সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা তালেব উদ্দিন দা.বা. এর জীবন ও কর্ম

নভেম্বর ০৩ ২০১৯, ১০:৩৩

নাম: তালেব উদ্দিন
জন্ম: মৌলভীবাজার জেলার কমলগন্জ থানাধীন পতনউষার ইউনিয়নের শ্রীসুর্য মৌজার কবিরাজী গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ৪ ডিসেম্বর ১৯৭৮ ইংরেজী সনে জনাব আরপান আলী ও হালিমা বেগম দম্পত্তির ঘরে তিনি জন্মগ্রহন করেন।তাঁর পিতা-মাতা ও পিতামহ সকলেই ছিলেন দ্বীনদার, পরহেজগার, দানবীর, চরিত্রবান ও মহৎপ্রাণ ব্যক্তিবর্গ। তার ছোট ভাই শায়খুল হাদীস মাও.মুশাহিদ ক্বাসেমী দা.বা.।
 
শিক্ষা জীবনঃ সম্ভ্রান্ত শিক্ষিত পরিবারে জন্মগ্রহনের সুবাধে অতি অল্প বয়সেই তাঁর মধ্যে শিক্ষার প্রতি অনুরাগ পরিলক্ষিত হয়।তাঁর সম্মানিতা মাতা একজন আবিদা, সালিহা মহিলা এবং তাঁর সম্মানিত পিতাও মাসলাকে দেওবন্দী, ধার্মিক ও পরেহযগার। সে কারণে মাতা-পিতার তত্ত্বাবধানে মহল্লার সবাহী মক্তবে শিক্ষা জীবনের সূচনা হয়।
জন্মগতভাবেই তিনি প্রখর মেধার অধিকারী। শৈশবেই তাঁর মেধার বিভা ফুঁটে উঠে।এজন্যই অল্প দিনেই তিনি ইসলামের বুনিয়াদী শিক্ষা তথা কালেমা, নামায, জরুরী মাসাইল ও মাসনূন দোয়াসহ পবিত্র কুরআন মাজিদের তেলাওয়াত শিক্ষা লাভ করেন।
শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত শান্ত,সভ্য ও ভদ্র ছিলেন।খুববেশী লাজুক প্রকৃতির ছিলেন।ছোট বেলা থেকেই তিনি সহজ সরল প্রকৃতির এবং উত্তম চরিত্র মাধুর্যের অধিকারী ছিলেন। অতঃপর প্রাচীনতম ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী শিক্ষাগার জামেয়া হুসাইনিয়া কটারকোনা মাদ্রাসায় ভর্তি হয়ে ইবতেদায়ী থেকে সরফ পর্যন্ত লেখা -পড়া করে আরবী,ফার্সী,উর্দূ,বাংলা ভাষা সম্পর্কে যোগ্যতা অর্জন করেন।
অতঃপর ১৯৯৪ইংরেজীতে উচ্চ শিক্ষা লাভের জন্য চলে যান সিলেটের স্বনামধন্য বিদ্যানিকেতন জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা মাদ্রাসায় -সেখানে নাহবেমির থেকে কওমী শিক্ষার সর্বোচ্চ ক্লাস দাওরা তথা মাস্টার্স পর্যন্ত লেখাপড়া করে যুগ শ্রেষ্ঠ মনীষীদের তত্ত্বাবধানে হাদীস, ফেকাহ,তাফসীর, আকায়েদ,উসূল, ফরাইজ ইত্যাদি বিষয়ে অগাধ জ্ঞানার্জন করেন। শিক্ষা জীবনের সকল পরিক্ষায় প্রতিটি কিতাবে সর্বোচ্চ নাম্বার পেয়ে প্রতি জামাতে ১ম স্থান অর্জন করা ছিল তাঁর বৈশিষ্ট। ঠিক তেমনিভাবে বোর্ড পরিক্ষায় মেধা তালিকায় মুখতাসার জামাতে ৩য়, ফযিলত তথা মিশকাত জামাতে মেধা তালিকায় ১ম, দাওরা তথা মাস্টার্স পরিক্ষায় মেধা তালিকায় ২য় হয়ে উস্তাদগণ ও মা -বাবার মুখ উজ্জল করে শিক্ষা জীবনের ইতি টানেন।
 
শিক্ষকতা জীবন ও দারস ও তাদরিসঃ মৌলভীবাজার জেলার ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী দরসগাহ জামেয়া হুসাইনিয়া সোনারগাঁও, বলরামপুর কমলগন্জ মাদ্রাসায় ২০০১ সালে কর্ম জীবনের জয়যাত্রা সূচনা করেন । এখানে তিনি সিহাহ সিত্তার মুসলিম শরীফ, আবু দাউদ শরীফ, এবং দারসে নেজামির অন্যান্য কিতাবাদি খুব দক্ষতার সাথে তিন বৎসর পড়ান। অতঃপর সেখান থেকে চলে আসেন সিলেটের বিয়ানিবাজারস্থ মুরাদগঞ্জ মাদ্রাসায় -এখানেও অত্যান্ত দক্ষতার সাথে সিহাহ সিত্তার মুসলিম শরিফ সহ দরসে নেজামির অন্যান্য কিতাবাদি ৭ বৎসর পড়ান। অতঃপর আসাতেযায়ে কেরামের নির্দেশে তিনি চলে আসেন মাদারে ইলমী জামেয়া তাওয়াক্কুলিয়া রেঙ্গা মাদ্রাসায়। আট বৎসর থেকে এখানে পড়াচ্ছেন। মধ্যখানে একবছর দারুল কুরআন সিলেটের শায়খে বুখারী ছিলেন। (১৩.১৪.ও১৫ নং পারা খুব দক্ষতার সহিত পড়ান।)মোট উনিশ বৎসর ধরে তিনি দারস ও তাদরিসের খেদমতে করে যাচ্ছেন।
তিনি একজন আদর্শ শিক্ষক। তিনি আদর্শ ছাত্র গড়ার স্বপ্নে বিভোর ও আত্মনিবেদিত একজন সফল উস্তাদ।
ছাত্রদের যোগ্য করে গড়ে তোলার ব্যাপারে সদা নিবেদিতপ্রাণ। কোন মেধাবী ছাত্র পেলে তার মেধা কিভাবে কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে তিনি সর্বদা থাকেন চিন্তিত। তাঁর চব্বিশ ঘণ্টার সাধনা থাকে তাঁর ছাত্ররা যেন লেখাপড়ায় ও জ্ঞানে-গুণে বড় হয়, সমাজে সগৌরবে চলতে পারে, সর্বোপরি যুগের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম হয়।
তাঁর পাঠদান খুবই মনোমুগ্ধকর। উপস্থাপনাশৈলী খুবই চমৎকার। তত্ত্ব ও তথ্য নির্ভর তার প্রতিটা আলোচনা।নিজের চিন্তা -চেতনা, আবেগ অনুভূতির সাথে মিশে যেতে ছাত্রদের বাধ্য করতেন -তাঁর অদ্ভুত বিস্ময়কর যোগ্যতার ক্ষমতাবলে। যে কিতাবই তিনি পড়ান -তা পড়াতে গিয়ে ছাত্রদের মন -মানসের গভীরে মিশে যেতেন একেবারে রক্ত -মাংসের ন্যায়।কিতাবের প্রতিটি বর্ণ, ছত্র সর্বোপরি তার মর্মের গভীরে চলে যান তিনি।ফলে কিতাবের বিষয়বস্তু ও মর্ম এবং কিতাব লেখার লক্ষ-উদ্দেশ্য -সবই ছাত্রদের সামনে পরিষ্কার হয়ে যায়। পাঠদানের ফাঁকে ফাঁকে আলোচ্য বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন শিক্ষনীয় রসগল্প উপস্থাপন করে নাইমীন হযরাতদের তন্দ্রাচ্ছন্নভাব দূর করার চেষ্টা করেন।
তাঁর মধ্যে আমি সত্য সুন্দরের পরম প্রকাশকে খুঁজে পেয়েছি। স্নেহ-সহানুভূতিতে তিনি আমাদের হৃদয়ের অত্যন্ত সন্নিকটে, কিন্তু তাঁর বিরাট ব্যক্তিত্ব আমাদের বুদ্ধি এবং নাগালের বাইরে। তিনি আমাদের আদর্শ উস্তাদে মুহতারাম ও রাহবার। তিনি আমাদের শিক্ষাজীবনের অপরিসীম প্রেরণার উৎস।
তাঁর দীক্ষার গন্ডী বিস্তৃত ঘরের চার দেয়াল থেকে শুরু করে মাদরাসা, পাঠশালা, রচনা ও সংকলনের প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত।মসজিদের নিরিবিলি শান্ত পরিমন্ডল থেকে সংগ্রামের কোলাহলপূর্ণ প্লাটফর্ম পর্যন্ত।
 
ইমাম ও খতীবঃ তিনি ফেনঞ্চুগঞ্জ থানাধীন ২ নং মাইজগাও ইউনিয়নের ফেরিঘাট সংলগ্ন ঐতিহ্যবাহী নুরপুর উত্তরটিল্লা জামে মসজিদে ২৮/৬/২০১৩ থেকে সম্মানিত খতিবের দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন সফলভাবে। এবং মসজিদ সংলগ্ন ঈদগার নামাজও পড়ানোর দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন মানুষের ভালবাসায় সিক্ত হয়ে। ইতিপুর্বে বিয়ানীবাজার পেট্রবাংলা রোডে অবস্থিত শাহপরান জামে মসজিদের খতিব ছিলেন এবং কুলাউড়া থানার টিলাগাও ইউনিয়নের মিয়ারপাড়া ঈদগাহে ঈদের নামাজের ইমামতির দায়িত্ব আঞ্জাম দিতেন।
 
পারিবারিক জীবনঃ জীবিত সাত ভাইয়ের মধ্যে তিনি চতুর্থ। তাঁর দুইজন সম্মানিতা বোনও রয়েছেন।পরিবারের সদস্য ও শিশুদের প্রতি তাঁর স্নেহ-মমতা সীমাহীন।তাঁর কাছে পরিবারের সব সদস্যই অতি আদরের।স্নেহ, মমতা আর ভালোবাসার চাদরে পরিবারের সদস্যদের সর্বদা আচ্ছাদিত করে রাখেন।বিশেষত শিশুদের প্রতি তাঁর আন্তরিকতা চোখে পড়ার মতো।আপন চাচা,ফুফু, খালা ও ভাই বিরাদরগনের খবরা খবর নেন। নিজ বোনদের খোজ -খবর, আনা নেয়া,তাদের বাড়ীতে যাওয়া -আসার নির্ধারিত রুটিন ও রয়েছে তাঁর। হযরতের চারজন কন্যা রয়েছেন। বর্তমানে সকলেই লেখা -পড়া করছে।
 
রাজনৈতিক অবস্থানঃ রাজনীতির ময়দানে তিনি ভীষণ দূরদর্শী। কুশলী। দিক-নির্দেশক। জমিয়তের রাজনীতি করেন কিন্তু নিজেকে কখনো নিদৃষ্ট দলের গণ্ডিতে-ই কেবল সীমাবদ্ধ করে রাখেন না। তার চিন্তাজুড়ে জাতীয় ঐক্য ও নিখাদ দেশপ্রেমের বৃহত্তর চিন্তা।সর্বোপরি তার রাজৈনতিক চিন্তাধারা ও দর্শন যুগোপযোগী উম্মাহর কল্যানকামি, শান্তি, সমৃদ্ধি,মানবিক বোধ, মানসিক ওআত্মিক উন্নায়নে সমৃদ্ধিশীল। নির্মোহ ও নিসংকোচ উদার রাজনৈতিক চর্চার পুরোধা ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মনীষা। রাজনৈতিক কোন সংকীর্ণ চাদরে বাঁধা নয় তার চেতনার শেকড়। সবাইকে নিয়ে,সবার সাথে মিলে দেশ, জাতি ও ইসলামের জন্য তিনি কাজ করে যাচ্ছেন।
তিনি অন্যান্য জনীতিবীদদের মত গতানুগতিক নিজ স্বার্থ হাসিলের জন্য রাজনীতি করেননা- বরং তাঁর রাজনীতি ইসলামি তাহজিব তামাদ্দুন ও দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ত রক্ষার পাশাপাশি দেশের জনগণকে ইসলামি চেতনায় উদ্ধুদ্ধ করে আদর্শ রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করা।
 
তিনি বর্তমানে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ মৌলভীবাজার জেলা শাখার দায়িত্বে নিয়োজিত রয়েছেন।
 
সামাজিক কর্মকান্ডঃ জনদরদী নেতা তিনি। অসহায় মানুষের জন্য নিবেদিত প্রাণ তিনি। আমাদের দেশের বিভিন্ন দুর্যোগের সময় তাঁকে দেখা যায় প্রথম সারিতে। মানব সেবায় নিজের সবটুকু ব্যয় করে দেন তিনি।
ফেরক্বায়ে বাতেলা ও এনজিও মিশনারির আগ্রাসী অপশক্তির মোকাবেলায় আলেম সমাজ ও আম জনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এবং অসহায়, অনাথ -ইয়াতিম, বিধবা ও দূর্গত মানুষের সেবার জন্য তিনি গঠন করেন
“উলামা পরিষদ শরিষতলা”জনসাধারণ্যে ঐক্য ও একতার সুদৃঢ় বন্ধন স্থাপন করা এবংতাদেরকে ইসলামের সামগ্রিক অবকাঠামো ও মূলনীতীর দিকে আহবান করাটাই এই সংঘঠনের মূল লক্ষ্য।তাদেরকে ইসলামের আদব -আখলাক ও উন্নত চরিত্র -মাধুরি এবং বিশেষ তারবিয়াতি প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করে তোলা।
 
বায়আত গ্রহনঃ ইলমে যাহিরের তারাক্কীর জন্য তাঁর উপর ছায়া হিসেবে কাজ করেছেন শায়খুল হাদীস আল্লামা শিহাবুদ্দীন রাহ.।তাঁর স্বর্গীয় আশ্রয় পেয়ে আজ তিনি স্বনামধন্য মুহাদ্দিস।অপরদিকে ইলমে বাতিন বা আত্মশুদ্ধির জন্য তিনি বেছে নেন খলিফায়ে মাদানী শায়খ আবদুল হক গাজীনগরী রহ.কে। তাঁর মৃত্যুর পর বায়আত গ্রহন করেন খলিফায়ে মাদানী শায়খ আবদুল মুমিন ইমামাবাড়ীর হাতে।তাঁর আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পেয়ে নিজেকে এক উজ্জ্বল নক্ষত্ররূপে নিজেকে আবির্ভূত করেন।
আল্লাহপাক হুজুরকে দুনিয়া ও আখিরাতের সকল প্রকার সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ করে দিন।
তথ্যদাতা: মুহাম্মদ আব্দুল্লাহ, (হুজুরের ছাত্র)
Spread the love