায় নিযুক্ত করেন। এখানে উল্লেখ্য থাকে যে ১৯৮০ এর দশকে ইসলামবাগ মাদরাসাটি প্রতিষ্ঠিত হলেও কখনো আলোর মুখ দেখে নি। বহু উত্থান পতন ও ভাঙ্গা-গড়ার মধ্য দিয়ে চলে আসছিল।

২০০১ ইং সনের জুন মাসে হযরত মাওলানা ইমরান মাজহারী সাহেব যখন তাঁর হাতে মাদরাসার দায়িত্ব দিয়ে চলে যান, তখন মাদরাসার অবস্থা ছিল অত্যন্ত করুন। পরিপূর্ণ দায়িত্ব পেয়ে দক্ষ নাবিকের ন্যায় শক্ত হাতে মাদরাসার হাল ধরে দীর্ঘ বিশ বছর তিনি শ্রম ও সাধনা দিয়ে তিলে তিলে মাদরাসাটিকে বর্তমান পর্যায়ে পৌঁছে দেন। এই জামেয়া দরস, তাদরিস, পরীক্ষার ফলাফল ও ছাত্রদের আমল-আখলাক খুবই প্রসংশনীয়। ২০০৪ সালে দাওরায়ে হাদীস তাকমীল ক্লাসটি চালু হলে দীর্ঘ ১৪ বছর যাবত শাইখুল হাদীসের পদটিও তিনি অলংকৃত করে আসছেন। যদ্দরুন আজ তিনি সর্বত্রই শায়খূল হাদীস হিসেবে পরিচিত।

তিনি জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মুহতারাম মহাসচিব মাওলানা নূর হোসাইন কাসেমীর ইন্তেকালের পর এ দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব প্রাপ্ত হোন। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের সহকারী মহাসচিবের দায়িত্বও পালন করছে।

জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ মাদ্রাসার মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস, ইসলামবাগ বড় মসজিদের খতিব এর দায়িত্ব পালনের সাথে সাথে তিনি জাতীয় ইমাম সমাজের সিনিয়র সহ-সভাপতি এবং জামেয়া ইসলামিয়া রিয়াজিয়া মাদ্রাসার পৃষ্ঠপোষকতার দায়িত্বও পালন করছেন।

তথ্যদাতা: হোসাইন আহমদ শিবলী

Manual7 Ad Code

Spread the love