সারা দেশের মাদ্রাসাসমূহ

মাওলানা জমশেদ আলী চেয়ারম্যান হুযুর রহ. 

November 14 2018, 05:45

লিখেছেন- শামসুল আদনান>
জন্ম ;
ক্ষণজন্মা মনীষী আল্লামা জমশেদ আলী রহ. অখন্ড ভারতে সিলেট জেলার অন্তর্গত কানাইঘাট থানাধীন রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের সুরমা নদীর তীরঘেঁষা লালার চক গ্রামে ১৯১৬ (তাঁর জন্ম তারিখের কোন সঠিক সূত্র পাওয়া যায়নি তবে এক বর্ণনায় ১৯১৬ সালে মতান্তর ১৭ ও ১৮) সালে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর সম্মানিত পিতার নাম আলহাজ্ব আব্দুল কাদির এবং দাদার নাম আলহাজ্ব তোরাব মিয়া।
প্রাথমিক শিক্ষা;
তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী হরযত মাওলানা জমশেদ আলী রহ. মাতা-পিতার তত্ত্বাবধানে লালিত-পালিত হন এবং স্বীয় লালার চক গ্রামের উত্তরবাড়ি সংলগ্ন হাফিজিয়া মাদ্রাসায় প্রাথমিক লেখাপড়া শুরু করেন।
শিক্ষাজীবন;
প্রয়াত আল্লামা জমশেদ আলী রহ. এর বয়স যখন আট বা নয় বছর তখন তিনি গোলাপগঞ্জ থানাধীন এক নং বাঘা ইউনিয়নের গৌরাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এবং সেখানে নানাবাড়ি থেকে লেখাপড়া করেন। তিনি গৌরাবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সমাপনী পরীক্ষায় অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে বৃত্তি লাভ করেন। তখন তার শিক্ষক ভারত বাবু কলিকাতা থেকে তাঁর বৃত্তি আনেন।
তারপর তিনি সিলেট সরকারি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং সেখানে বার্ষিক পরীক্ষায় ক্লাস সিক্স এ বৃত্তি লাভ করেন। পরে তিনি ফুলবাড়ি আজিরিয়া ফাযিল মাদরাসায় ভর্তি হন। এবং উক্ত মাদ্রাসা এক বৎসর যাবৎ লেখাপড়া করেন। অতঃপর আল্লামা জমশেদ আলী রহ. সিলেটের বিখ্যাত আলেমেদ্বীন শায়খে তাহির আলী তহিপুর রহ. এর কাছে আরবী ব্যাকরণ হেদায়াতুন্নাহু ও কাফিয়া প্রাইভেট পড়েন। এরপর কানাইঘাটের ঝিংগাবাড়ি ফাজিল ডিগ্রী মাদ্রাসার ভর্তি হন। এবং তথায় দাখিল ও আলিম  অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ  হন। তারপর উচ্চশিক্ষার অদম্য স্পৃহা নিয়ে ভর্তি হন বিশ্বের বিখ্যাত ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দে। এখানে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে ১৯৪৬ সালে শিক্ষা সমাপন করেন।
ইলমী সফর
আল্লামা জমশেদ আলী রহ. শিক্ষা সফরের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন জায়গা ভ্রমন করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল সফর করেন। পায়ে হেটেও অনেক দুর্গম জায়গা পরিভ্রমণ করেন।
তাই তো তিনি বাংলাদেশের সমস্ত অবস্থা জেনে ভূগোলের মত কঠিন বই সর্বপ্রথম লিখেছিলেন যা তখনকার সময়ে এদারা বোর্ডের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির সিলেবাসভুক্ত ছিল।
তাঁর জ্ঞান-প্রজ্ঞার পরিধি এথেকে সামন্য আঁচ করা যায়।
আল্লামা জমশেদ আলী রহ. ছিলেন খাটো ও ক্ষীণকায় দেহ এবং উজ্জ্বল শ্যামল চেহারার অধিকারী। ইলমি সফরের পরে রোগব্যাধি বাসা বাধে তাঁর জীবনে। বাকি জীবন ছোট ও জটিল রোগব্যাধিতে পার হয়।
কর্মজীবন ও অধ্যাপনা;
যখন আল্লামা জমশেদ আলী রহ. দেওবন্দ থেকে ফিরে আসেন তখন এলাকাবাসীর অনুরোধে ১৯৪৭ সালে জামিয়া ইসলামিয়া এমদাদুল উলুম লালার চক মাদরাসার [প্রতিষ্টাকাল : ১৯৩৪ সাল, ১৪৪০ হিজরী] মুহতামিম পদে নিযুক্ত হন। অত্যন্ত দক্ষতার সহিত পরিচালিত করেন লালার চক মাদরাসা। দিনদিন বাড়তে থাকে ছাত্রছাত্রীদের সংখ্যা ও মাদরাসার সুনাম, খ্যাতি। বৃদ্ধি হতে থাকে মাদরাসার ক্লাস সংখ্যা। দারুল হাদিস রাজাগঞ্জ মাদরাসা ও ঢাকা উত্তর আরাবিয়া হুসাইনিয়া মাদরাসা পাশাপাশি থাকায় আল্লামা জমশেদ আলী রহ. লালার চক মাদরাসায় ‘তাকমিল ফিল হাদিস’ (মাস্টার্স) ক্লাস বৃদ্ধি করেননি।
তাঁর গভীর জ্ঞানের সন্ধান পেয়ে বড় বড় উলামায়ে কেরাম বৃহত্তর সিলেট এদারা বোর্ডের সচিব পদে তাকে নিযুক্ত করেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে বহাল ছিলেন। এছাড়াও তিনি এদারায়ে তা’লীম বাংলাদেশ এর অডিটর হিসাবে মনোনীত হয়ে দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেন। শেষ বয়সে রোগব্যাধিতে জর্জরিত হওয়ায় এডিটরের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেন।
যদিও আল্লামা জমশেদ আলী রহ. জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম লালার চক মাদরাসায় ‘দারুস হাদিস’ ক্লাস খোলেননি, তাপরেও নবী সা. এর হাদিস প্রচার করতে না পারায় তাঁর মধ্যে এক ধরণের অতৃপ্তি, অপূর্ণতা কাজ করছিল।
হাদিস প্রচার ও প্রসারের এই লালসা নিবারণের জন্যই পশ্চিম লালার চক নিজের জমিতে প্রতিষ্টা করেন মহিলা মাদ্রাসা। এতে মেয়েদের অত্যন্ত উপকার হয়। হাদিস পাঠ করার সৌভাগ্য তারা অর্জন করে। তখনকার সময়ে লালারচকের আশপাশে কোন মহিলা মাদরাসা ছিলনা। পুরো দেশেই হাতেগুনা কয়েকটা মহিলা মাদরাসা ছিল।
উভয় মাদরাসায় ছাত্রছাত্রীদেরকে তিনি খুব গুরুত্ব সহকারে শিক্ষা দিতেন। আল্লাহু আকবার! আল্লামা জমশেদ আলী রহ. এর এতই প্রখর স্মৃতিশক্তি ও মেধা ছিল যে, ছাত্রছাত্রীদেরকে তিনি বিভিন্ন বই মুখস্থ শিক্ষা দিতেন।
লালার চক জামে মসজিদের ছিলেন অলিখিত খতীব। প্রায় শুক্রবারে বয়ান করতেন। বয়ানের প্রতিটি কথায় মুক্তাে ঝড়ত। জ্ঞানগর্ভ, উচ্চামার্গের দার্শনিক কথাবার্তা এমনভাবে উপস্থাপন করতেন গ্রামের নিরক্ষর মানুষেরাও বুঝত। শিক্ষিত মানুষেরা আরো বেশি উপকৃত হতো।
মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত তিনি ঐ সব খিদমাত গুলোর মধ্যেই নিযুক্ত থাকেন। বিভিন্ন জায়গা থেকে হাদিস পড়ানোর জন্য প্রস্তাব তাঁর কাছে এসেছে। তবে রিয়াসত আলী চৌঘরী হুজুর রহ. ও তহির আলী তহিপুরী হুজুর রহ. এর নির্দেশে ঐসব প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন তিনি।
অজপাড়া গায়ের একটা মাদরাসায় অধ্যাপনা করার কারণে আল্লামা জমশেদ আলী রহ. তেমন পরিচিত হননি তাঁর যোগ্যতার তুলনায়। বড় কোন মাদরাসায় বা শহুরে অধ্যাপনা করলে নিঃসন্দেহ দেশখ্যাত খ্যাতিমান হিসেবে নিজের স্থান করে নিতেন।
উল্লেখযোগ্য কয়েকজন ছাত্র;
হযরত মাওলানা মাহমুদ রহ.
হযরত মাওলানা আব্বাস আলী  (দা.বা.) মুফাসসিরে কুরআন হযরত মাওলানা মমতাজ উদ্দিন (দা.বা.)
হযরত মাওলানা মুহিবুল হক  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা নাজিম উদ্দিন লন্ডন প্রবাসী  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা শফিকুর রহমান  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা শওকত আলী  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা আব্দুল মতিন  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা আলী আহমদ  (দা.বা.)
হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী রহ. হযরত মাওলানা এখলাছুর রহমান  (দা.বা.)
আমি অধমও তাঁর ছাত্র। তাঁর জীবনের অন্তিম মুহূর্তে হাতে ধরে নিয়ে অজু করানো, অজুর পানি এগিয়ে দেয়া, ইস্তেঞ্জায় ধরে নিয়ে যাওয়ার মত কিছু খেদমতও করতে পারায় নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি।
মুর্শিদে কামেল এর বায়াত গ্রহণ বা আধ্যাত্মিক সাধনা;
আল্লামা জমশেদ আলী রহ. দেওবন্দে শিক্ষা সমাপন করেছেন। ছাত্রত্ব থাকায় স্বীয় উস্তাদ শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র কাছে বাইয়াত গ্রহনের ইচ্ছা থাকলেও পারেননি। যখন দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে ফিরে আসেন তখন খলীফায়ে মাদানী পীরে কামেল হযরত মাওলানা আব্দুল গাফফার শায়খে মামরখানি রহ. এর মুবারক হস্তে বায়াত গ্রহণ করেন। হরযত মাওলানা মামরখানি রহ. কাছ থেকেই তিনি মারেফতের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ লাভ করেন। কঠোর রিয়াজতের মাধ্যমে মারেফাতের উচ্চ শিখরে পৌঁছেন। মুর্শিদে কামেল এর দোয়া পান। আল্লামা জমশেদ আলী রহ. সময় পেলেই আল্লাহর ধ্যান ও ইবাদতে মশগুল হয়ে পড়তেন।
রাজনৈতিক জীবন;
এ মহান ব্যক্তি যেভাবে ছিলেন একজন পেয়ারা নবী সা. এর সুন্নাতের অনুসারী মর্দে মুজাহিদ। তদুপরি রাজনৈতিক ময়দানেও ছিলেন বিশিষ্ট রাজনীতিবীদ। তিনি ১৯৫৭ সালের নির্বাচনে কানাই ঘাট রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন এর ১ নং ওয়ার্ডের সদস্য নির্বাচিত হন এবং পাঁচ বছর যাবত মানুষের সেবা করেন। ১৯৬২ সালের নির্বাচনে রাজাগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে দোয়াত কলম মার্কা নিয়ে বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন এবং ১৯৭১ ইংরেজি পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছর অত্যন্ত সুনামের সহিত নিষ্ঠার সাথে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর জনপ্রিয়তা ও গ্রহণযোগ্যতা ছিল অনন্য। তিনি বায়তুল মালগুলো অত্যন্ত সুশৃংখলভাবে জনগণের মধ্যে বন্টন করতেন এবং অসহায়, অনাতদের খুঁজ নিয়ে সসহযোগিতা করতেন। রাস্তাঘাট, কালভার্ট ইত্যাদি সমূহে তিনির অবদান জনগণ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিল। আর এসব কারণেই তিনি চেয়ারম্যান হুজুর নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন।
বিবাহ ও সন্তানাদি;
আল্লামা জমশেদ আলী রহ. চারটি বিবাহ করেন। প্রথম স্ত্রীর নাম মোসাম্মৎ মফুরা সুন্দরী। আর এই স্ত্রীর কাছ থেকেই প্রথম সাহেবজাদা হযরত মাওলানা আহমদ হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। যিনি বর্তমানে জামিয়া ইমদাদুল উলুম দারুল হাদিস লালারচক মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম হিসাবে নিযুক্ত আছেন।
দ্বিতীয় স্ত্রীর নাম মোসাম্মৎ নেছা বেগম এবং তৃতীয় স্ত্রীর নাম মোসাম্মৎ আনোয়ারা বেগম। এই দুই জনই ছিলেন নিঃসন্তান। চতুর্থ স্ত্রীর নাম করুণা বিবি। এই স্ত্রীর গর্ভ থেকে দুই ছেলে ও দুই মেয়ের জন্মগ্রহণ করেন। সাহেবজাদা দুজনের নাম হল হরযত মাওলানা অলিউর রহমান ও ক্বারী হারুনুর রশিদ। আর সাহেবজাদী দুজনের নাম হল মোসাম্মৎ মরিয়ম বেগম ও মোসাম্মৎ হালিমা বেগম।
ইন্তেকাল;
শত শত সুযোগ্য আলেমের ওস্তাদ অগণিত মানুষের হেদায়াতের দিশারী, ইসলামী শিক্ষা বিস্তার আন্দোলনের প্রাণপুরুষ, বিশিষ্ট সমাজসেবী আল্লামা জামশেদ আলী ৩০ জানুয়ারি ২০০৫ ইংরেজি, ১৭ মাঘ ১৪১১ বাংলা, মোতাবেক ১৮ জিলহজ্বব ১৪২৫ হিজরী, রোজ রবিবার রাত ৩.৩০ মিনিটের সময় সবাইকে সুখ সাগরে ভাসিয়ে আপন রফিকে আলার সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।
ওলী-আউলিয়ার পূণ্যভূমি কানাইঘাট সেদিন শোকের ভূমিতে পরিণত হয়। আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠে।  পৃথিবীবাসী হারিয়ে ফেলে দীপ্তমান আরো একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র।
জানাযা ও দাফন;
পরদিন তাঁর বাড়ির ডান পার্শ্ববর্তী মাঠে এই মহান বুজুর্গের নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। আল্লামা জমশেদ আলী রহ. বড় সাহেবজাদা হযরত মাওলানা আহমদ হোসেন (দা.বা.) জানাযার নামাজের ইমামতি করেন। হাজার হাজার মানুষ বহু দূর-দূরান্ত থেকে এসে হযরতের জানাজায় শরিক হন। লালার চক গ্রামবাসী ইতিপূর্বে এতো জনসমাগম দেখিনি।
পরে তাঁকে জামিয়া ইসলামিয়া ইমদাদুল উলুম লালার চক মাদরাসার সাথে সম্পৃক্ত লালার চক জামে মসজিদের কবরস্থানে দাফন করা হয়।
আল্লাহ এ মহান আলেমে দ্বীনকে জান্নাতের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং আমাদেরকে তাঁর রুহানী ফয়েজ দ্বারা উপকৃত করুন। আমীন
Spread the love