সারাদেশের মাদ্রাসাসমূহ (বিভাগ ভিত্তিক)

মাওলানা জুনায়েদ বাবুনগরী দা.বা. এর সংক্ষিপ্ত জীবনী

অক্টোবর ১৩ ২০১৯, ০৩:৫৩

জন্ম ও শিক্ষা : ১৯৫৩ সালে চট্টলার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম অধ্যাত্মিক পরিবারে তাঁর জন্ম।
ওলি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্বদের পরিবারে জন্ম নেয়া একজন খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরী। জীবনের দুই তৃতীয়াংশ সময় প্রায় চল্লিশ বছর হাদীস ও ইলমে হাদীস এর পাঠদানে অতিবাহিত করেছেন তিনি। সারা দেশের  নাচে- কানাচে কুরআনের তাফসীর ও ওয়াজ-নসিহত করে বাংলার লাখো-কোটি মানুষকে উপকৃত করেছেন তিনি। কুরআন- দীসের শিক্ষা-দীক্ষার চর্চা ছাড়া আর কোনো কাজে তাঁর মূল্যবান হায়াতের কোনো অংশ অতিবাহিত করেননি।
এই আলেমে দ্বীন অত্যন্ত সহজসরল ও জরাজীর্ণ এক অনাড়াম্বর জীবন অতিবাহিত করেন।
ওলিয়ে কামেল আল্লামা শাহ মুহাম্মদ হারুন বাবুনগরী রহ. ছিলেন তাঁর নানা। নানার অতি আদরের নাতির বাল্যজীবন, শিক্ষাজীবন ও শিক্ষকতা জীবনের প্রায় অর্ধেকই কেটেছে নানার চোখের সামনে। বায়তুল্লাহর গিলাফ ধরে অনেকবারই বুযুর্গ নানা দোয়া করেছেন বাবুনগরীর জন্যে।
এ ছাড়া আরো কয়েকজন ওলির সংস্পর্শে থেকে অতি স্বল্প সময়ে আধ্যাত্মিক জীবনের শিখরে পৌঁছে যান তিনি। চার তরীকার খেলাফত প্রাপ্ত হয়ে আধ্যাত্মিক জীবনে একজন ওলিয়ে কামেল হওয়ার সৌভাগ্যও অর্জন করেন তিনি। দশ বছর বয়সে পুরো কুরআন মাজীদের হিফজ সমাপ্ত করে এক বৈঠকে পুরো কুরআন শুনানোর গৌরবোজ্জ্বল সুখ্যাতি অর্জন করেন তিনি।
তারপর তিনি ভর্তি হন দারুল উলূম হাটহাজারীতে। এখানেই তিনি ১৯৭৬ ইংরেজীতে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে মুমতায ডিভিশনে দাওরায়ে হাদীস পাশ করেন। পরে হাদীস বিষয়ে উচ্চতর সনদ লাভের উদ্দেশ্যে সুদূর করাচীর আল্লামা বাননূরী টাউন  বিশ্ববিদ্যালয়ে বিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইউসুফ বাননূরি রহ.-এর শিষ্যত্ব অর্জন করেন।
অধ্যাপনা ও কর্মজীবন : করাচী ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে টানা দুই বছর হাদীস ও উলূমুল হাদীস বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রী লাভের পর ১৯৭৮ সালের শেষের দিকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেই ১৯৭৮ সালে প্র মে চট্টলার সর্ববৃহৎ প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া বাবুনগরে মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে অত্যন্ত সুনাম-সুখ্যাতি ও সফলতার সাথে প্রায় দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে বুখারী, মুসলিম ও আবু দাউদসহ অনেক হাদীস গ্রন্থের পাঠদান করেন। এরপর ২০০৩ সালে বিখ্যাত বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম হাটহাজারী মাদরাসায় একজন সিনিয়র মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। এখানে প্রায় এক যুগ ধরে তিনি মুসলিম শরীফ, তিরমিযী শরীফসহ আরো অনেক হাদীস গ্রন্থ অত্যন্ত দক্ষতা ও নিপুণতার সাথে পাঠদান করে সুনাম-সুখ্যাতি অর্জন করতে সক্ষম হন।
এ সুদীর্ঘ চল্লিশ বছরের মুহাদ্দিসী জীবনে তিনি অর্ধলক্ষাধিক আলেম- ওলামা, মুহাদ্দিস ও মুফতী সৃষ্টি করার গৌরবোজ্জ্বল সফলতা অর্জন করেন।
রচনা :
শিক্ষকতা ও মুহাদ্দিসী জীবনের পাশাপাশি সাহিত্য রচনার জগতেও রয়েছে তার অনবদ্য অবদান। ‘আত-তাওহীদ ওয়াশ শিরক’,
‘প্রচলিত জাল হাদীস’ ও ‘শরীয়তের দৃষ্টিতে দাড়ি’ সহ প্রায় ত্রিশেরও অধিক বাংলা, আরবী ও উর্দূ ভাষায় রচিত মূল্যবান গ্রন্থ তাঁর
অসাধারণ জ্ঞান ও সাহিত্যচর্চার পরিচায়ক।
দেশ, জাতি ও ইসলামের বহুমুখী অবদানের ওপর লিখিত তাঁর এতো লেখা ও রচনাই প্রমাণ করে জ্ঞান সাধনায় তার জীবন ও
সময় কত বেশি ব্যস্ত ছিল। তিনি অত্যন্তসহজ-সরল ও সাধনায় নিমগ্ন এবং নিয়মিত তাহাজ্জুদগুজার ব্যক্তিত্ব। ইসলামী আন্দোলন : প্রচলিত রাজনীতির সাথে তিনি কখনো কোনো দিক থেকে জড়িত নন। জীবনের একটি মুহূর্তও তিনি প্রচলিত রাজনীতিতে কাটিয়েছেন বলে আমাদের জানা নেই।
সম্প্রতি ইসলামবিরোধী নানা দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্র, ঈমানবিরোধী কার্যকলাপ, মহানবী সা. এর প্রতি ইতিহাসের জঘন্যতম কটূক্তি দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষের পাশাপাশি তাঁকেও উদ্বিগ্ন করে তোলে। তিনি আল্লামা শাহ আহমদ শফি দা.বা. এর আহ্বানে গঠিত হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনে যোগ দিয়ে এর কেন্দ্রীয় মহাসচিব মনোনীত হন।
বিগত ৬ এপ্রিলের লংমার্চ এবং পরবর্তী ৫ মে ঐতিহাসিক ঢাকা অবরোধে তিনি অংশগ্রহ করেন। হাজার হাজার র্যাব, বিজিবি, পুলিশ ও সরকার দলের সশস্ত্র সন্ত্রাসী ক্যাডারদের যৌথ আক্রমনে- শাপলা চত্বরের গণহত্যার বিষাদময় চিত্র পেছনে ফেলে তিনি যখন লালবাগের  পথে তখন ঢাকেশ্বরী এলাকা থেকে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। তাঁর গে্ফতারের সংবাদ মিডিয়ায় প্রচারিত হলে দেশব্যাপী লাখ লাখ ছাত্র-ভক্ত ও পরিচিতদের মধ্যে নেমে আসে শোক-দুঃখের ছায়া। আদালতে হাজির করার সময়  বুনগরীর
নিষ্পাপ চাহনি ও অমলিন অভিব্যক্তি অনেক কিছুই বলে দেয়।
তার রিমান্ডের খবর শুনে দেশব্যাপী হেফাজতের নেতাকর্মী, সমর্থক ও কল্যাণকামী সমাজে নেমে আসে উৎকণ্ঠার ছায়া। তারপর রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের নামে নিমর্ম পুলিশী নির্যাতন চালানো হয় এই যুগশ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীনের ওপর। ফলে গতানুগতিক রাজনীতির সংস্রবমুক্ত এই বিজ্ঞ আলেম বর্তমানে খুব বিষাদময় সময় পার করছেন। তিনি অসুস্থ্যতার ফলে এখন আর স্বাভাবিক জীবন-যাপন করতে পারছেন না।
স্বাস্থ্য-সবল লোকটিকে নির্যাতন করে সরকার মেরে ফেলারই পরিকল্পনা হাতে নিয়েছিল। তারপরও কারাগারে তিনি রাত-দিন ২৪ ঘণ্টা নীরব ধ্যান, নামায, ইবাদত- বন্দেগী ও কুরআন অধ্যয়নের মাধ্যমে সময় কাটিয়েছেন। নির্যাতন সত্ত্বেও তিনি তার ইবাদত ও সত্য বলার পথ থেকে পিছ পা হননি। তাঁর মুক্তি ও সুস্থ্যতার জন্যে লাখ লাখ ভক্ত, ছাত্র ও অনুরক্তদের দোয়া-কানড়বা,  মুনাজাতে সারা দেশ এমনকি বিদেশের  আকাশ পর্যন্ত ভারী হয়ে উঠেছিল। তার কাছ থেকে জোর করে জবানবন্দী আদায়ের খবরে লক্ষ জনতা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিল।সবার একটি মাত্র ফরিয়াদ ছিল,এই বরেণ্য মুহাদ্দিসকে তার হাদীসের
মসনদে শিগগিরই ফিরিয়ে আনা হোক 
Spread the love