সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা আলাউদ্দীন চৌধুরী রহ. এর সংক্ষিপ্ত জীবন

June 19 2019, 05:16

Manual2 Ad Code

নাম :- মাওলানা আলাউদ্দীন চৌধুরী রহ.

জন্ম / জন্মস্থান :- সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মুরাদপুর গ্রামে তাঁর জন্ম। ভাটি অঞ্চলের জমিদার কলিম চৌধুরীর বংশধর তিনি। জনাব অাজহার অালী ও ফাতেহা বেগমের ঔরশে তিনি ১৯৪২ ইংরেজিতে জন্ম গ্রহণ করেন।

শৈশব কাল :- জন্মঃ মাওলানা আলা উদ্দীন চৌধুরী জন্ম গ্রহন করেন বাংলার আধ্যাত্মিক রাজধানী সিলেটের সুনামগঞ্জ জেলায়। দক্ষিন সুনামগঞ্জের শিমুলবাক ইউনিয়নের মুরাদপুর গ্রামের সম্ভ্রান্ত জমিধার পরিবার জনাব আজহার আলী চৌধুরীর ঔরসে জন্ম গ্রহণ করেন তিনি। মাথার নাম মোছাৎ ফাতেহা বেগম। তার প্রপিতামহ ছিলেন ভাটি বংলার তৎকালিন বিশিষ্ট জমিধার জনাব কলিম চৌধুরী।

Manual5 Ad Code

শিক্ষা জীবন :- শিক্ষা জীবনঃ মাওলানা আলা উদ্দীন চৌধুরীর শিক্ষা জীবনের শুরু তার মাতা বেগম ফাতেহার কাছে। অতঃপর পার্শবর্তী সন্তুষপুর গ্রামে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ৫ম শ্রেনী পর্যন্ত লেখাপড়া করেন। তাঁর ছিল প্রখর মেধা ও স্মৃতিশক্তি। ফাষ্টবয় হিসাবে শিক্ষক ও পিতা মাতার মন জয় করেন শিশুকালে। ছোঠ বেলা থেকেই তিনি ছিলেন নম্র ভদ্র ও সৎচরিত্রবান। ধর্মপরায়নতা লক্ষ করে পিতা তাকে ইসলামী শিক্ষা দেওয়ার ইচ্ছা পোষন করেন। কিন্তু কালের নিষ্ঠুর নিয়তি এসময় তাঁর জীবনে ঘটে যায় এক নির্মম ট্রাজেডি। হঠাৎ করে ঘুমন্তাবস্থায় পিতা-মাতা উভয়ে ইন্তেকাল করেন। এমন পরিস্থিতিতে তিনি একেবারে ভেঙ্গে পরেন। এতীম শিশু হিসেবে চোখে মুখে অন্ধকার দেখতে পান তিনি। অবশেষে নিজে সাহস নিয়ে পিতার উত্তরাধীকারী সম্পত্তি বিক্রি করে পড়া লেখা চালিয়ে যাবার উদ্যোগ নেন। এসময় অনেকেই তাকে সহযোগিতা করেন। ভর্তি হন তৎকালিন ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামেয়া ইমদাদুল উলুম শাখাইতি মাদ্রাসায়। সাফল্যের সাথে সাফেলা বা মাধ্যমিক বিভাগ ও আলিয়া বা উচ্চ মাধ্যমিক ক্লাস সমুহ সমাপ্ত করেন। প্রতি ক্লাসে নাম্বার ওয়ান হিসেবে উস্তাদগনের নজর কাড়েন অল্পসময়ে। সারফ, হেদায়তুন্নাহু, ও মুখতাছার জমাতে বোর্ডে বৃত্তি সহ শীর্ষ রেজাল্ট করেন। অতঃপর উচ্চ শিক্ষার জন্য ভর্তি হন সিলেটের শ্রেষ্ট ইসলামী বিদ্যাপিট জামেয়া হোসাইনিয়া ইসলামিয়া গহরপুর মাদ্রাসায়। ২ বছর লেখা-পড়া করে সর্বোচ্চ ডিগ্রি দাওরায়ে হাদীস (কামিল) পড়ার জন্য চলে যান তৎকালিন পশ্চিম পাকিস্তানে। সেখানে তিনি কৃতিত্বের সাথে ক্বিরাআত, হাদিস, ফেক্বাহ, তাফসির সহ বিভিন্ন বিষয়ে ডিগ্রী অর্জন করেন। দারুল উলূম করাচিতে তিনি যাদের সাহচর্য লাভে ধন্য হন তন্মধ্যে বিশ্ব বিখ্যাত মুফাস্সিরে ক্বোরআন, মাআরিফুল কোরআনের রচয়িতা আল্লামা শফী রহঃ, মুফতিয়ে আজম আল্লামা মুফতি মাহমুদ রহঃ, আল্লামা আহমদ আলী লাহুরী রহঃ, আল্লামা গোলাম গৌছ হাজারভীসহ জগতবিখ্যাত মনিষীদের।
১৯৬৮ সালে ইসলামী শিক্ষার সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পর তিনি ২ বছরের সটকোর্সে ভর্তি হয়ে এস.এস.সি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অতঃপর আলিম ও ফাজিল পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে পড়ালেখা সমাপ্ত করেন। এসময় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ব শুরু হলে তিনি সহ তার দেশীয় সাথীরা সেখানে আটকা পড়েন। সাথীদের মধ্যে সুনামগঞ্জের রত্ন আল্লামা নুরুল ইসলাম খান, মুফতি শফিকুল অাহাদ সাকিতপুরীসহ ১৫/২০ জনের কাফেলা ছিলো। দেশ স্বাধীন হলে স্বদলবলে সবাই দেশে ফিরে আসেন। দেশে তার উস্তাদগণের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকজন হলেন শায়খুল হাদিস আল্লামা নুর উদ্দীন আহমদ গওহরপুরী, শায়খুল হাদিস আল্লামা মুখলিছুর রহমান ক্বিয়ামপুরী, শায়খুল হাদিস আল্লামা হেসাইন আহমদ উমরপুরী, মুফতি মাহমুদ আলী মনিগাতী রহঃ প্রমুখ।

Manual1 Ad Code

কর্ম জীবন :- কর্ম জীবনঃ মাওলানা আলা উদ্দীন চৌধুরীর কর্ম জীবন শুরু হয় দিরাই উপজেলার ভাটিপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড মাওলানা হিসাবেই। ৬মাস পর এলাকাবাসী ও হযরত শায়খে গাজিনগরীর পরামর্শে তিনি নিজ এলাকা মধুরাপুর মাদ্রসায় চলে আসেন। তৎকালিন সরকারী এই মাদ্রসাকে তিনি সর্ব সাধারনের সহযোগিতায় ক্বওমী মাদ্রাসায় রুপান্তরিত করেন। একজন দক্ষ প্রিন্সিপাল হিসাবে অল্প দিনে এটিকে একটি মডেল প্রতিষ্টানে পরিনত করেন। এখানে তিনি দীর্ঘ ১৮ বৎসর পর্যন্ত দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত ছিলেন। এ সময়ে তিনি অসংখ্য হাফিজে কোরআন, আলেমে দ্বীন ও দ্বীনের মুজাহিদ হিসাবে দেশের সুনাগরিক তৈরিতে বিশাল ভুমিকা রাখেন। তাঁর হাতে গড়া ছাত্রগণ ভাটি অঞ্চলে দ্বীনের সবচাইতে বেশী খেদমত করে যাচ্ছে।
একজন অাদর্শ শিক্ষক হিসাবে তার সুখ্যাতি ছিলো চতুর্দিকে। যে কাউকে অাপন করে নিতে পারতেন মুহুর্তে। পরোপকারে নিজেকে বিলিয়ে দিতে কখনো কুন্ঠাবোধ করেন নি। যেকারনে মধুরাপুর ভাটিপাড়াসহ অত্রাঞ্চলের সবাই ছিলো তার ভক্ত অনুরক্ত। দীর্ঘ ১৮ বছরে মধুরাপুরকে তার দ্বিতীয় বাড়ি হিসাবে গড়ে তুলেছিলেন। খাঁনবাড়িতে থাকার সুবাদে ছোট বড় সবাই তার জন্য ছিলো নিবেদিত। মন খোলে প্রান উজার করে এখানকার সবাই তাকে সমীহ করতো। তাদের সুখে দুংখে তিনি ছিলেন একজন অভিভাবক ও অাশ্রয়স্থল। এ বাড়ীর লোকরা এখনো তার জন্য অাফসোস করে।
দীর্ঘ ১৮ বছর পর তিনি জগন্নাথপুর উপজেলার শ্রীধরপাশা মাদরাসায় ৬ বছর মুহতামিম হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি ছিলেন একজন সফল মুহতামিম। যেখানে গিয়েছেন সেখানেই তিনি ফসল ফলিয়েছেন। সফলতার সাক্ষর রেখেছেন বীরদর্পে। শ্রীধরপাশা মাদরাসার সাথে পার্শবর্তী হাফিজিয়া মাদরাসার দীর্ঘদিনের বিরোধ মিটিয়ে তিনি পরো গ্রামকে মাদরাসামুখী করেন। তার জমানায় লেখাপড়ার মান দিনদিন বৃদ্ধি পেয়ে মাদরাসার সুনাম চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর দু\’বছর দিরাই উপজেলার ফুকিডর মাদরাসায় ও ১ বছর দক্ষিন সুনামগঞ্জের জয়সিদ্ধি বসিয়াখাউরী মাদরাসায় দায়িত্ব পালন করেন। মৃত্যুর দেড়বছর পুর্বে এলাকাবাসীর দাবির অনুরোধ চলে অাসেন নিজ হাতে প্রতিষ্ঠিত মুরাদপুর অানোয়ারুল উলুম মাদরাসায়। অাজ থেকে ৪০ বছর পুর্বে মাদরাসাটি তিনি প্রতিষ্টা করেন। মুধুরাপুরে থাকাকালিন এলাকাবাসীকে নিয়ে প্রতিষ্ঠিত নিজ গ্রামের মাদরাসায় সর্বদা পৃষ্টপোষকতা দিয়ে অাসছিলেন। এবার নিজে দায়িত্ব গ্রহণ করে বহুমুখী পরিকল্পনা নিয়ে মাদরাসাকে এগিয়ে নিতে অাত্মনিয়োগ করেন। কিন্তু খোদার মর্জি ছিলো ভিন্ন। তাই এখানে মুহতামিমের দায়িত্ব অাদায়কালিন দেড় বছরের মাথায় শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করে মাওলায়ে হাকিকির সাথে মোলাকাত করেন।

অবদান :- রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবন:
শিক্ষকতার পাশাপাশী তিনি ছিলেন একজন সমাজ সচেতন ব্যক্তি। এলাকা ও দেশের সার্বিক খবরাখবর নিয়মিত রাখতেন। অাজ থেকে ৩০ বছর পুর্বে যখন অনেক কওমী মাদরাসায় পত্রিকা পড়া নিষিদ্ধ ছিলো তখন তিনি নিয়মিত দৈনিক, সাপ্তাহিক ও মাসিক পত্রিকার পাঠক ছিলেন। আমরা তখন অনেট ছোট। ইবতেদায়ী কোন জামাতে অধ্যয়নরত। তখন পত্রিকা সামনে দিয়ে পড়তে দিতেন। পত্রিকার প্যারা, পাঠপদ্ধতি ইত্যাদি হাতে কলমে শিক্ষা দিতেন। মাসিক ম্যাগাজিনে লেখালেখির জন্য উদ্বুদ্ধ করতেন। তিনি একজন সমাজ সচেতন ও জনদরদী ছিলেন। এলাকার যেকোন বিচার পঞ্চাইতে তার উপস্থিতি ছিলো শিরোধার্য। সকলের মতামত মুল্যায়নের মাধ্যমে সমাধানের দায়িত্ব তাকেই বহন করতে হতো। এমন অনেক জটিল বিরোধ নিমিষে পানির মত সমাধান করতে দেখেছি। অনেক জটিল ও কুটিল বিষয়ের সমাধান নিচ চোঁখে দেখেছি। উপস্থিত জ্ঞানের তথ্যকোষ ছিলেন তিনি। যেকোনো মাসঅালা বা জিজ্ঞাসার সঠিক জবাব তাঁর নিকট পাওয়া যেত।
রাজনৈতিক ও সামাজিক অান্দোলনে তার ভুমিকা ছিলো নেতৃত্ব শুলভ। সমাজের অন্যায়, অনাচার, দুর্গতি অসঙ্গতি দুরীকরণে তার কৌশলী ভুমিকা ছিলো প্রশংসনীয়। সবসময় বিবাদ বিসংবাদ ও বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করতেন। তাঁর অাচরনে কেউ অাঘাত পেয়েছে এমন লোক খোজে পাওয়া যায়নি।
রাজনীতির মাঠে তিনি জমিয়তের একজন নিবেদিত কর্মী ছিলেন। পদ পদবী উপেক্ষা করে সারাজীবন কাজ করে গেছেন একজন দায়িত্বশীলের মত। জেলা উপজেলার প্রতিটি প্রোগ্রামে উপস্থিত হয়ে জোরালো ভুমিকা রাখতেন। নেতৃবৃন্দের দিকনির্দেশিত কাজ বাস্থবায়নে সর্বোচ্চ প্রয়াস চালাতেন। তার মত একজন নির্লোভ ও নিরহংকারী নেতার বড়ই অভাব।
১৯৯২ সালের জাতীয় নির্বাচন। চারদিকে চলছে নির্বাচনী প্রস্তুতি। প্রতিটি দলের পক্ষ থেকে প্রার্থী মনোনয়ন চলছে। জেলা জমিয়তের নির্বাচন বিষয়ক বৈঠক অাহবান করা হলো। এতে সুনামগঞ্জের ৫টি অাসনে দলীয় প্রার্থী দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। প্রাথমিক বাচাইয়ে যে পাঁচটি নাম অাসে তন্মধ্যে সুনামগঞ্জ-২ দিরাই শাল্লা থেকে তিনি (মাওলানা অালাউদ্দীন চৌধুরী রহ:) ছিলেন। তার গ্রামের ঠিকানা তৎকালিন সুনামগঞ্জ সদরে হলেও যোগ্যতা ও গ্রহণযোগ্যতায় তাকেই বাছাই করা হয়েছিল। যদিও বিভিন্ন কারনে শেষ পর্যন্ত তিনি নির্বাচনী যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেননি। এর মাধ্যমে তার রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও সর্বসাধারণের নিকট তার গ্রহনযোগ্যতা ফুটে উঠে। সবশেষে ইসলামি ঐক্যজোটের ব্যানারে নির্বাচনে সুনামগঞ্জ-৩ অাসন থেকে এডভোকেট সৈয়দ শামসুল ইসলাম প্রার্থী হন। তাকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিয়ে আসতে তার তৎপরতা ছিলো উল্লেখ করার মত। নিজ গ্রামের সেন্টারে খেজুরগাছের প্রার্থীকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী করে রেকর্ড সংখ্যক ভোট পাইয়ে দিয়েছিলেন।

মৃত্যু তারিখ :- ৩০ জুন ২০০০ সালে শুক্রবার।

Manual3 Ad Code

তথ্য দানকারীর নাম :- মাওলানা তৈয়্যিবুর রহমান চৌধুরী।

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- ০০৮৮০১৭১৬১২২০৩২

Manual5 Ad Code

Spread the love