সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা নুর হোসাইন কাসেমীর বর্ণাঢ্য জীবনের সংক্ষিপ্ত বিবরণ

October 05 2019, 03:19


Manual7 Ad Code

নাম :- নুর হোসাইন

Manual7 Ad Code

জন্ম / জন্মস্থান :- জন্ম : ১৯৪৫ সালের ১০ জানুয়ারী মোতাবেক ১৮ আষাঢ় ১৩৫৩ বঙ্গাব্দ রোজ শুক্রবার বাদ জুমআ কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ থানার চড্ডা নামক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন।

শৈশব কাল :- তিনি শৈশব থেকেই পড়াশুনার প্রতি অনেক মনোযোগী ছিলেন ।প্রাথমিক শিক্ষা গ্রামের স্কুলে শুরু করেন। অতপর চতুর্থ শ্রেনী শেষ করে মাদরাসায় ভর্তি হন।

শিক্ষা জীবন :- শিক্ষাজীবন :
তিনি ছোটোবেলা থেকেই প্রচুর ডানপিঠে ছিলেন। বাবা-মায়ের কাছেই প্রাথমিক শিক্ষা-দীক্ষা গ্রহণ করেন।
তার বাবা পাড়ার অন্যান্য ছেলেদের সাথে প্রথমে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেন। বাড়ির পাশেই ছিলো স্কুল। চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত এ স্কুলেই তিনি পড়াশুনা করেন।

Manual8 Ad Code

তারপর তিনি চড্ডার পাশের গ্রামে কাশিপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। এখানে মুতাওয়াসসিতাহ পর্যন্ত পড়েন। তারপর বরুড়ার ঐতিহ্যবাহী মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে হেদায়া পর্যন্ত পড়েন। বর্তমান সময়ের অন্যতম রাহবার আল্লামা তাফাজ্জল হক হবিগঞ্জী সাহেবের কাছে খুসুসীভাবে এ সময় তিনি দরস লাভ করেছেন। (তাঁকে উস্তাদের মর্যাদায় সর্বদা দেখেন তিনি)

বাবার ঐকান্তিক ইচ্ছা ও তাঁর অগাধ প্রতিভার ফলে উচ্চ শিক্ষার জন্য তখন বিশ্ববিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দে পাড়ি জমান। কিন্তু ভর্তির নির্ধারিত সময়ে পৌঁছাতে না পারায় সাহারানপুর জেলার বেড়ীতাজপুর মাদরাসায় ভর্তি হোন। সেখানে জালালাইন জামাত পড়েন।
তারপর দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন ও ইলমী পিপাসাকে নিবারণের জন্য ভর্তি হোন দারুল উলুম দেওবন্দ এ। দেওবন্দ মাদরাসায় ভর্তি হওয়ার পর থেকে তাঁর মেধার স্বাক্ষর প্রতিফলিত হতে থাকে। ধারাবাহিক সফলতা তাঁর পদচুম্বন করতে থাকে।

এখানে তৎকালীন সময়ের শ্রেষ্ঠ আলেম আল্লামা ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী  রহ. এর কাছে বুখারী শরীফ পড়েন। মুরাদাবাদী রহ. এর অত্যান্ত কাছের ও স্নেহভাজন হিসেবে তিনি সবার কাছে পরিচিতি লাভ করেছিলেন। ফলে অল্প সময়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
তাকমীল জামাত পড়ার পর আরো তিন বছর বিভিন্ন বিষয়ের উপর ডিগ্রি অর্জনে ব্যাপৃত থাকেন। এ সময় তাকমীলে আদব, তাকমীলে মাকুলাত, তাকমীলে উলুমে আলিয়া সমাপ্ত করেন।

শিক্ষকবৃন্দ :
আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী দা.বা. তার ছাত্র জীবনে তখনকার সময়ের যুগশ্রেষ্ট উস্তাদদের কাছে দরস নেয়ার সৌভাগ্য লাভ করেছেন। তন্মধ্যে প্রসিদ্ধ কয়েকজন হলেন মাওলানা সায়্যিদ ফখরুদ্দীন মুরাদাবাদী, মাওলানা মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী, মাওনানা শরীফুল হাসান, মাওলানা নাসির খান, মাওলানা আব্দুল আহাদ,  মাওলানা আনজার শাহ, মাওলানা নাঈম সাহেব, মাওলানা সালিম কাসেমী রহ.সহ বিশ্ববরেণ্য ওলামায়ে কেরামের কাছে তিনি দরস লাভ করেন

কর্ম জীবন :- শিক্ষকতা :
দীর্ঘ ২৭ বছর যাবৎ অর্জিত জ্ঞানকে প্রচারের নিমিত্তে তার উস্তাদ মাওলানা আব্দুল আহাদ রহ. এর পরামর্শে হুজ্জাতুল ইসলাম কাসেম নানুতুবী রহ. এর প্রতিষ্ঠিত মুজাফফরনগর শহরে অবস্থিত মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনার কাজ শুরু করেন। মুরাদিয়া মাদরাসায় ১ বছর শিক্ষকতা করার পর মাতৃভূমির টানে ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
দেশে এসে সর্বপ্রথম শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া থানার নন্দনসার মুহিউস সুন্নাহ মাদরাসায় শায়খুল হাদীস ও মুহতামীম পদে যোগদান করেন। এরপর ১৯৭৮ সালে ঢাকার ফরিদাবাদ মাদরাসায় যোগদান করে চারবছর সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে শিক্ষকতা করেন। এ সময় তিনি অনেক মেহনতী, যোগ্যতাসম্পন্ন ও দেশদরদী ছাত্র তৈরি করেছিলেন।

ফরিদাবাদে দীর্ঘদিন পর্যন্ত দারুল ইকামার দায়িত্ব পালন করেন। তারপর ১৯৮২সালে চলে আসেন কাজী মু’তাসিম বিল্লাহ রহ. প্রতিষ্ঠিত জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগে। এখানে অত্যান্ত দক্ষতার সাথে তিরমিজি শরীফের দরস দান করেন। এখানে ৬ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৮৮ সাল থেকে অধ্যাবধি পর্যন্ত অত্যান্ত যোগ্যতা ও মেহনতের সাথে ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা এবং ১৯৯৮ সাল থেকে অধ্যাবধি জামিয়া সুবহানিয়ার শায়খুল হাদীস ও মুহতামীমের দায়িত্ব আঞ্জাম দিচ্ছেন।

আধ্যাত্মিক জীবন :
আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেব কিশোর বয়স থেকেই ইবাদাত প্রিয়। ইসলামী বিধিবিধানের প্রতি তার ঝোঁক  বরাবর অবাক করার মতো। এ বৃদ্ধ বয়সে হুইল চেয়ার দিয়ে চলাচলকারী এ মানুষটি যেভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থেকে নামাজ আদায় করেন তা যে কাউকে বিস্মিত করে।

বায়আত গ্রহণ :
তিনি শায়খুল হাদীস যাকারিয়া রহ. এর কাছে প্রথমে বায়আত হোন। তার সাথে রমজানে ইতেকাফ করেন। তখন তিনি মুরাদিয়া মাদরাসায় অধ্যাপনা করাতেন।
তার ইন্তেকালের পর মুফতী মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর হাতে পুনরায় বায়আত হোন। এরপর ১৯৯৫ সালে তিনি বাংলাদেশে আসেন। মালিবাগ জামিয়ায় ইতেকাফ করেন। ইয়ারপোর্ট মাদরাসায় অবস্থান কালে তার কাছ থেকেই ১৯৯৫সালে খেলাফত লাভ করেন।

আল্লামা কাসেমী একজন দেওবন্দী মাসলাকের আলেম। সর্বদা সুন্নাতের অনুসরণ ও আকাবির আসলাফের দেখানো পথে চলেন। সাদাসিধে জীবন তার ঐকান্তিক ব্রত। রাসূলুল্লাহ সা. এর হাদীসের খেদমাত আর সমাজে ইলমে দ্বীন পৌঁছে দেয়ার জন্য সর্বদা মগ্ন থাকেন এ রাহবার। কালক্রমে তিনি এখন বৃদ্ধ বয়সে উপনীত। তার কাছে হজার হাজার মানুষের মুরীদ হওয়ার চাহিদা এবং অনেক পীড়াপীড়ির পরও তিনি বিষয়টিকে এড়িয়ে যান। কাউকে মুরীদ বানাতে আগ্রহী দেখানোতো অনেক দূরের বিষয়। তবে তার কাছে কেউ মুরীদ হতে এলে তিনি মুফতি মাহমুদ হাসান গাঙ্গুহী রহ. এর জানেশ্বীন মুফতি ইব্রাহীম আফ্রিকী দা.বা. এর কাছে পাঠিয়ে দেন।
প্রচারবিমূখ এ আধ্যাত্মিক রাহবার আল্লামা কাসেমী তেমন কাউকে খেলাফত দেননি। তিনি খেলাফত লাভ করেছেন প্রায় ২০ বছর পূর্বে। কিন্তু এ দীর্ঘ সময়ে মাত্র ৩ জন আলেমকে খেলাফত দিয়েছেন। তারা হলেন গাজীপুরের মাওলানা মাসউদুল করীম, সৈয়দপুরের  মাওলানা বশির আহমদ ও মানিকনগরের  মাওলানা ইছহাক।

অবদান :- রাজনৈতিক জীবন :
রাসূলুল্লাহ সা. এর জীবনের অন্যতম একটি দিক ছিলো রাজনীতি। তখনকার সময়ের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়াদী তিনি রাজনীতির মাধ্যমে সমাধান করতেন। প্রিয় নবীজির অনুসরণ ও সুন্নাত হিসেবে আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী সাহেবও রাজনীতিতে যুক্ত। তিনি ইবাদাত মনে করে রাজনীতি করেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি ও রাসূলের সুন্নাত হিসেবে রাজনীতি করেন।

রাজনীতির ক্ষেত্রে তিনি আকাবিরদের রেখে যাওয়া সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের সাথে যুক্ত। ১৯৭৫ সাল থেকেই তিনি জমিয়তের একনিষ্ঠ সক্রিয় কর্মী। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘকাল জমিয়তের সাধারণ সম্পাদক মরহুম মাওলানা শামসুদ্দীন কাসেমী রহ. এর নেতৃত্বে সকল আন্দোলনে শরীক থাকতেন। জমিয়তে তাঁর মাধ্যমেই যোগদান করেছিলেন। ১৯৯০ সালে জমিয়তের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বে চলে আসেন। বর্তমানে কেন্দ্রীয় জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের গত ৭ নভেম্বর ২০১৫ ইংরেজী রোজ রবিবার জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে মহাসচিবের দায়িত্ব পান। এবং নিজস্ব মেধা, দক্ষতা ও পরামর্শের মাধ্যমে এ দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন।

১৯৯০ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত দেশের আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন খতমে নবুওয়াত আন্দোলনে জোরালো ভূমিকা রাখেন। এবং সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন।

বর্তমানের আলোচিত অরাজনৈতিক সংগঠন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ ঢাকা মহানগরীর সম্মানিত সভাপতির দায়িত্বভার তাঁর উপর ন্যস্ত করা হয়।
তিনি অত্যান্ত সূচারুরুপে অতীতের সকল দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়ে এসেছেন। বর্তমানেও প্রচুর শ্রম ও মেধা খাটিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সবগুলো ইস্যুতে চমৎকারভাবে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন।
তিনি যেসব বিষয়ে আন্দোলনের ডাক দিয়েছেন। তাতে সফলতা তার পদচুম্বন করেছে। (আলহামদুলিল্লাহ)
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ও যৌক্তিক দাবীর ফলে সরকার তার প্রতিটি দাবীকে মানতে বাধ্য হয়েছে ।

কয়েকটি সফল আন্দোলন :
১. খতমে নবুওয়াতের ব্যানারে ১৯৯৬ সালে বিতর্কিত লেখিকা তসলিমা নাসরিনকে দেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়।
২. ২০০১ সালে নারী অধিকারের নামে কুরআন বিরোধী আইনকে রহিত করা হয়।
৩. ২০০৮ সালে পুনরায় নারী অধিকার আইনকে বাতিল করা হয়।
৪. ২০১৩ সালে নাস্তিক বিরোধী আন্দোলনের ফলে শাহবাগ থেকে নাস্তিকদের পতন ঘটে। ঐতিহাসিক শাপলা চত্ত্বরে ইতিহাসের শ্রেষ্ট সমাবেশ হয়। এতে তিনি সভাপতিত্ব করেন।
৫. ২০১৫ সালে নাস্তিক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী বিরোধী আন্দোলনের ফলে তার মন্ত্রীত্ব, আওয়ামীলীগের সাধারণ সদস্যপদ বাতিলসহ তাকে জেলে প্রেরণ করা হয়।
৬. একই বছর রাজধানী ঢাকার প্রাচীণ মসজিদ ভাঙ্গা আইনকে বাতিল করা হয়  আন্দোলনের ফলে।
৭. এক জায়গায় কুরবানী করতে হবে। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের ফলে এটিও রহিত করা হয়।
৮. ২০১৬ সালে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম রক্ষার দাবীতে হেফাজতের আন্দোলন সফল হয়। সরকার ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে বহাল রাখে।
৯. বর্তমানে ২০১৭ সালে হাইকোর্টের সামনে গ্রিকমূর্তি স্থাপনের বিরুদ্ধে শান্তিপূর্ণ আন্দোলন চলছে।

বুখারী শরীফের দরসদান : পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফ আল্লাহ তায়ালার বাণী। আর হাদীসে মোবারকা রাসূলুল্লাহ সা. এর বাণী। কিন্তু এর সবই আল্লাহপ্রদত্ত। ইমাম বুখারী রহ. অক্লান্ত মেহনত ও পরিশ্রম করে বুখারী শরীফ সংকলন করেছেন। তার ইখলাস ও কবুলিয়াতের কারণে পৃথিবীতে পবিত্র কালামুল্লাহ শরীফের পরেই ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে বুখারী শরীফ স্থান লাভ করেছে।

যামানার মুজাদ্দেদ আল্লামা নূর হোসাইন কাসমী সাহেব এই বুখারী শরীফের মাধ্যমেই খেদমাত শুরু করেছেন।
সর্বপ্রথম শরীয়তপুরের নন্দনসার মুহিউসস সুন্নাহ মাদরাসায় বুখারীর দরস প্রদান করেন। এরপর ফরিদাবাদ ও মালিবাগে শিক্ষকতাকালীণ সময় বুখারী শরীফ পড়ানো হয়নি। কিন্তু এরপর ১৯৮৮ সাল থেকে অদ্যাবধি ২০১৭ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ আড়াইযুগ ধরে বুখারীর দরস প্রদান করে আসছেন।

তার কাছ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজারেরও বেশি ছাত্র বুখারীর দরস লাভ করেছে। তিনি বর্তমানে ৪৫ টি মাদরাসার প্রধান/খণ্ডকালীণ শায়খুল হাদীসের দায়িত্ব পালন করছেন।

বাংলাদেশের প্রথিতযশা এ আলেমের কাছে বিদেশ থেকে অনেক মাদরাসার শায়খুল হাদীসরা পর্যস্ত সনদ প্রাপ্তির লক্ষে বারিধারার কুঁড়েঘরে চলে আসেন। যার ফলে ইতিমধ্যে তার সুনাম সুখ্যাতি ছড়িয়ে গেছে বিশ্বময়। সুদান, কাতার, মালদ্বীপ, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, লণ্ডন, মিশরসহ বিশ্বের ইলমী মারকাজের জ্ঞানপবন ব্যক্তিরা তার কাছে বরকত হাসিলের উদ্দেশে হাজির হোন। নিয়মিত তার দরবারে ভীড় জমান।

তথ্য দানকারীর নাম :- জি এফ এম সাঈদুল আলম । সাবেক ফারেগঃ বারিধারা জামিয়া ইমেইল Hmsaidulalam@gmail.com

Manual3 Ad Code

তথ্য দানকারীর মোবাইল :- 01797265425

Manual5 Ad Code

Spread the love