সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা আব্দুল হাই দিনারপুরী রহ. এর জীবন ও কর্ম

এপ্রিল ০৯ ২০১৯, ০৭:০৯

নাম :- আলহাজ্ব হযরত মাওলানা আব্দুল হাই দিনারপুরী রহ.

জন্ম / জন্মস্থান :- হবিগঞ্জ জেলার অন্তর্গত নবীগঞ্জ থানার দিনারপুর পরগনার বালিধারা গ্রামে ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দ মোতাবেক ১৩২১ বঙ্গাব্দ।

শৈশব কাল :- ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে শায়খে দিনারপুরী রহ. ধর্মীয় শিক্ষার উদ্দেশ্যে সবাহী মক্তবে ভর্তি হন। উক্ত মক্তবেই তিনি মৌলভী ছদর মুন্সি (রহ.) এর নিকট অধ্যয়ন করেন কুরআন শরীফ, গুলিস্তা ও বুস্তাসহ অন্যান্য বেশ কিছু ধর্মীয় কিতাবাদি। পাশাপাশি তিনি সদরঘাটের মরহুম আখতার চৌধুরীর কাছে প্রাইমারী শিক্ষা সমাপ্ত করেন। ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দে মাও: হাবিবুর রহমান রায়পুরী (রহ.) এর তত্ত্বাবধানে থেকে আনুমানিক দুই বছর নিম্ন মাধ্যমিক শিক্ষা অর্জন করেন। এছাড়াও স্বনামধন্য ক্বারী মাও: মিছবাহুজ্জামান কদুপুরী (রহ.) এর নিকট ইলমে কেরাতের বিভিন্ন কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন।অতঃপর মাও: তমিজ উদ্দিন পাঞ্জারাই (রহ.) এর নিকট নাহু-সরফের বিভিন্ন কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। সেখান থেকে তিনি সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসায় দুওম জামাতে ভর্তি হন। সেখানে আনুমানিক দুই বছর যাবত তৎকালীন প্রিন্সিপাল মাও: হাবিবুর রহমান চৌধুরী, মাও: আব্দুল আজিজ পেশওয়ারী আবুল ওয়াজিহ, মাও: ফাইয়াজ উদ্দিন করিমগঞ্জী (রহ.) প্রমুখ বুজুর্গানে দ্বীনের তত্ত্বাবধানে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে লেখাপড়া করেন।

শিক্ষা জীবন :- উচ্চশিক্ষাঃ- উচ্চ শিক্ষা লাভের আশায় সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা থেকে সাহারানপুর মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে দীর্ঘ সাত বছর হাদিস, তাপসির, ফেকাহ, মানতেক, উসুলে ফেকাসহ বিভিন্ন বিষয়ের গুরুত্বপূর্ণ কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন এবং দাওরায়ে হাদিসে ১ম বিভাগে উত্তীর্ণ হন। সেখানকার উস্তাদগণের মধ্যে উপমহাদেশের প্রখ্যাত শাইখুল হাদিস আল্লামা যাকারিয়া সাহারানপুরী রহ. ও আল্লামা আছআদ উল্লাহ রহ. বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এরপর ইলমে হাদিসে আরও অধিক জ্ঞান লাভের আশায় মুসলিম মিল্লাতের প্রাণকেন্দ্র দারুল উলুম দেওবন্দে উলূমুল কুরআন ওয়াল হাদিস নিয়ে স্টাডি শুরু করেন। পাশাপাশি আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনে শায়খুল আরব ওয়াল আজম আল্লামা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.) এর হাতে বাইয়াত গ্রহন করেন। সেখানে তিনি ১ বৎসর ইলমে হাদিসের সর্বোচ্চ কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে তার উস্তাদগণের মধ্যে আল্লামা সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মাদানী (রহ.), শায়খূল আদব আল্লামা ইজাজ আলী (রহ.) অন্যতম। সহপাঠীদের মধ্যে বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদের সাবেক খতিব আল্লামা উবায়দুল হক (রহ.) এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

কর্ম জীবন :- দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে উচ্চ শিক্ষা সমাপন করতে না করতেই শিক্ষকতার ডাক আসে হযরতুল আল্লাম শামসুল হক ফরিদপুরী (রহ.) প্রতিষ্ঠিত শামসুল উলূম গওহরডাঙ্গা ফরিদপুর থেকে। সেখানে অত্যন্ত সুনামের সাথে প্রায় ২ বৎসর শিক্ষকতার দায়িত্ব আঞ্জাম দেন। ২ বৎসর পর সেখান থেকে চলে যান বরিশাল কাসিমিয়া মাদরাসায়। এরপর নবীগঞ্জ থানার ইমামবাড়ি টাইটেল মাদরাসায় ২ বৎসর শিক্ষকতা করেন। তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ পাঠদান পদ্ধতি ও মুগ্ধকর আচরণে মাদরাসার ছাত্র-শিক্ষক সকলেই ছিলেন প্রশংসায় পঞ্চমুখ।

অবদান :- জামিআ’ দিনারপুর প্রতিষ্ঠাঃ- দারস ও তাদরীসের পাশাপাশি তিনি দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে গিয়ে ওয়াজ-নসীহত করে ইসলামের সুমহান আদর্শ প্রচার করতন। ওয়াজের সুবাধে মৌলভীবাজার এক মাহফিলে একত্র হন শায়খে বাঘা (রহ.), শায়খে রায়পুরী (রহ.), শায়খে বরুণী (রহ.)। হযরতত্রয় দিনারপুর অঞ্চলে একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য শায়খে দিনারপুরী (রহ.) কে বারবার তাকিদ দেন। এরপর নানা প্রতিকূলতা পার হয়েমহান আল্লাহর করুনায় এলাকাবাসীর সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৫৪ ঈসায়ি সনে “ জামিআ’ ইসলামিয়া আরাবিয়া দিনারপুর” প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত জামিআ’ আজ অবধি দ্বীনের সত্যিকার আলো প্রসারে নিয়োজিত রয়েছে।
জামিআ’ পরিচালনাঃ- হযরত শায়খে দিনারপুরী (রহ.) জামিআ’র প্রতিষ্ঠাকাল থেকে নিয়ে দীর্ঘ ৪৭ বছর পর্যন্ত অত্যন্ত নিষ্ঠা ও সততার সাথে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে গেছেন। হযরতের আপ্রাণ চেষ্টা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের বিনিময়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে মাদরাসার সুনাম-সুখ্যাতি। বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইলমে দ্বীনপিপাসু শিক্ষার্থী ছুটে আসেন শায়খের নিকট।
সামাজিক অবদানঃ- তিনি ছিলেন শিরক-বিদআতে লিপ্ত ভন্ড ও মাজার পূজারীদের বিরুদ্ধে গর্জে উঠা একজন সিংহ পুরুষ। তিনি আজীবন বাতিলের মোকাবিলায় তৎপর থেকেছেন। এছাড়াও সমাজকে পাপ পঙ্কিলতা মুক্ত করতে তিনি ছিলেন এক অনন্য ব্যক্তিত্ব। এলাকার বিদআত দমনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য।

মৃত্যু তারিখ :- ৬ই ফেব্রুয়ারী ২০০১ ঈসায়ির মঙ্গলবার দিনে সুন্নাত হিসেবে চিকিৎসা গ্রহণের লক্ষ্যে সিলেটের উদ্দেশ্যে যাত্রাকালে সকাল ৯.৪০ মিনিটে শেরপুর আল কনর কমিউনিটি সেন্টারের বরাবর পৌছাতেই তিনবার আল্লাহ আল্লাহ শব্দ উচ্চারণ করে চলে গেলেন মাওলার দরবারে। তিনি ৮৬ বছর বয়সে মৃত্যুকালে ২ ছেলে ও ৫ মেয়ে রেখে যান। হাজার হাজার লোকে লোকারণ্য জামিআর মাঠে ঐ দিন বিকাল ৫টার সময় অনুষ্ঠিত হয় তাঁর জানাযার নামাজ। জানাযার ইমামতি করেন হযরতের ছোট ছেলে দরগাহে হযরত শাহজালাল (রহ.) জামে মসজিদের বর্তমান ইমাম হাফিজ মাও: আসজাদ আহমদ।

মোবাইল :-

তথ্য দানকারীর নাম :- সৈয়দ মুনিমুল হাসান (আদিল)

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- ০১৭৪৩০০২০৭৮

Spread the love