সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী বদরপুরী রহ.

এপ্রিল ০৪ ২০১৯, ০৩:০৯

নাম :- মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী বদরপুরী রহ.

জন্ম / জন্মস্থান :- উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রথম আমীরে শরীয়ত, প্রখ্যাত সমাজ সংস্কারক ও পীরে তরীকত মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী বদরপুরী রহ. বর্তমান দক্ষিণ সুরমা উপজেলার রেঙ্গা পরগনার তুরুকখলা গ্রামে ১৯২৫ খৃষ্টাব্দের ১ জানুয়ারি,১২ রবিউল আউয়াল,জন্ম গ্রহণ করেন।তাঁর পিতা মরহুম আসগর চৌধুরী ও মাতা সামসুন্নেছা চৌধুরী অত্যন্ত আল্লাহওয়ালা এবং পরহেযগার ছিলেন। তাঁর পূর্ব পুরুষরা সুদূর আরব হতে হিজরত করে তুরস্ক হয়ে হযরত শাহজালাল রহ. সাথে সিলেট এসে এখানে বসবাস করেন বলেই এই জনপদের নাম \’তুরুকখলা\’ নামকরন হয়ে যায় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।

শৈশব কাল :- তিনি মাতৃ স্নেহে শৈশবকাল অতিবাহিত করেন।তাঁর মাতা ফার্সি ভাষায় অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন।প্রাথমিক দ্বীনি জ্ঞান এবং আরবী ও কুরআন মাজীদের শিক্ষা তাঁর মাতার কাছ থেকেই লাভ করেন।

শিক্ষা জীবন :- গ্রামের পাঠশালায় কৃতিত্বের সাথে প্রাথমিকের পাঠ সমাপ্ত করে স্থানীয় দাউদপুর মাদরাসায় ভর্তি হন। এখানে জুনিয়র ক্লাসের পড়া শেষ করে সিলেট সরকারী আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন।সেখানে তিনি প্রথম বিভাগে মাদরাসা ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।১৯৩৯ সালে তিনি মাদরাসা ফাইন্যাল পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।এখানেই তিনি ১৯৪০ সালে প্রথম বিভাগে এমএম (মমতাজুল মুহাদ্দিসীন) পাশ করেন।সিলেট আলিয়া মাদরাসায় অধ্যয়নকালে তিনি মাদরাসা ছাত্র সংসদের জিএস ছিলেন।বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামে অংশগ্রহণ করার কারণে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন।এর পর তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে ভর্তি হয়ে ১৯৪২ সালে দাওরায়ে হাদীস সমাপন করেন।কিন্তু সেসময় শায়খুল ইসলাম আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. সহ স্বাধীনতা সংগ্রামী নেতৃবৃন্দ বৃটিশ লাল ফৌজের হাতে বন্দী হন।ফলে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে উঠে।তখন মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী বদরপুরী রহ. বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে দেওবন্দের ছাত্রদের নেতৃত্ব দেন।ফলে তখন আর পরীক্ষা দেয়া সম্ভব হয়নি। ১৯৫২ সালে তিনি রীতিমত পরীক্ষা দিয়ে কৃতিত্বের সাথে দারুল উলূম থেকে দাওরায়ে হাদীস উত্তীর্ণ হন।দেওবন্দে অবস্থান কালে তিনি শায়খুল ক্বুররা হযরত মাওলানা ক্বারী হিফজুর রহমান সাহেব রহ. থেকে ইলমে ক্বিরাআতের ও সনদ লাভ করেন।সেখানে তাঁর উস্তাজ ছিলেন,শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাব্বির আহমদ উসমানী রহ.,শায়খুল হাদীস আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.,শায়খুল আদব হযরত মাওলানা এ\’জাজ আলী রহ.,মুফতীয়ে আ\’জম হযরত মাওলানা মুফতী মুহাম্মদ শফী রহ.,হযরত মাওলানা ইব্রাহীম বিলয়াবী রহ.,শায়খুত্ তাফসীর হযরত মাওলানা ইদ্রীছ কান্দলভী রহ. প্রমূখের মত জগৎবিখ্যাত আকাবিরীনকে উম্মাহ।

কর্ম জীবন :- কর্ম জীবনের সূচনা থেকে মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি শিক্ষকতা পেশার সাথে জড়িত ছিলেন।সিলেট সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে ফার্সী শিক্ষকরুপে তাঁর কর্ম জীবনের সূচনা।এরপর দুই বছর কাল যশোহর আলিয়া মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়ীত্ব পালন করেন।পরে দায়ীত্ব থেকে অব্যাহতি নিয়ে ফুলবাড়ী আজিরিয়া সিনিয়র মাদরাসায় শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন।তখন উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম তুঙ্গে।তিনি সিলেটের আলিম সমাজকে জমিয়তের পতাকাতলে সংগঠিত করে স্বাধীনতা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন।দীর্ঘ সংগ্রামের পর ১৯৪৭ সালের ১৪ আগষ্ট ভারত ভাগ করে পাকিস্তান নামে নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়।ভারতের মুসলিম অধ্যুষিত জনপদের অধিকাংশই পাকিস্তানের প্রস্তাবিত মানচিত্রে দেয়া হলেও বিপত্তি বাঁধে মুসলিম অধ্যুষিত সিলেট ও কাশ্মীর নিয়ে।দেয়া হয় গণভোট।গণভোটের ফলাফল অনুযায়ী সিলেটের সাড়ে তিন থানা ব্যতিত পুরো সিলেট জেলাই পাকিস্তানের সাথে দেয়া হয়।যদিও জম্মু-কাশ্মীরের বিষয়টি গণভোটের পরও বৃটিশরা অমিমাংসিত রেখে দেয়।
দেশত্যাগ ও ভারতে হিজরত:
এই গণভোটে আল্লামা মাদানী রহ.\’র জমিয়ত কংগ্রেসের সাথে ভারত বিভক্তির বিপক্ষে অবস্থান নেয়।পক্ষান্তরে মুসলিম লীগ ভারত বিভক্তির পক্ষে শক্ত অবস্থান নেয়।হযরত মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী রহ. অখন্ড ভারতের পক্ষে জোর প্রচারণা চালান।তাঁর বাগ্মীতায় মুসলিমলীগ শিবিরে আতঙ্ক দেখা দেয়।ফলে স্বাধীন পাকিস্তান সৃষ্টির পর মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী রহ. সহ জমিয়তপন্থী ওলামায়ে কেরামের জীবনে দূর্যোগ নেমে আসে।হযরত শায়খে বদরপুরী কে দুনিয়া থেকে উঠিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করে মুসলিমলীগের উগ্রপন্থী সন্ত্রাসীরা।এসংবাদটি তাঁর কানে আসা মাত্রই তিনি আসামের জমিয়ত নেতৃবৃন্দের সাথে যোগাযোগ করেন।তাঁরা আসামের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বড়দলইকে অনুরুধ করেন মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরীকে আসামের নাগরিকত্ব দিয়ে সেখানে বসবাসের সুযোগ দেয়ার জন্য।মূখ্যমন্ত্রী দ্রুত পদক্ষেপ নেন এবং তাকে আসামে চলে যাওয়ার জন্য চিঠি লিখেন।মুখ্যমন্ত্রীর চিঠি পেয়ে তিনি কালবিলম্ব না করে সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম দিকে আসামের বদরপুরে চলে যান।দেশে তাঁর পিতা, মাতা,ভাই-বোন ও স্ত্রী রেখে যান।পরবর্তীতে স্ত্রী ভারতে যেতে না চাওয়াত তাকে তালাক দিয়ে দেন।আসামের বদরপুরের আলাকুলিপুর গ্রামে গিয়ে বসবাস শুরু করেন।বদরপুর ঐতিহাসিক ভাবে প্রসিদ্ধ শহর এবং হযরত শাহজালাল মুজররদে ইয়ামনী রহ.\’র স্মৃতিবিজড়িত এলাকা।এখানে তাঁর ৫ জন সঙ্গী শায়িত আছেন।দেওরাইল সিনিয়র মাদরাসা বদরপুর শহরের পশ্চিম পাশেই অবস্থিত।মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা জৌনপুরী সিলসিলার প্রখ্যাত বুজুর্গ হযরত মাওলানা আবু ইউসুফ ইয়াকুব বদরপুরী রহ.-যিনি হাতিম আলী সাহেব নামে সমধিক পরিচিত ছিলেন-তাঁর আহ্বানে ষাড়া দিয়ে হযরত মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী রহ. ১৯৪৭ সালের ১ অক্টোবর সেই মাদরাসার প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন।কার্যভার গ্রহণ করেই তিনি ভঙ্গুর এই মাদরাসাকে দারুল উলূম দেওবন্দের আদলে ঢেলে সাজাতে থাকেন।তাঁর চেষ্টায় ১৯৪৮ সালে মাদরাসাটি আসাম সরকার স্বীকৃতি দেয় এবং ১৯৪৯ সাল থেকে আসাম সরকার মাদরাসার বেতন-ভাতা দিয়ে আসছে।১৯৫৪ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী থেকে মাদরাসায় দুই বছর মেয়াদী দাওরায়ে হাদীস (টাইটেল) ক্লাস চালু আছে।শায়খুল ইসলাম আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী রহ.\’র মোবারক যবানে দারসে হাদীসের উদ্বোধন হয়।হযরত মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী বদরপুরী রহ. সেদিন থেকে মৃত্যু অবদি শায়খুল হাদীসের পদ অলংকৃত করে রাখেন।

অবদান :- ছাত্র জীবন শেষ করেই তিনি জমিয়তের রাজনীতির সাথে স্বক্রীয় ভাবে জড়িয়ে পড়েন।তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা, সাহসিকতা,বাগ্মীতায় মূগ্ধ হয়ে উলামায়ে কেরাম তাকে আসাম জমিয়তের জেনারেল সেক্রেটারী নির্বাচিত করেন।তখন সভাপতি ছিলেন কানাইঘাটের মাওলানা ইব্রাহীম চতুলী রহ.।তিনি অবিভক্ত ভারতের আসাম বিধান সভার নির্বাচিত এমএলএ ছিলেন।ভারতে হিজরত করে তিনি মাদানী রহ.\’র জীবদ্দশায় আসাম জমিয়তের জেনারেল সেক্রেটারীর পাশাপাশি নিখিল ভারত জমিয়তের মজলিসে আমেলা ও মুন্তজিমার সদস্য ছিলেন।যার সভাপতি ছিলেন হযরত মাদানী রহ.।কিন্ত মাদানী রহ.\’র ইন্তেকালের পর জমিয়তের অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খল পরিবেশের কারণে তিনি হতাশ হয়ে পড়েন।কিছু দিন পরিবেশ সুন্দর করার প্রাণান্তকর চেষ্টা করে বিফলমনোরত হয়ে তিনি নিষ্ক্রিয় হয়ে শুধুমাত্র কংগ্রেসের নেতা রুপে স্বক্রীয় থাকেন।১৯৫২ খৃষ্টাব্দ থেকে তিনি দীর্ঘ ২৫ বছর আসাম বিধান সভার নির্বাচিত এমএলএ ছিলেন।বিধান সভার সরকার দলীয় বিধায়ক হওয়া সত্ত্বেও তিনি ইসলাম,মুসলিম উম্মাহ এবং বাংলা ভাষাভাষিদের স্বার্থ বিরোধী যেকোন তৎপরতা প্রতিরোধে অটল ছিলেন।একজন স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছেও তিনি মর্যাদার আসনে সমাসীন ছিলেন।
ভারত স্বাধীনের পর থেকে হযরত মাদানী রহ.সহ শীর্ষ স্থানীয় উলামায়ে কেরাম ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে এমারতে শরীয়াহ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিলেন।তাই বিভিন্ন রাজ্যিক জমিয়তকে তিনি এ মর্মে নির্দেশনাও দেন।কিন্তু আসাম জমিয়তের অগোছালো অবস্থার মধ্যে এমারতে শরীয়াহ গঠন সুদূরপরাহত হবে।তাই হযরত বদরপুরী রহ. তাঁর ছাত্র-শিষ্য ও অনুসারীদেরকে নিয়ে এমারত গঠনের পরিবেশ তৈরীতে মনযোগ দেন।১৯৬৩ সালে \’তা\’লীমি জামাত\’ নামে একটি ইসলামী সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন।১৯৬৫ সালের ২৭ রমজান একে আরো সম্প্রসারিত করে \’এদারায়ে তা\’লীম ও তানজীম\’ নামকরন করেন। পরে এই সংগঠনের পরিধি ও কর্মক্ষেত্র আরো বর্ধিত করে ১৯৬৬ সালের ২৭ রমজান \’আসাম নদওয়াতুত্ তামীর\’ নাম রাখেন।এর দশ বছর পর ১৯৭৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারী প্রায় অর্ধ লক্ষ মুসলিম জন সাধারণের উপস্থিতিতে আহলে হল্লে ওয়াল আক্বদের সমাবেশে তাকে উত্তর-পূর্ব ভারতের আমীরে শরীয়ত নির্বাচিত করে এমারতে শরীয়াহ\’র আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়।তাকে আমীরে শরীয়ত হিসেবে ঘোষণা করে তাঁর হাতে উত্তর-পূর্ব ভারতের মুসলিম জনসাধারণকে এমারতের প্রতি আনুগত্যের বায়আত করার আহ্বান জানান,বিহার-উড়িষ্যার আমীরে শরীয়ত ও অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সনাল ল\’বোর্ডের সেক্রেটারী জেনারেল মাওলানা মিন্নতুল্লাহ রহমানী রহ.।শুরু হয় এমারতে শরীয়াহ\’র অধীনে কাজিয়ে শরীয়ত নিয়োগ।তিনি দুর্দশাগ্রস্থ মুসলমানদের দুর্দশা লাঘবে প্রতিষ্ঠা করেন \’বায়তুল মাল\’ তহবিল।যেখানেই মসজিদ সেখানে সবাহী মক্তব এবং মসজিদ ভিত্তিক তাফসীর,তাবলীগ ও আত্নশুদ্ধির মেহনত।এমারতে শরীয়াহ\’র মুখপত্র হিসেবে প্রকাশ করেন \’মাসিক নেদায়ে দ্বীন\’ পত্রিকা।এছাড়া \’এদারায়ে তাসনীফ ও এশাআত\’ নামে গড়ে তুলেন দ্বীনি গবেষণা,রচনা ও প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান।আল জামেয়া আল ইসলামিয়া খ্যাত দেওরাইল টাইটেল মাদরাসাকে একটি বিশ্ববিদ্যালয় মানে উন্নীত করে রেখে যান।
আধ্যাত্নিক সাধনা:
তিনি যেমন ছিলেন একজন শিক্ষা গুরু,সমাজ সংস্কারক, কর্ম বীর এবং কিংবদন্তিতূল্য রাজনীতিবিদ।তেমনি ছিলেন একজন যুগশ্রেষ্ট ওলী।ছাত্র জীবনেই তিনি আসামের করীমগজ্ঞস্থ সিঙ্গারী গ্রামের নবী প্রেমিক বুজুর্গ ক্বারী নজীব আলী সাহেবের কাছে বায়আত হন।পরবর্তীতে প্রিয় মুর্শিদের আদেশে কুতবে আলম হযরত মাদানী রহ.\’র কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য একাধিকবার নিজেকে পেশ করেন।কিন্তু মাদানী রহ. তাকে এই বলে বার বার ফিরিয়ে দিতেন যে,\’আপনার মুর্শিদ একজন কামিল বুজুর্গ।তাঁর কাছ থেকেই ফায়দা নাও।\’যখন ক্বারী নজীব আলী রহ.\’ ইন্তেকাল হয়ে যায় তখন মাদানী রহ. তাঁর প্রিয় ছাত্র মাওলানা আবদুল জলীল বদরপুরী রহ.কে নিজে ডেকে নিয়ে আসাম সফরের এক ফাকে ১৯৫২ সালে আসামের নওগাঁ জেলায় বায়আত করান।দীর্ঘ রিয়াজত ও মুজাহাদার পর ১৯৫৪ সালে তিনি মাদানী রহ.\’র নিকট থেকে পাঁচ তরীকার ওপর ইজাযত লাভ করেন।
তাঁর মুর্শিদের জীবদ্দশায় তিনি কাউকে মুরীদ করেননি।যদিও মাদানী রহ. তাকে মুরীদ করার তাগাদা দিয়েছেন বার বার।কিন্তু যারাই তাঁর কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য আসতেন তিনি তাদেরকে মাদানী রহ.\’র কাছে পাঠিয়ে দিতেন।১৯৫৭ সালে হযরত মাদানী রহ.\’র ইন্তেকালের পর হযরতের আসামের মুরীদান বদরপুরী হযরতের নিকট বায়আত হতে পীড়াপীড়ি করলে তিনি তাদের থেকে বায়আত নেয়া শুরু করেন।এসময় আসামের শীর্ষ স্থানীয় আলিম,যারা মাদানী রহ.\’র কাছে মুরীদ ছিলেন; তারাও তাজদীদে বায়আত করেন হযরত বদরপুরী রহ.\’র কাছে।যারা তাঁর কাছে মুরীদ হতেন,তাদেরকে তিনি নদওয়াতুত্ তামীর নামক সংগঠনে সংগঠিত করে আধ্যাত্নিক ও সামাজিক ট্রেনিং দিতেন।তাঁর এই মেহনতের সংবাদ ভারত ছাড়িয়ে বাংলাদেশ এসে পৌছলে এখান থেকেও শত শত আলিম ও সাধারণ মুসলমান তাঁর কাছে মুরীদ হওয়ার জন্য ভীড় জমান।প্রতি রমজানের শেষ দশদিন হযরতের বাড়ী সংলগ্ন আলাকুলিপুর জামে মসজিদে এ\’তেকাফ চলাকালীন মুরীদানের আধ্যাত্নিক প্রশিক্ষণ চলত।ফলে ভারত বাংলাদেশে তাঁর তিন সহস্রাধিক খলিফা রেখে যান।শুধু বাংলাদেশেই দেড়শতাধিক খলিফা আছেন।তিনি বাংলাদেশ ও বহির্ভারতে অসংখ্য সফর করেছেন।একাধিকবার তিনি সৌদী সরকারের রাজকীয় মেহমান হিসেবে হজ্জ সফর করেছেন।
অল ইন্ডিয়া লেভেলে হযরতের অবদান:
তিনি অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সনাল ল\’বোর্ড,অল ইন্ডিয়া মজলিসে মুশাওয়ারাত,মিল্লী কাউন্সিল,হজ্জ রাবেতা কমিটি ও ইন্ডিয়া ফিকহ একাডেমী প্রবৃতি সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।তিনি এসব সংস্থার আজীবন কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন।তিনি উত্তর-পূর্ব ভারতে দওরে সাহাবা-তথা সাহাবা যোগ ফিরিয়ে আনার স্বপ্নে বিভের ছিলেন।তাঁর রেখে যাওয়া সংগঠন \’উত্তর-পূর্ব ভারত নদওয়াতুত্ তামীর\’র কার্যক্রম ও এর কর্মী বাহিনীর আমল দেখলে হযরতের স্বপ্নের বাস্তব নমুনা আঁচ করতে পারবেন।তাঁর একটি কথাই ছিল,\’কুরআন ছাড়া কথা নাই-সুন্নত ছাড়া আমল নাই\’।সত্যিই তাঁর কথা ও কাজে অপূর্ব মিল ছিল।তিনি স্বপ্ন দেখতেন একদল কর্মী বাহিনীর;যারা তাঁর মিশনকে বয়ে চলেছে আজো বর্তমান আমীরে শরীয়ত শায়খুল হাদীস মাওলানা ইউসুফ আলী দামাত বারাকাতুহুম এর নেতৃত্বে।যাদেরকে হযরত বদরপুরী রহ. বলতেন \’আম্মাল জামাত\’।এদেরকে দিবা ভাগে দেখলে মনে হয় শাহসওয়ার আর রাত্রীভাগে দেখলে মনে হবে খেদাপ্রেমিক সন্যাসী।

মৃত্যু তারিখ :- বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী এই কর্মবীর ১৯৮৯ সালের ১৯ ডিসেম্বর রাত ০৯.১৫ঘটিকার সময় পরম প্রিয় মাওলার যিকির রত অবস্থায় চিরনিদ্রায় শায়িত হন।২০ ডিসেম্বর আসরের নামাজের পর তাঁর চিরচেনা ইলমে নববীর বাগান আল জামেয়া প্রাঙ্গণে নামাজে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়।লক্ষ লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে জানাযার ইমামতি করেন,তাঁরই ছাত্র ও শিষ্য উত্তর-পূর্ব ভারতের দ্বিতীয় আমীরে শরীয়ত আল্লামা তৈয়ীবুর রহমান বড়ভুইয়া।আল্লাহ উভয়ের দরজা বুলন্দ করুন।

তথ্য দানকারীর নাম :- তথ্যসূত্র:১।আমীরে শরীয়ত মাওলানা আবদুল জলীল চৌধুরী রহ.।২-খাজেগানে চিশত্।৩-মাওলানা আবদুল জলীল বদরপুরী জীবন ও সংগ্রাম।গ্রন্থনা:মুখলিছুর রহমান,যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক,বাংলাদেশ নদওয়াতুল আযকার।

Spread the love