সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা মোহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষীপুরীর জীবন ও কর্ম

November 25 2018, 05:05

Manual4 Ad Code

 লিখেছেন> বদরুল ইসলাম আল-ফারুক

আপনার কি বিশ্বাস হয় ধবধবে সাদা রংয়ের মানুষটি শ্বেতী বা ধবল রোগী নয়? আপনার কি বিশ্বাস হয় ৮৫ বছরে ব্রেইন স্ট্রোক করে ডানপাশ অবশ হয়ে যাওয়া মানুষটি এখন কারো সাহায্য ছাড়া অনায়াসেই হাঁটতে পারেন? কেন বিশ্বাস হবেনা? “আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের অলৌকিক ঘটনাবলী সত্য” একথা আপনি কি বিশ্বাস করেন না? আল্লাহর অলৌকিকতার এক বাস্তব নিদর্শন হচ্ছেন আল্লামা মোহাম্মদ বিন ইদ্রিস লক্ষীপুরী (দা. বা.)। নামঃ মোহাম্মদ, পিতার নামঃ মাওলানা ইদ্রিস (রহ.)। ১৯৩২ সালে কানাইঘাট পৌরসভার লক্ষীপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তাঁর জন্ম। বাবা মাওলানা ইদ্রিস তৎকালীন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ, শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরী (রহ.) এর উস্তাদ ছিলেন।

Manual5 Ad Code

একদিন ইতিহাস জয় করবেন তাঁর ছেলে, এটা হয়ত আলেম পিতার বোধগম্য হয়েছিল, তাই নাম রেখেছিলেন মোহাম্মদ। ধবল রোগাক্রান্ত ছিলেন প্রথম দিকে। কিন্তু আল্লাহ যে তাঁর অলৌকিকতা প্রকাশ করেন তাঁর প্রিয় বান্দাদের উপর, সেই অলৌকিকতা প্রকাশ পেলো আল্লামা লক্ষীপুরী হুজুরের শরীরে। ধবধবে সাদা মানুষটি আজ আর ধবল রোগী নয়।

Manual8 Ad Code

১৯৮২ সালে মহান আল্লাহর আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে হজ্বে গিয়েছিলেন আল্লামা লক্ষীপুরী। তখন তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছিলেন করে বলেছিলেন যে, হে আল্লাহ সাদা রংয়ের সৃষ্টিকর্তাও তুমি, কালো রংয়ের সৃষ্টিকর্তাও তুমি। হয় আমার সমস্ত শরীর কালো করে দাও না হয় সাদা করে দাও। আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দার কথা কবুল করেছেন। সমস্ত শরীর সাদা রংয়ের করে দিলেন। হজ্ব থেকে আসার পর তাঁকে কেউ চিনতেই পারেননি। আগের লক্ষ্মীপুরী আর এখনকার লক্ষ্মীপুরী আকাশ-পাতাল ব্যবধান। এখন আর তিনি ধবল রোগী না। প্রাথমিক শিক্ষা, মাধ্যমিক শিক্ষা, উচ্চ শিক্ষা লাভে ধন্য হয়ে তৎকালীন উপমহাদেশের শ্রেষ্ঠ হাদিস বিশারদ শাইখুল ইসলাম আল্লামা মুশাহিদ বায়মপুরীর কাছে হয়ে উঠেন আদরের ধন, চোখের মণি,মুখের বচন। নিজের আদরের কন্যাকে বিয়ে দিয়ে তার প্রমাণ রাখলেন আল্লামা বায়মপুরী। কর্মজীবনের শুরু হয় দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসায়, তার পর বায়মপুরীর গড়া মুশাহিদিয়া খাগাইল কোম্পানিগঞ্জ থেকে ।

(খেলাফতি) বায়মপুরীর ইন্তেকালের বৎসর খাগাইল মাদ্রাসার শিক্ষক থাকা অবস্থায় আল্লামা লক্ষীপুরীকে খেলাফতি দান করেন আল্লামা বায়মপুরী (রাহ.)। শায়খের নির্দেশে ৩ বছর পর চলে যান ইলমের মারকায় দারুল উলুম কানাইঘাট মাদ্রাসায়। এগিয়ে চলার সেই শুরু। আল্লামা আলিমুদ্দীন দুর্লভপুরী আল্লামা,শিহাবুদ্দীন রেঙ্গা, চতুলী আল্লামা মাহমুদুল হাসান রায়গড়ী, আল্লামা শফিকুল হক সুরাইঘাটী সহ হাজার হাজার মাওলানাদের উস্তাদ তিনি। আমাদের শায়খ তিনি। এলাকার লোকজনের জোর চাপে ২০০৭ সালে কানাইঘাট দারুল উলুম দারুল হাদীস মাদ্রাসার প্রিন্সিপালের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি। কানাইঘাটের নববী কানন যেন বায়মপুরীর পরে অপেক্ষায় ছিল এমন অভিভাবকের। ফিরে পেতে শুরু করে কানাইঘাট মাদ্রাসা তার হারানো ঐতিহ্য।

লক্ষীপুরীর হাত ধরে এগিয়ে চলে কানাইঘাট মাদ্রাসা। আবারো কানাইঘাটের ফুলবাগানে মধু আহরণ করতে ঢল নামে হাজারো ইলিম পিপাসু মৌমাছির। হুজুরকে চালকের আসনে বসিয়ে কানাইঘাট ফিরে পায় তার আসল রূপ। এর পর থেকে শুধু নিজেকেই ছাড়িয়ে যাওয়া। কিন্তু ২০১৪ সালের ৭ আগস্ট শোকের ছায়া নেমে আসে কানাইঘাটের সর্বত্র। আমাদের মেশকাত জামাতের ফাইনাল পরিক্ষার ফলাফল ঘোষণা হবে। কিন্তু কোন আনন্দ নেই কারো মুখে। সোনার হরিণরা বৃত্তি পেয়েও হাসি ফুটেনি কত বৃত্তিপ্রাপ্তদের। নিস্তব্ধতায় ছেয়ে যায় কানাইঘাটের আকাশ বাতাস। পাথরের কান্না আমার শুনার সামর্থ নাই, যাদের আছে তারা হয়ত শুনছেন। মাছের ভাষা আমি বুঝি না, তারাও পানির নিচে সেদিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছিল। পাখির ডাকেও যেন আগের সে সুর নেই। কারণ একটাই গত রাতে ব্রেইন স্ট্রোক করে আমাদের হুজুর সিলেটস্থ উইমেন্স মেডিকেলে চিকিৎসাধীন।

Manual2 Ad Code

উইমেন্স থেকে সেবা মেডিকেল। ডাক্তার জানিয়েছে ব্রেইন স্ট্রোক হয়ে ডান হাত ডান পা অবশ হয়ে গেছে। এই বয়সে হাত পায়ের শক্তি ফিরে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু হাল ছাড়িনি আমরা। উন্নত চিকিৎসার জন্য হুজুরকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকায় পি. জি. হাসপাতালে। তার পর এসপি আরসি। এর পর অ্যাপলো হসপাতাল। চেষ্টার কোন কমতি ছিলো না ভক্তদের। মহান আল্লাহর কাছে চোখের জল ভাসিয়ে প্রার্থনা করতে থাকেন সবাই। সকলের আপ্রাণ প্রচেষ্টা এবং আন্তরিক দোয়া বৃথা করেননি মহান আল্লাহ তায়ালা। মনে হয় আল্লাহর ইচ্ছাই ছিল অলৌকিকতা প্রদর্শনের। আবারো প্রদর্শন করলেন আল্লামা লক্ষীপুরীকে সুস্থ করে দিয়ে। ফিরে এলেন আবারো। . আল্লামা লক্ষীপুরী ,সবকিছু হার মানিয়ে আবারো উজ্জল করলেন হাদিসের মসনদ।

Manual3 Ad Code

কালা হাদ্দাসানা, কালা কালান্নাবিয়্যু সা. ধ্বনি উচ্চারিত হল তাঁর মুখে। তৃষ্ণাতুর অনেক ছাত্রের তৃষ্ণা নিবারণ করলেন। এখনো করছেন। কিন্তু হতভাগা আমি, হতভাগা আমার সহপাঠীরা। হুজুরের দরস পেয়েছি মুষ্টিময় কয়েকদিন। তাও সে অসুস্থতার সময়। হয়ত আমাদের ভাগ্যটাই এরকম। আজ তিনি প্রায় পরিপুর্ণ সুস্থ। ক’দিন আগে হুজুরের সাথে আমিও ওমরাহ পালন করে আসছি। চলাফেরা এখন স্বাভাবিক ভাবেই করতে পারেন। সব মিলিয়ে তিনি এক আকাবিরের জলন্ত প্রতিচ্ছবি। . বরণ্যদের স্মৃতিচারণে মনে আনন্দ পাই তাই কিছু লেখার প্রয়াস। আর কিছুনা। লক্ষীপুরীর জীবন বৃত্তান্ত লেখার দুঃসাহস আমার নেই। এত শব্দ আমার শব্দভাণ্ডারে নেই, যে তাঁর জীবনী নিয়ে লিখবো। লেখায় কোন প্রকার ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। পরিশেষে আল্লামা লক্ষীপুরী হুজুরের সুস্থতার সাথে দীর্ঘ নেক হায়াত কামনা করে এখানেই শেষ করছি।

Spread the love